মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটে গেল সম্প্রতি বন্দরনগরীর বাদামতলী এলাকায়। আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী সাদিয়া আগ্রাবাদে শাহজালাল চশমা মার্কেটে চশমা কিনে বাসায় ফেরার পথে বাদামতলী মাজার গেটের সামনে প্রাইম ব্যাংকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রাত ১০টার দিকে পা পিছলে খোলা নালায় পড়ে যান। আর এতেই জীবনের জন্য হারিয়ে গেলেন সাদিয়া। আর কোনোদিন সাদিয়া ফিরে আসবেন না এই দুনিয়ার জীবনে। জাগতিক জীবনে অনেকগুলো স্বপ্ন বুনতে থাকা মেধাবী ছাত্রী লাশ হয়ে ফিরলেন তার মা-বাবার কাছে। এর চেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা আর কী হতে পারে? মা-বাবার স্বপ্ন ছিল, সাদিয়া উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা পাবে। মনের মাঝে জমে থাকা স্বপ্নগুলো বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু সেই আশা অকালেই ঝরে গেল। আইআইইউসি কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্রী সাদিয়া আর কোনোদিন আসবেন না তার সহপাঠীদের কাছে। অকালে ঝরেপড়া সাদিয়াকে সমাহিত করার মাধ্যমেই শুরু হয়ে গেল তার কিয়ামতের প্রথম ধাপ। আমরা সাদিয়ার জন্য প্রাণভরে দোয়া করবÑ তার কবরের হিসাব যেন সহজ হয়ে যায়। জিন্দেগির সমস্ত গুনাহ আল্লøাহ তায়ালা যেন মাফ করে দেন। তার এই অকাল মৃত্যু যেন নাজাতের উসিলা হয় সেই কঠোর বিচার দিবসে। এটি নতুন কোনো ঘটনা নয়, এর আগেও আরো চারজন এভাবেই খোলা নালায় পড়ে মৃত্যুর কাছে হার মেনেছেন। গত ২৫ আগস্ট মুরাদপুর মোড়ে নালায় পড়ে নিখোঁজ হওয়া ব্যবসায়ী সালেহ আহমেদের কোনো হদিস অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। আমাদের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসমূহ যেন শীতনিদ্রায় আছে। সিটি করপোরেশন ও সিডিএর মধ্যকার কর্তৃত্বের টানাপড়েন নিয়ে চলছে প্রহসন, আর এটা কতদিন চলবে? তাদের দ্বন্দ্বে বলি হতে হচ্ছে নিরীহ পথচারীদের। সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খোলা নালা ও খালে স্ল্যাব দিয়ে ঢেকে দেয়া হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন, নগরবাসী এখনো জানেনা। এরই মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এম মঞ্জুর আলম ট্রাকভর্তি স্ল্যাব নিয়ে বর্তমান মেয়রের কাছে হাজির হলেন। এর পরও যেন টনক নড়েনি প্রশাসনের। এভাবে আর কত সাদিয়া আর সালেহ আহমেদের জীবনহানি হবে, তা কেউ জানে না। নগরীর অনেকগুলো খাল এবং নালা অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে বৃষ্টির সময় এগুলো একাকার হয়ে যায়। এর আগে ৩০ জুন নগরীর চশমা খালে যাত্রী বোঝাই সিএনজি ট্যাক্সি পড়ে দুইজন নিহত হন। এর আগেও মোহাম্মদ আলী রোডেও নালায় পড়ে মারা গেছেন একজন। গত বছরও হালিশহর ইসলামিয়া ব্রিক ফিল্ড এলাকায় মহেশখালে পড়ে দুই কিশোরীর মৃত্যু হয়। এভাবে একের পর এক তরতাজা প্রাণগুলো নালায় পড়ে ভেসে যাচ্ছে অনির্দিষ্ট ঠিকানায়। এত সব করুণ ঘটনা ঘটার পরও প্রশাসন যেন বেখবর। নগরীর নালাগুলো যেন একেকটি ভয়াল মৃত্যুকূপ। এগুলো বড়ই আতঙ্কের। এগুলোর কাছে গেলে গা শিউরে উঠে। আর বৃষ্টির সময় তো কোনো কথাই নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো চট্টগ্রাম নগরী ছোটখাটো সমুদ্র হয়ে যায়। এর ওপর ভাসমান আতঙ্কিত ভয়ার্ত নগরবাসী : কখন কার কপালে কি জোটে এই আতঙ্কে। এতগুলো প্রাণ সংহারের পরও খোলা নালাগুলোর উপর স্ল্যাব বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আর কত প্রাণ যাবে? সে প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে। সাদিয়ার মতো মেধাবী ছাত্রী আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। কিন্তু অন্য সাদিয়াদের জীবন বাঁচাতে হবে। আর সেই লক্ষ্যেই এগোতে হবে অতি শিগগিরই নগরপিতাকে। আমরা আকুল আবেদন জানাই, দ্রুত যেন উন্মুক্ত নালাগুলোতে স্ল্যাব বসানোর কাজটা শুরু হয়। একটি মৃত্যুর পর অনেকগুলো প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কিন্তু হায়, নিয়তির পরিহাস, সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার কেউ নেই। নগরে তোলপাড় শুরু হয়। এর কিছুদিন পর সব থিতিয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতাদের মতবিরোধ, সেবা সংস্থাগুলোর মাঝে রশি টানাটানি সাদিয়ার মতো অনেক মৃত্যুকে জানান দিয়ে যাচ্ছে। আকাশে মেঘ দেখলেই নগরবাসীর মাঝে ভয় শুরু হয়ে যায়। এই তো শুরু হবে বৃষ্টি। আর তলিয়ে যাবে নগরীর রাজপথ, খাল ও নালা। সব একাকার হয়ে থুবড়ে পড়বে নগরবাসী। প্রকল্প আসে আর যায়Ñ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যায় পুরো নগর। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ভোগান্তি বাড়ে নগরবাসীর। ফ্লাইওভার করে লাভ কি? এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করে লাভ কি? যদি নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়। উপরে ফুটওভারব্রিজ আর নিচে মৃত্যুকূপÑ এই প্রহসনের মানে কী? নগরবাসী এই বঞ্চনা আর প্রহসন মেনে নেবে না। আমরা চাই সমন্বিত পদক্ষেপ, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে উপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ যে সিদ্ধান্তের আলোকে সাজানো হবে সুন্দর নগরী। আত্মম্ভরিতা আর অহঙ্কারের কবলে পড়ে নগরবাসীকে ঠকানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। এর শেষ কোথায়? আশায় দিন গুনছি। হ
লেখক: সিনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি), জেনারেল হাসপাতাল, রাঙ্গামাটি