সেই দুষ্ট রাখালের কথা কি মনে পড়ে? সে প্রায়ই ‘বাঘ! বাঘ!’ বলে চিৎকার করে মানুষকে ভয় দেখিয়ে মজা করত। একদিন সত্যি সত্যি বাঘ আসে। সে বাঁচার জন্য ‘বাঘ বাঘ’ বলে চিৎকার করে মানুষের সাহায্য চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছিল। গল্পটা হয়তো সত্য নয়; কিন্তু নৈতিক শিক্ষার মানদণ্ড।

করোনাকালের ঈদেও কোমলমতি শিশুদের হাতে পাড়া-মহল্লায় প্রচুর ও নানা ধরনের ডামি অস্ত্র দেখা গেছে। মা-বাবাসহ অনেকে নিছক এটাকে দুষ্টুমি বা খেলনা অস্ত্রের ফেলনা বিষয় মনে করছেন। কিন্তু এই খেলনা অস্ত্র বা পিস্তল নিয়ে তাদের অঙ্গভঙ্গি আঁতকে ওঠার মতো। পেশাদার খুনিদের মতোই তাদের চাল-চলন। দেশে ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবে শিশুদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে বস্তি এলাকায় এর হার বেশি। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বাচ্চাদের হাতেও দেখা যায় বিভিন্ন ধরনের ডামি বা প্লাস্টিকের অস্ত্র। অনেক গবেষণা দেখা গেছে, Slum is the mother of all crime. অর্থাৎ ‘বস্তি সব অপরাধের আঁতুড়ঘর’।

বস্তি থেকে ‘গ্যাং কালচার’ গড়ে ওঠে। মাদক সরবরাহ, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা অপরাধ এখান থেকে পরিচালিত হয়। তাই খুব সহজে অনুমেয়, বস্তিতে এই শিশুদের ‘অস্ত্র অস্ত্র খেলা’ ভবিষ্যতের জন্য অশনিসঙ্কেত। তারা সংঘবদ্ধভাবে পাড়া-মহল্লায় সন্ত্রাসীদের মতো টহল দিয়ে বেড়ায়। তাদের হাতের অস্ত্রের অবয়ব এমন, যেন সত্যিই সেগুলো মারণাস্ত্র। কেউ মনোযোগ দিয়ে না দেখলে বুঝবেই না- এগুলো নকল অস্ত্র। কেউ কেউ এই অস্ত্র দেখে আঁতকেও ওঠেন। শিশুর হাতে খেলনা পিস্তল বা অস্ত্র এখন সারা দেশে সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। মা-বাবা বুঝে না বুঝে তাদের শিশু সন্তানের আবদারে এই ডামি অস্ত্র কিনে তুলে দিচ্ছেন। সবাই ভাবছে- এটা কোনো ব্যাপারই না। কিন্তু ডামি একে-৪৭ সহ নানা অস্ত্র হাতে নিতে নিতে কেউ ডাকাত, কেউ গ্যাং লিডার, কেউ সিরিয়াল কিলার হয়ে যাবে না; এর কী নিশ্চয়তা আছে?

মা-বাবাসহ সবাই মনে রাখা দরকার- কচু কাটতে কাটতে একদিন মানুষ গলা কাটতে শিখে যায়। সবারই মনে থাকার কথা : ঐশী নামের মেয়েটা পরিবারে ছোট ছোট অপরাধ করে পার পেয়ে নিজের নেশার জন্য পুলিশ কর্মকর্তা বাবা এবং সেই সাথে মাকে হত্যা করেছিল। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। তারা বড়দের বা আশপাশে যা হয় তা অনুকরণ করতে চায়। তারা অ্যাডভেঞ্চার বা রোমাঞ্চকর বিষয় খুব পছন্দ করে। সিনেমার নায়কদের মতো অস্ত্র ব্যবহার করাকে ভাবাবেগ মনে করে। এর প্রমাণ আমাদের সমাজে হাজারটা। অনেক কোমলমতি ছেলে-মেয়ে ভারতের ক্রাইম প্যাট্রল, সিআইডি সিরিয়াল, গ্যাংস্টারভিত্তিক সিনেমা দেখে অনেক ক্রাইম বা অপরাধ সংঘটন করে। বাংলাদেশে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, শিশু কিলার খুব অল্প টাকার বিনিময়ে মানুষ হত্যা করে ফেলেছে। বর্তমানে কিশোর অপরাধী তৈরির ক্ষেত্রে মা-বাবার অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড অনেকটাই দায়ী। সমাজে কিছু অভিভাবকের অচেতনতা এবং দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এখন শিশুদের হাতে হাতে নানা ধরনের ডামি অস্ত্রের ঝনঝনানি। এটা দেশে একসময় অরাজকতা সৃষ্টির কারণ হতে পারে।

