উপসম্পাদকীয়
ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে পরবর্তী যুদ্ধের কেন্দ্র কোথায় হবে, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সৌদি আরব ইতোমধ্যে যুদ্ধের অভিঘাত নিজের ভূখণ্ডে অনুভব করছে। তবে ইরান ও সৌদি আরব উভয়েই জানে, সরাসরি যুদ্ধের মূল্য ভয়াবহ। তাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হলো— পূর্ণাঙ্গ ইরান-সৌদি যুদ্ধ নয়; বরং একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রক্সি ও অবকাঠামোগত যুদ্ধ। কিন্তু প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো— কোনো একটি হামলা হঠাৎ করে রাষ্ট্রীয় যুদ্ধের দরজা খুলে দিতে পারে। তখন প্রশ্ন হবে— মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা কে নির্মাণ করবে? যুক্তরাষ্ট্র? চীন? ইরান? সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান? নাকি শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মধ্যপ্রাচ্য এমন এক বহুমেরু সঙ্ঘাত অঞ্চলে পরিণত হবে, যেখানে কোনো একক শক্তিই আর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না? সম্ভবত দ্বিতীয়টিই বেশি বাস্তবসম্মত।
সমাজের অবক্ষয় রোধে মূল্যবোধের অনুশীলন জরুরি
প্রতিটি সমাজেই কালে কালে যুগে যুগে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তি থাকে। এ ধরনের ব্যক্তিদের শত প্রতিকূলতার মুখে মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে দেখা যায় না। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কর্র্তৃত্ব, ক্ষমতা ও প্রভাব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া ছাত্রদের দেখা গেল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়ে কাস্টমস ও পুলিশ বিভাগের চাকরিকে প্রশাসন বিভাগের চাকরির ওপর প্রাধান্য দিচ্ছেন। যদিও পাকিস্তান আমলে মহকুমা, জেলা, বিভাগ, প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিল; কিন্তু এরপরও পুলিশ বিভাগের চাকরি কম লোভনীয় ছিল না।
বাকস্বাধীনতার সীমারেখা
বাকস্বাধীনতা এমন একটি অধিকার, যার সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি এর দায়িত্বশীল চর্চাও উপেক্ষার নয়। নাগরিকের দায়িত্ব ক্ষোভকে যুক্তিতে রূপ দেয়া। ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে নীতির সমালোচনা করা। নিজের বক্তব্যের সামাজিক ও আইনগত পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শক্তি কতজন ভিন্নমতাবলম্বীকে গ্রেফতার করা হলো, তা দিয়ে মাপা যায় না। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সেটিই, যে নাগরিকের তীব্র বা কটু সমালোচনাও অনায়াসে সহ্য করে। অপরাধ হলে প্রাসঙ্গিক আইনে ব্যবস্থা নেয়। আর ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে নিজেকে সংযত রাখে। কারণ বাকস্বাধীনতার প্রকৃত সীমারেখা শুধু নাগরিকের মুখে নয়, রাষ্ট্রের ক্ষমতায়ও টানা থাকে।
ইসলামী কূটনীতি ও ‘আমুল উফুদ’
‘আমুল উফুদ’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের সবচেয়ে কার্যকর কূটনীতি জন্ম নেয় ক্ষমতার প্রদর্শনী থেকে নয়; বরং সম্মান, ধৈর্য আর দূরদর্শী প্রজ্ঞা থেকে। আজকের বিশ্ব যখন বিভাজন আর অবিশ্বাসে ভুগছে, তখন চৌদ্দ শ’ বছর আগের এই মডেল— সংলাপ, ন্যায়বিচার, বহুত্ববাদী সহাবস্থান আর তরুণ নেতৃত্বের ওপর আস্থা— হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের শান্তি ও উন্নয়নের একটি বাস্তব দিকনির্দেশনা।
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর হনুজ দূর অস্ত!
বাংলাদেশের ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, জনগণই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির উৎস। যখন জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও রাষ্ট্রের নীতির মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়, তখন পরিবর্তনের দাবিও দুর্বার হয়ে ওঠে। জুলাই চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান তার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক; কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে, তার ওপর। ইতিহাস আমাদের সামনে সুযোগ এনে দিয়েছে; সেই সুযোগকে জাতীয় অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার দায়িত্ব এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা ও সর্বস্তরের সচেতন জনগণের
মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক সঙ্কট ও বিনিয়োগ
একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি, অর্থনীতির সফলতা কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে বাজার করতে পারে, উদ্যোক্তা আস্থার সাথে বিনিয়োগ করতে পারে, ব্যাংকে আমানত রাখলে নিরাপত্তা অনুভব করে এবং তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং রাজস্ব সংস্কার— এই চারটি ক্ষেত্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু বর্তমান সঙ্কট মোকাবেলা করবে না; বরং আগামী দশকের জন্য আরো টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও গড়ে তুলতে পারবে।


















