দেশে দেশে সামরিক শাসকদের প্রথম কথাটি কী হয়? গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বেসামরিক শাসকদের সীমাহীন ব্যর্থতা যখন গণতন্ত্র রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখনই সামরিক শাসকের আবির্ভাব ঘটে। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর তারা আর সরে যেতে চান না। আবার একইভাবে নামার সিঁড়িটিও প্রথম দিনেই ভেঙে ফেলায় সে সুযোগও পান না। সামরিক শাসক যে কেবল নিজের শক্তিতেই ক্ষমতা দখল করেন তা নয়। ভূ-রাজনৈতিক নানা শক্তি তাদের উসকে দেয়। বেসামরিক শাসকরাও প্রলুব্ধ করে। নিজে ক্ষমতায় থাকতে না পারলে অন্যেরা কেন থাকবে? বেসামরিক শাসককে গণতান্ত্রিক পথে বিদায় করতে না পারলে বিকল্প থাকে সামরিক শাসন।
উত্তর-উপনিবেশ দুনিয়ায় রাষ্ট্রপরিচালনার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর ছিল বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে বিশ শতকের শেষ পর্যন্ত। একুশ শতকে এই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, অনেক দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর। অনেক দেশে সরাসরি সামরিক শাসন না থাকলেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারই সামরিক একনায়কের মতো আচরণ করছে। অনেক দেশে পরিপূর্ণ বেসামরিক সরকার থাকলেও গণতন্ত্র কতটা কার্যকর তা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রশ্ন উঠেছে বলেই সমাধান খোঁজার চেষ্টা চলেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে গবেষণা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও এ নিয়ে জানতে আগ্রহী। এটি বোঝা যায় হামজা আলাভি, হান্টিংটন বা অধ্যাপক রাজ্জাকদের বক্তব্য পড়ার আগ্রহ দেখে।
এ ধরনের বিষয় নিয়ে বই বা গবেষণা বাংলাদেশে বেশি হয়নি। তবে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ আছে। এ দিক থেকে আমীর খসরুর বইটি বিশিষ্ট। তিনি সরাসরিই বলেছেন, সামরিক শাসন কিংবা সামরিক প্রাধান্যের সরকার কোনো দেশেই উন্নয়ন করতে পারে না; বরং এতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক- সব ক্ষেত্রের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা পিছিয়ে যায়। বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের ৫৬ শতাংশ দেশে সামরিক শাসন চলছে। আর ৫৭ শতাংশ দেশে দীর্ঘকাল ধরেই সামরিক শাসন অব্যাহত। এ সব দেশে রাজনীতি থেকে খুব কমই স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার হয়েছে। তবে যখন গণ-আন্দোলনের চাপে সেনাবাহিনী কর্তৃত্ব হারায় ও বেসামরিক নেতৃত্বের হাতে সর্বময় ক্ষমতা ছেড়ে দেয় এবং বেসামরিক নেতৃত্ব ক্যান্টনমেন্ট ছাড়াই নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে- ঠিক তখনই স্থায়ীভাবে রাজনীতি থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহার সম্ভব।
তার মতে, সামরিক অভ্যুত্থানকারীদের অধিকাংশ নেতাই ক্ষমতা পেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়েন। উপর্যুপরি অভ্যুত্থানে সমাজ ও রাজনীতি নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমন একটি ক্ষয়প্রাপ্ত সমাজ, একটি বেসামরিক গণতান্ত্রিক সরকার বা শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনে এরা সক্ষম হয় না। তুরস্ক, সিরিয়া বা ইরাকে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এসব দেশে পরিপূর্ণ স্বচ্ছ বেসামরিক সরকার গঠনের সম্ভাবনা খুবই কম।
হেনরি কিসিঞ্জাররা কিভাবে দেশে দেশে গলাটিপে গণতন্ত্র হত্যা করেছেন, সামরিক শাসন উসকে দিয়েছেন সে সব প্রসঙ্গ আমীর খসরুর বইতে আরো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাশিত ছিল। নিজেদের স্বার্থে তারা তাদেরই স্বাদের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাক-স্বাধীনতা পদদলিত করেছেন, সেটি আরো প্রকট করা দরকার ছিল। এমনকি বর্তমানে বিশ্বব্যাপী যে নৈরাজ্য চলছে, তার দায়ভার এই পাশ্চাত্যেরই। উপনিবেশবাদী নীতির মাধ্যমে পুরো পৃথিবীকে তারা তছনছ করেছে। পাশ্চাত্যের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা চাপিয়ে দিতে গিয়ে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মানবিক মূল্যবোধ শেষ করে দিয়েছে। একরৈখিক বিশ্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের শাসন চিরস্থায়ী করার বিধ্বংসী চেষ্টা বিশ্বকে যে ক্ষতির মুখে ফেলেছে, তা অন্য কোনো কালে হয়নি। বিষয়টি নিয়েই পৃথক অধ্যায় থাকতে পারত।
আমীর খসরু ভূমিকায় জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের বিপরীতমুখী বিশাল যাত্রা নতুন করে ভিন্ন মাত্রায় শুরু হয় ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারের হামলার পর থেকে। ‘ওয়্যার অন টেরর’ বা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’, উগ্রবাদ দমনের নামে একনায়কতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যবস্থার উত্থান ঘটতে থাকে। ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ইমেয়েন, আফগানিস্তানে হামলা এবং শাসকদের হত্যা করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে সরকার ও শাসক পরিবর্তন করা হয়। পুরো বিশ্বব্যবস্থায় এসব ওলট-পালটের সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে উগ্রবাদ এবং সন্ত্রাস দমনের নামে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইন প্রণয়নের নামে সাধারণ মানুষের বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকার এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিষয়টি আরো বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ, পাকিস্তানে এর তাৎপর্য আলাদা অধ্যায়ের দাবি রাখে। অনেকেই মনে করেন, পাকিস্তানে নওয়াজ সরকারের পতন, বাংলাদেশে ওয়ান-ইলেভেনের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে নাইন-ইলেভেনের।
আবার সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার পেছনে বেসামরিক শাসকদের ব্যর্থতার বিষয়গুলো বইতে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। দোষ কেবল সামরিক শাসকদের ছিল না। তাদের আসার সুযোগ কিন্তু বেসামরিক শাসকরাই এনে দিয়েছে। জনগণ সামরিক বাহিনীর কাছে স্বস্তি পেতে চেয়েছে। এ নিয়েই একটি অধ্যায় থাকতে পারত।
বইটিতে বাংলাদেশের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রসঙ্গ মুখবন্ধেই এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখোশধারী সেনা সরকারের কঠোর সমলোচনাও করা হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের শাসনকাল নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিও সবার জানা’- এই বাক্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রভাব বাংলাদেশের বেসামরিক শাসনের ক্ষেত্রে কেমন হয়েছে, সেটিকে মডেল ধরে উপসংহার টানা হলেই মনে হয় ভালো হতো। নানা সীমাবদ্ধতায় তিনি এটি করতে পারেননি, সেটিও বাস্তব।
বইটিতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কিন্তু অনেক অসীমের দরজাও যে খুলে দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমীর খসরুকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার দরকার নেই। দীর্ঘ সাংবাদিক জীবনে তিনি যথেষ্ট মেধার পরিচয় দিয়েছেন, কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে সাংবাদিকরা তো দেশ-সমাজ-মানুষ নিয়েই কাজ করেন। এই কাজ করতে গিয়ে তাদের চোখে এমন অনেক কিছু ধরা পড়ে, যার বেশির ভাগই অন্যদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। আমীর খসরুর মতো সাংবাদিকরা তা আরো ভালোভাবে দেখতে পান। সমস্যার অনেক গভীরে যেতে পারেন তারা। খসরু কেবল সমকালীন দুনিয়ার রাজনীতি নিয়েই পড়াশোনা করেননি, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়েও নজর দিয়েছেন। ফলে একটি সমস্যাকে তিনি নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারেন। তিনি সেটিই করেছেন। ফলে ‘সঙ্কটে গণতন্ত্র : সামরিক শাসনোত্তর বেসামরিক শাসনের সমস্যা’ বইটি অনবদ্য হয়ে উঠেছে।
