শিক্ষা মন্ত্রণালয় বদলিকে গুরুত্ব দিয়ে ২০১৯ সালে বদলি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে। স্বাভাবিকভাবে যেকোনো পেশায় বদলি একটি মহৌষধের মতো কাজ করে। বদলি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাজে গতি আনয়ন করে কোনো জায়গার বা কাজের একঘেঁয়ে ভাব দূর করে। তার আরাধ্য জায়গায় যেতে সাহায্য করে। তার কাজের মাঝে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। অন্য দিকে অনেকে স্বেচ্ছায় কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়, নিজের সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা প্রয়োগ করে ভালো জায়গায় থাকতে বা যেতে সচেষ্ট থাকে। সব কর্মক্ষেত্রে বদলিব্যবস্থা কার্যকর থাকলে, বিশেষ করে শিক্ষকদের সর্বাগ্রে বদলি করা উচিত।
বদলি কেন?
বেসরকারি শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ১০০০ টাকা, এ মিল রেখে কর্মস্থলের পাশে নিজ বাড়িতে অবস্থানের জন্য বদলির ব্যবস্থা অতি উত্তম। তা ছাড়া, জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-১৯৯৫, ২০১০, ২০১৮ তে বদলির বিষয়টি পরিষ্কার উল্লেখ থাকলেও শুধু নীতিমালার কারণে এখন অবধি বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি বাস্তবায়িত হয়নি।
নীতিমালা-২০১৮ তে বদলির ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা সুস্পষ্ট হলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৯ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বদলি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি গঠন করে এবং ২০২০ সালে তা বাস্তবায়নের জন্য অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে বদলির কথা ছিল। তা এখনো বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
বদলির আশু কারণ
২০০৫ সালের পর থেকে নিবন্ধন পাসের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ শুরু হয়। ২০১৬ সাল থেকে ইনডেক্স ধারী শিক্ষকদের নিয়োগ আবেদন বন্ধ করা হয়। কোনো কারণে কেউ চাকরি হারালে ৩৫ বছর বয়সের পর আর কোনো আবেদন করতে/নিয়োগ পেতে পারবে না। চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্তের রাহুগ্রাস থেকে শিক্ষকদের রক্ষা করতে বদলি অত্যাবশ্যক।
পেশাগত গতি আনতে, একঘেয়েমি দূর করতে এবং গ্রুপিং বন্ধ করতে বদলি দরকার। পরিবার-পরিজনের সাথে থাকা, নিজ এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখা এবং সর্বোপরি শিক্ষকদের মানসিক প্রশান্তি ও আর্থিক সাশ্রয়ের জন্য বদলির বিকল্প নেই।
বদলির উপায়
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু বিষয় বদলির জন্য অন্তরায়। তবুও সমতার ভিত্তিতে বদলি কার্যক্রম চালু হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই উপকৃত হন। বদলি প্রথা/ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য নিম্নলিখিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আমলে নিয়ে সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের মতো বদলি নীতিমালা প্রণয়ন করলে শিক্ষক সমাজ উপকৃত হবে এবং খুব দ্রুত বদলি বা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা যাবে। বদলি চার ধরনের হতে পারে যথা : ১. পারস্পরিক বদলি ২. স্বেচ্ছায় বদলি, ৩. পুরস্কৃত বদলি এবং ৪. তিরস্কৃত বদলি।
১. পারস্পরিক বদলি : সারা বছর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে, সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমপদে ও একই বিষয়ে কর্মরত সম-অভিজ্ঞ ইনডেক্সধারী শিক্ষকরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে এনটিআরসিএ’র বরাবর আবেদন করে পারস্পরিক বদলি নিতে পারবেন।
২. স্বেচ্ছায় বদলি : বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বিশেষ করে এনটিআরসিএ’র নিয়োগের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্যপদের বিপরীতে নতুন নিয়োগের আগে স্বেচ্ছায় বদলির আবেদন চেয়ে এনটিআরসিএ নিয়মমাফিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, সমজাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মরত ইনডেক্সধারী আগ্রহী শিক্ষকরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে অনলাইনে নির্দিষ্ট জেলা/উপজেলা/প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট জেলা/উপজেলা/প্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য হিসাবে সমসংখ্যক শিক্ষক বদলির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে শর্ত থাকা আবশ্যক যে, কোনো প্রতিষ্ঠানে কারো চাকরি নিরবচ্ছিন্ন ও সন্তোষজনকভাবে ৩-৫ বছর পূর্ণ না হলে তিনি বদলির/পুনঃবদলির জন্য আবেদন করতে পারবেন না। কোনো জেলা/উপজেলা/প্রতিষ্ঠানের প্রার্থীর সংখ্যা অধিক হলে সিনিয়রদের (প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচনের নিয়মানুযায়ী) অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বদলি বাস্তবায়ন করা যায়। ৩. পুরস্কৃত বদলি : কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে এই বদলি বাস্তবায়ন করা যায়। ৪. তিরস্কৃত বদলি : কোনো শিক্ষকের জন্য প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত, সামাজিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত এবং শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত/বরখাস্ত হওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হলে ত্বরিত গতিতে এই বদলি কার্যকর করা যায়। বদলির এসব প্রক্রিয়া হবে অনলাইনে (ক্ষেত্রে বিশেষ ভিন্ন)। যেমন তিরস্কৃত বদলি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে এবং সফটওয়্যার/ওয়েববেজড। এখানে এমপিওভুক্তি যেন স্বয়ংক্রিয় হয়। কেননা, সফটওয়্যার বা ওয়েববেজড বদলি হলে শিক্ষকের আবার আবেদনের প্রয়োজন হবে না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থা চালু হলে তাদের প্রাইভেট কোচিং গাইড ও নোট বাণিজ্য অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়। তা ছাড়া দীর্ঘ দিন একই প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করায় শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির গড়ে ওঠা চক্র বদলির কারণে ভেঙে যাবে। ফলে শিক্ষার ও শিক্ষকের মান বাড়বে। অন্য দিকে, শিক্ষকদের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ নীতিবহির্ভূত। তাদের চাকরিচ্যুতি, বহিষ্কার ও ম্যানেজিং কমিটির নির্যাতন কমে যাবে। এতে ভালো শিক্ষকদের কদর ও সম্মান বাড়বে। মেধাবী প্রার্থীদের শিক্ষকতার পেশার প্রতি আগ্রহ বাড়বে। তাই কর্তৃপক্ষ সমীপে আরজ, অবিলম্বে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী বদলির ব্যবস্থা করে বৃদ্ধ মা-বাবার খেদমত করার সুযোগদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।
লেখক : উপাধ্যক্ষ, রোকনউদ্দিন মোল্লা গার্লস ডিগ্রি কলেজ, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ
