একটি দেশের আর্থিক মেরুদণ্ড বা চালিকাশক্তি সে দেশের ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রিজার্ভ এবং সক্ষমতা। আর এটাকে ধরে রাখতে হলে দরকার সঠিক প্রশাসনিক অবকাঠামো। এই অবকাঠামো যখন দুর্বল হয়ে যায় তখন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এ জন্য দায়ী প্রশাসনিক পদে যারা আছেন তাদের কর্মকৌশল এবং যোগ্যতা ও প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাব। এর কোনোটার ব্যত্যয় ঘটলে এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা যায় না। আর এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক লোকেরা যদি দুর্নীতি ও লোভের শিকার হয় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান বিপন্ন হবেই। বিভিন্ন পত্রিকার সূত্র অনুযায়ী, গত সাত-আট বছরে দেশে ব্যাংকিং খাতের লুটপাটের বিষয়ে বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক ও কিছু প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অবস্থা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। ব্যাংকিং খাতের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কতটুকু দায়িত্বশীল, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।
বছর দেড়েক আগে আজাদ আলম (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ফ্যাট কেনার জন্য। ১৫ বছর মেয়াদি এ ঋণের মাসিক কিস্তি ছিল সাড়ে ২৩ হাজার টাকা। তিনি প্রতি মাসে নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করে আসছিলেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই কিস্তি বেড়ে হয়েছে ২৬ হাজার টাকা। হিসাব কষে দেখেন, ১৫ বছরে তাকে আড়াই লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে (যদি ঋণের সুদহার আর না বাড়ে)। শাখা ব্যবস্থাপককে কিস্তি বেড়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি জানান, সুদ হার বেড়ে গেছে। এ কারণে কিস্তির হারও বেড়ে গেছে।
তার মতো অনেক গ্রাহকই তাদের এ দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। অন্য এক গ্রাহক আক্ষেপ করে জানান, তিনি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ব্যাংক থেকে। মাসে ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কিস্তি দিতেন। হঠাৎ কিস্তি বেড়ে ৩১ হাজার টাকা হয়েছে। শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, মুনাফা বেড়ে হয়েছে ১৩ শতাংশ, যা ঋণ মঞ্জুরের সময় ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। তাই কিস্তির পরিমাণও বেড়ে গেছে।
ওই গ্রাহক আপে প্রকাশ করে জানান, ছোট গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে অল্প টাকা ঋণ নিয়ে তা যথাযথভাবে পরিশোধ করেন। অথচ তাদের ঘাড়েই অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়। কিন্তু যারা শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না তাদের সুদ মওকুফ করে দেয়া হয়, না হয় ঋণ পুনর্গঠনের নামে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। খেলাপি ঋণ আদায় করা হলেও সুদের হার অনেক কম।
হঠাৎ ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক গ্রাহক জানিয়েছেন, বাজারে সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু সে অনুযায়ী, বেতনভাতা বাড়েনি। মূল্যস্ফীতি হিসেবে আনলে প্রকৃত আয় নেগেটিভ হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা এখন ঋণে আছেন। ফলে ব্যয় কমিয়ে নির্ধারিত আয় দিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতিতে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং আবার বাড়বে পণ্যের দাম। এ কারণে তাদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে। প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে ঋণের সুদ হার কম থাকার অন্যতম কারণ ছিল আমানতের সুদহার কম থাকা। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সঙ্কট। এক দিকে নগদ টাকার সঙ্কট, অন্য দিকে আমানত কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি, যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছেÑ বিশেষ করে বড় ঋণ গ্রহীতারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।
ফলে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়; কিন্তু ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এদিকে নগদ টাকার প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্যাংক আমানত প্রবাহ বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে। আমানত বাড়াতে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। সেই সাথে, ঋণের সুদহারও বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই বলে ওই এমডি জানিয়েছেন।
তবে অন্য একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, খেলাপিঋণ ব্যাংকিং খাতকে তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ সোয়া লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশির ভাগ ঋণই কুঋণ বা আদায় অযোগ্য। এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো সুদ আয় স্থগিত রাখছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সমতা কমে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলো টিকেই আছে ছোট ও মাঝারি গ্রাহকের জন্য। কেবল এ মানের গ্রাহকেরাই ঋণ পরিশোধ করছেন। বড় গ্রাহকেরা রাজনৈতিক আশীর্বাদ নিয়ে ঋণ পরিশোধ করছেন না বছরের পর বছর। অর্থনীতিবিদদের মতে, এরাই এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বছর খানেক আগেও ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার মতো। তখন ধারণা ছিল, অতিরিক্ত টাকায় ব্যাংকগুলো সয়লাব হবে। কিন্তু এক বছরের মাথায় ব্যাংকগুলোর এত সঙ্কটাপন্নদশা পরিলতি হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে ওই সূত্র জানিয়েছে, সঞ্চয়পত্রের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যাংকের আমানত প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। কিন্তু ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপর রয়েছে। যেখানে আমানতের চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা, সেখানে হচ্ছে তার উল্টো; এখানেই বিপত্তি। বিষয়টি আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আসা উচিত ছিল। কেননা আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, হয় ঋণের টাকা পাচার হচ্ছে, না হয় ব্যাংকিং খাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলছেন ওই পণ্য আদেশ আসছে কিনা; বা যে কারণে ঋণ নেয়া হচ্ছে, ওই খাতে ব্যয় হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা উচিত। তাহলে হয়তো ব্যাংকিং খাতকে এই পরিণতি ভোগ করতে হতো না।
সামনে এ সঙ্কট যাতে না বাড়ে সেজন্য ব্যাংকগুলোর ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে হবে এবং সেই ঋণ নির্দিষ্ট খাতেই ব্যয় হচ্ছে কিনা তা তদারকি করতে হবে। তা না হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কষ্টার্জিত মধ্যম আয়ের দেশের অর্জন বিফলে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তদারকি বাড়াতে হবে। অন্যথায় সামনে সঙ্কট আরো বেড়ে যাবে, বেড়ে যাবে ঋণের সুদের হার। এতে বাড়বে জনগণের দুর্ভোগ। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান করে আর্থিক অবকাঠামো ঠিক রেখে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি ঠিক রাখা হবে বলে জনগণের প্রত্যাশা।
www.arthoniter30din.com
একটি দেশের আর্থিক মেরুদণ্ড বা চালিকাশক্তি সে দেশের ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের রিজার্ভ এবং সক্ষমতা। আর এটাকে ধরে রাখতে হলে দরকার সঠিক প্রশাসনিক অবকাঠামো।...
