বাংলাদেশ পুলিশ দেশের প্রধান অসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পুলিশের মতো বাংলাদেশের পুলিশও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান, অপরাধ দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু আইনের প্রয়োগ আর অপরাধ দমনই নয় দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে এবং সভ্যসমাজ গঠনে পুলিশের ভূমিকা অনেক বেশি।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র এবং উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যরা। এই সশস্ত্র প্রতিরোধটিই এ দেশের মানুষদের কাছে সশস্ত্র যুদ্ধের বার্তা পৌঁছে দেয়। পরবর্তী নয় মাসজুড়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী দেশব্যাপী গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ১,২৬২ জন পুলিশ সদস্যের নাম পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত, ঝিনাইদহের তৎকালীন সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার মাহবুবউদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে গার্ড অব অনার প্রদান করেন।
দেশ পরিচালনায় গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান শক্তি হলো পুলিশ। জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের সরকারের কার্যকর শক্তি হলো পুলিশ। একজন পুলিশ ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতিনিধি। পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে যেমন রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহারের বিরাট দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়; তেমনি রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে নিজের মর্যাদা ও আত্মসম্মান সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে। রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত ক্ষমতাকে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা জনগণের ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতা জনগণের স্বার্থে ব্যবহার করাই হলো পুলিশের মহান দায়িত্ব ও কর্তব্য।
পুলিশ বিভাগকে বলা হয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির বিচার করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের কিন্তু বিচারবিভাগীয় রায় বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব পুলিশের। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি তথা ন্যায়বিচার লাভের পরিবেশ সৃষ্টির কাজটি সহজ হয়। আইনের সঠিক প্রয়োগ না করে শুধু কোর্ট আদালতে মামলা-মোকাদ্দমার মাধ্যমে সমাজে স্থায়ী শান্তিশৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। আইনের সৎ ও সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে সকল সতর্কতা পুলিশকে দেখাতে হবে যাতে অন্যায়কারীরা ভয়ভীতির মধ্যে থাকে এবং ভালো লোকেরা নিশ্চিত থাকতে পারে যে,আইন তাদের মিথ্যা হয়রানি থেকে রক্ষা করবে। পুলিশদের মধ্যে এই জ্ঞান সমৃদ্ধ করতে হবে যে, যে কেউ এসে কারো বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলেই তা এজাহার হিসেবে লিপিবদ্ধ না করে আগে তা যাচাই করতে হবে। নিশ্চিত হতে হবে মামলার ঘটনা সত্য কিনা। কারণ ইদানীংকালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সামান্য ব্যাপারেই ক্ষমতা প্রদর্শন স্বরূপ মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়। এ ছাড়া কথায় কথায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক এমনকি ভিন্নমতাম্বলীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে কঠিনভাবে নাজেহাল করার দৃষ্টান্ত অহরহ।
এতে সমাজে দীর্ঘকালীন প্রতিপক্ষ তৈরি হয় এবং তা সমাজে অশান্তি ও বিভাজনের সৃষ্টি করে। পুলিশের পক্ষে আইনের সঠিক পথ অবলম্বন না করলে অন্যায়কারী ও অপরাধীরা আইনকে ভয় পায় না। এর ফলে সমাজে অন্যায়-অবিচার বেড়ে যায়। অবশ্য আইনের সঠিক প্রয়োগ সম্পর্কে সমাজে আস্থা অর্জন করতে পারলে সমাজের ন্যায়পরায়ণ ও জ্ঞানী লোকেরাও শক্তি ও সাহস পাবে অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে, পুলিশকে সহযোগিতা করতে।
পুলিশ জনগণের সেবক। জনগণ পুলিশকে সাহায্যকারী হিসেবে পেতে চায়, ত্রাস হিসেবে নয়। পুলিশের কিছু কাজ জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করলেও জঙ্গিবাদ দমন এবং নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে।
গত এক দশকে জঙ্গিবাদ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও সবচেয়ে বেশি ঘুষ, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ির কারণে জনগণের কাছে পুলিশ আতঙ্কের বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্বার্থে অতিমাত্রায় ব্যবহৃত হওয়ার ফলে একশ্রেণীর পুলিশ কর্মকর্তার মনে এই ধারণার সৃষ্টি হয়েছে যে, সরকারকে শুধু প্রশাসনিক সহায়তা দানই নয়; রাজনৈতিক সহায়তা দানও তাদের কর্তব্য। দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এবং দেশের শত্রু জঙ্গিবাদ দমনে তাদের কঠোরতা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কার্যকলাপ জননিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক না হলে পুলিশকে অবশ্যই সংযত ও পক্ষপাতশূন্য হতে হবে। পুলিশকে সঠিকভাবে চলার নৈতিক শক্তি ও নেতৃত্বদান অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিশেষের অন্যায় কাজে ব্যবহৃত হওয়ার হাতিয়ার নয়, এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে। শুধু ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্বার্থসিদ্ধি