‘বাংলার বাঘ’ একে ফজলুল হক একবার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘যে জাতি তার শিশুদের বিড়ালের ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ায়, তারা সিংহের সাথে লড়াই করা কিভাবে শিখবে?’ তিনি হয়তো মনোক্ষুণœ হয়ে এই কথা বলেছিলেন। তিনি দেশের কৃষক-শ্রমিক ও জনসাধারণের অধিকার আদায়ে হুঙ্কার দিতেন, আর শাসকগোষ্ঠী ভয়ে কেঁপে উঠত। আমরা তার উত্তরসূরি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে বীরের মতো যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীন পতাকা পেয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির ক্ষণে এসে বীরের জাতি প্রমাণ করতে, কোমলমতি শিশুদের হাতে নানা ধরনের খেলনা অস্ত্র তুলে দিয়ে তাদের নিষ্পাপ মনোজগতকে কলুষিত করার কোনো মানে হয় না। বরং তাদের হাতে বই তুলে দিন, ভালো বন্ধুর সাথে মিশতে দিন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম বলেছেন, ‘একটি বই একশোটি বন্ধুর সমান। কিন্তু একজন ভালো বন্ধু পুরো একটি লাইব্রেরির সমান।’

শিশুদের হাতে কম্পিউটার, খেলনা প্লেন-হেলিকপ্টার, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি প্রভৃতি তুলে দিতে হবে। তারা তা দিয়ে খেলতে খেলতে শিখে, স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান প্রজেক্টে চ্যাম্পিয়ন হবে। তারা ক্ষুদে বিজ্ঞানী হয়ে উঠবে; বিশ্ব অলিম্পিয়াড, বিজ্ঞান মেলা ও সিম্পোজিয়ামে যাবে। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বে নিজের ও দেশের নাম উজ্জ্বল করবে। এভাবে তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করবে- নাসা, গুগল, মাইক্রোসফট করপোরেশনের মতো কোম্পানির। তাহলে আইনস্টাইন, নিউটন, জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী পাবে দেশ। যেমন সম্প্রতি গুগলের ইউরোপীয় হেড অফিস ডাবলিনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে ডাক পেয়েছেন ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করা অনীক সরকার।

তিনি গুগলের ক্লাউড স্টোরেজ টিমে যোগ দিচ্ছেন। এই সংবাদ আমাদের সবাইকে আশাবাদী করে তুলেছে। অন্যদিকে শিশুদের হাতে খেলনা অস্ত্র তুলে দেয়ার বিষয়টা নিরাশ করে তোলে। তাই অভিভাবকদের উদ্দেশে বলছি, করোনা পরবর্তী সময়ে চাকরির বাজার হয়ে যাবে অতি প্রতিযোগিতামূলক। অনেকে তথ্য-প্রযুক্তিগত যোগ্যতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে চাকরি হারাবে। তারাই টিকে থাকবে যারা তথ্য-প্রযুক্তির জ্ঞান ভালো। এখন ভেবে দেখুন- ছেলেমেয়েদের হাতে ডামি অস্ত্র তুলে দেবেন নাকি কম্পিউটার, সাইন্স ফেয়ার বা বিজ্ঞান মেলার প্রজেক্টের যন্ত্রপাতি ও উপকরণ তুলে দেবেন। আর একটা কথা বলে রাখি- যেসব দেশে অস্ত্রের লাইসেন্স সহজলভ্য; সেসব দেশে ব্যক্তিগত অস্ত্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডও অনেক বেশি। নিউজিল্যান্ডের মসজিদের হত্যাকাণ্ড, আমেরিকা বা ইউরোপের হত্যাকাণ্ড তার নগ্ন উদাহরণ।

গৌরিপ্রসন্ন মজুমদারের দেশাত্মবোধক গানের সুরে বলতে হয়, ‘মা গো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে, তবু শত্রু এলে অস্ত্র হাতে ধরতে জানি,/ তোমার ভয় নেই মা, আমরা প্রতিবাদ করতে জানি।’ আমরা বীরের জাতি, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দেশের মানুষ। আমরা প্রয়োজন হলে হাতে ভারী অস্ত্র তুলে নিতে জানি।

তবে এখনই শিশুদের হাতে বিভিন্ন মডেলের প্লাস্টিক বা ডামি অস্ত্র তুলে দেয়া বন্ধ করতে হবে। সচেতন মহলের প্রত্যাশা- সরকার খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে ডামি অস্ত্রের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, বিপণন ও বিক্রির রাশ টেনে ধরবে। কারণ ভালো মানবিক ও সুস্থ সামাজিক পরিবেশে বড় হওয়া শিশুর ওপর নির্ভর করে জাতির ও দেশের টেকসই ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।

লেখক : এমফিল গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক, গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