নয়, পুলিশকে গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে। সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়ভিত্তিক সুন্দর সমাজ গঠনে পুলিশ কার্যত দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বৈরশাসনের চিন্তাভাবনা দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সফল করা সম্ভব নয়। পুলিশ দিয়ে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠকে দমন করে কিংবা অন্যের ভোটের অধিকার হরণ করে গণতন্ত্রের নাম নেয়া ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই না। জনগণের কাছে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি যাতে ন্যায়ের প্রতীক, আইনের অনুশাসনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সেই প্রচেষ্টা থাকা উচিত। পুলিশ যখন জনগণের কাছে আতঙ্ক হয়ে দাঁড়াবে কিংবা পুলিশের নির্যাতনের ভয়ে মানুষ যখন তার অধিকারের কথা বলতে সাহস পাবে না, তখন সেই রাষ্ট্র পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচিত হবে, যা গণতান্ত্রিক সরকারের পরিপন্থী।
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট নেদারল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য সংগঠিত সংগ্রামের সফল নেতৃত্বদানকারী জাতিরজনক হিসেবে স্বীকৃত সুকর্ন তার আমলে পুলিশ বাহিনীকে কিভাবে ব্যবহার করে ছিলেন এবং পরিণতি কি হয়েছিল প্রসঙ্গক্রমে সেই গল্প আজকের এই নিবন্ধে লিখতেই হলো। ‘সুকর্ন তার দেশ পরিচালনার জন্য পশ্চিমা গণতন্ত্রের পরিবর্তে এক নতুন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। তার নাম দিয়েছিলেন ‘সীমিত গণতন্ত্র’ (খরসরঃবফ উবসড়পৎধপু) । তিনি বলেছিলেন, উন্নয়নশীল দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য পশ্চিমা গণতন্ত্র কার্যকর নয়। রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের হাতে বেশি ক্ষমতা রাখা দরকার। তাই তিনি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের হাতে একটু বেশি ক্ষমতা দিয়ে এবং দলীয় রাজনীতিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে গিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকেন। তার সমালোচকরা ‘সীমাবদ্ধ গণতন্ত্র’কে গণতান্ত্রিক পুলিশি রাষ্ট্র আখ্যা দেন। গণতান্ত্রিক বিরোধিতার ক্ষেত্রে বিরোধী দলকে শূন্য করতে গিয়ে তিনি সামরিক বাহিনীকে সেই শূন্য অবস্থা পূরণের সুযোগ করে দেন। শেষ পর্যন্ত জেনারেল সুহার্তো রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে নেন।’ ২১ জুন ১৯৭০ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সুকর্নকে গৃহবন্দী থাকতে হয়।
আজ বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনপীড়ন করতে গিয়ে পুলিশ বাহিনীকেও একইভাবে ব্যবহারের উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে। তারা অনেকক্ষেত্রেই পেশাদারিত্বের নৈতিক অবস্থান রক্ষা করতে পারছে না। সরকারের হুকুমে চলতে বাধ্য হচ্ছে। এতে পুলিশ নিজের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অপহরণ, গুম, খুনের মতো অভিযোগ উঠছে। কিন্তু তাদের কাজ তো অপরাধীকে ধরে এনে আইনের কাছে সোপর্দ করা। সেটি না করে পুলিশের কতিপয় সদস্য পুরো বাহিনীকে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এভাবে চললে রাষ্ট্রীয় একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর শ্ঙ্খৃলা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে। সেটা হবে রাষ্ট্রের জন্য অশনি সঙ্কেত।
পুলিশ জনগণের সেবক হোক, রাজনৈতিক কর্মী নয়। কোনো দলেরই উচিত নয়, পুলিশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, বর্তমান সময়ে সেটিই ঘটছে। মেধা ও যোগ্যতার বিচার না করে দলীয় বিবেচনায় পুলিশে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এর ফলে তারা প্রায়শ দলীয় বৃত্তে বাধা পড়ে। নিয়োগকারী দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে।
পুলিশের কিছু সদস্যের অনেক অপরাধমূলক কাজেও জড়িয়ে পড়াও গোটা পুলিশ বাহিনীর ইমেজের ওপর আঘাত করছে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশের বাড়াবাড়ির কারণে অনেক ভালো কাজের প্রশংসা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পুলিশের বেতন, বোনাস এমনকি পোশাক, তেল, সাবানের ব্যবস্থা হয়। সেই পুলিশ জনগণের অধিকার সংরক্ষণে তৎপর থাকবে এটিই কাম্য। এর বিপরীত হলে তা দুর্ভাগ্যজনক। পুলিশের উচিত প্রতিপক্ষ না হয়ে জনগণের বন্ধু হয়ে কাজ করা। কারণ সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা বজায় না থাকলে অদূর ভবিষ্যতে কারো পক্ষেই ভালো থাকা সম্ভব হবে না।
তাই আমরা মনে করি, পুলিশকে একটি যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে তৈরি করার জন্য মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া এবং তাদের উপযুক্ত ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। মানসিকভাবে তাদের জনগণের সেবক হিসেবে তৈরি করতে হবে। আইনের অনুশাসন এবং জনগণের অধিকার সম্পর্কে পুলিশ যাতে সজাগ থাকে সে বিষয়ে কোর্সভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। পুলিশকে স্মরণ রাখতে হবে, তারা জাতীয় বাহিনী। তাদের পোশাক এবং শপথের মর্যাদা রক্ষা করা তাদেরই দায়িত্ব। মর্যাদার প্রশ্নে তাদের কোনো কিছুতেই আপস করা উচিত নয়। এই সমাজ এই দেশ তাদেরও। একটি সুন্দর সভ্য সমাজ গঠন করতে পারলে তাদের সন্তানরাও নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবে।
harun_980@yahoo.com
