পৃথিবীতে কেউ পথশিশু হয়ে জন্ম নেয় না। অন্য দশটি শিশুর মতোই জন্ম হয়। সমাজ তাদেরকে পথশিশু বানায়। পথেঘাটে বা রাস্তায় তারা বেড়ে ওঠে বলে অনেকে তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নাক সিটকান। তারাও অন্য সবার মতো রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ। তারা কেউ এমনি এমনি পথশিশু হয়ে যায়নি। এর পেছনেও রয়েছে একটি বেদনার গল্প। তাদের খাওয়ার কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। ঘুমানোর জায়গা পর্যন্ত কপালে জোটে না। প্লাস্টিকের বোতল কিংবা এক টুকরো কাপড় মাথার বালিশ হয়ে যায়। মশার যন্ত্রণায় যেখানে আমরা মশারি ছাড়া ঘুমাতে পারি না সেখানে তারা খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। যেখানে রাত সেখানেই তাদের কাত হতে হয়!
তারা দেশ সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ। তাদের মাধ্যমেই নতুন এক পৃথিবী গড়ে উঠবে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার বিখ্যাত কবিতা ছাড়পত্রে লিখেছেন- ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান; জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে। চলে যেতে হবে আমাদের। চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি- নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ কবি জঞ্জাল সরিয়ে পৃথিবীকে শিশুদের জন্য বাসযোগ্য করে যেতে চেয়েছিলেন। বাসযোগ্য হওয়া তো দূরের কথা মৌলিক অধিকারটুকু পথশিশুরা পাচ্ছে না। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু বলেছিলেন, শিশুরা বাগানের কুঁড়ির মতো এবং তাদের যতœসহকারে এবং ভালোবাসার সাথে লালন-পালন করা উচিত। কারণ তারা জাতির ভবিষ্যৎ গতি নির্ধারণ করবে। অথচ আমাদের চোখের সামনেই পথশিশুরা নেশাখোর, ছিনতাইকারী কিংবা টোকাইয়ে পরিণত হচ্ছে।
আজকের শিশুদের মধ্যে থেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী ও দেশনায়ক হবে। কিন্তু আমরা কী দেখছি? শিশুরা মাদকের নেশায় ভয়ানক সব অপরাধে জড়াচ্ছে। এমনি এমনি কেউ পথশিশু হয় না। হওয়ার পেছনে রহস্য লুকায়িত আছে, যা আমরা জানি না। যে শিশু বাবা-মায়ের কোলে পরিবারের সঙ্গে থাকার কথা সে শিশু কিভাবে রাস্তায় গেল? সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি। একজন শিশু পথশিশুর তকমা যে কারণে পায় তা হচ্ছে, দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাস্তচ্যুত, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ, বাবা-মার মৃত্যু, গ্রাম থেকে শহরে কাজের খোঁজে এসে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। ক’দিন আগে রাজধানীর আসাদ গেটের ফুট ওভারব্রিজের উপর দিয়ে যাচ্ছি এমন সময় চোখে পড়ল চার-পাঁচ পথশিশু ডেনড্রাইট অ্যাডহেসিভ নামক আঠাল বস্তুটি (গাম) দিয়ে নেশা করছে। ওদের দেখেই থমকে গেলাম। কাছে যেতেই তারা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
এই দৃশ্য শুধু আসাদ গেটেই নয়, রাজধানী ঢাকার অলিগলি, ফুটওভারব্রিজ, গুলিস্তান, খিলগাঁও, কমলাপুর, মালিবাগ, তেজগাঁও, রামপুরায় দেখা যায়। এভাবেই পথশিশুদের একটি অংশ দিনের বেলা অথবা রাতের বেলায় নেশা করে। কেউ একা একা, আবার কেউ কেউ সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে নেশা করে। পলিথিন, প্লাস্টিক ছাড়াও নিজের পরিধেয় জামায় ড্যান্ডির গাম লাগিয়ে তারা নেশা করে। তারা পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। বেঁচে থাকার জন্য অবলম্বনটুকু তাদের নেই। ফলে তারা মনের অজান্তেই অপরাধী হয়ে উঠছে। পেটের ক্ষুধা নিবারণে কখনো ফুল বিক্রি, কখনো আর্বজনা সংগ্রহ করে জীবিকা জোগাড় করে।
শিশুরা সৃষ্টিমুখী ও সৃজনশীল। তাদের সৃজনশীল কাজে লাগাতে পারলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতো। বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেত। পরিস্ফুটিত হতো তাদের বিভিন্নমুখী প্রতিভা। ফুটপাথ কিংবা রাস্তায় পড়ে থাকা শিশুর দিকে তাকালেই চোখের সামনে তাদের করুণ চিত্র ভেসে ওঠে। ক্ষুধার যন্ত্রণায় ছটফট করলেও সময়মতো খাবার পায় না। থাকার জন্য জায়গা ও চিকিৎসার জন্য ওষুধ পায় না। অথচ প্রতি বছর শিশু দিবস পালিত হয়। ওই পর্যন্তই শেষ। ফলে উন্নয়নের ছোঁয়া তাদের স্পর্শ করেনি।
দেশে বর্তমানে কতজন পথশিশু রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে সরকারি ও বেসরকারি পরিসংখ্যান দেখা গেছে, ২০০৪ সালে দেশে পথশিশুর সংখ্যা ছয় লাখ ৮০ হাজার, ২০১৪ সালে বেড়ে হয় ১১ লাখ, ২০২৪ সালে হবে প্রায় ১৬ লাখ। ৮০ ভাগই রাজধানী ঢাকার বসবাস। ২০০৫ সালে সমাজসেবা অধিদফতরের গবেষণায় বলা হয়, শতকরা ৪১ ভাগ পথশিশুর ঘুমানোর বিছানা নেই, ৪০ শতাংশ প্রতিদিন গোসল করতে পারে না, ৩৫ শতাংশ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে, ৮৪ শতাংশ শিশুর শীতবস্ত্র নেই, ৫৪ শতাংশ শিশুর অসুস্থতায় দেখার কেউ নেই, ৭৫ শতাংশ পথশিশু অসুস্থতায় ডাক্তার দেখাতে পারে না।
শিশুদের মাদকাসক্তির চিত্র আরো ভয়াবহ। শিশু অধিকার ফোরামের ভাষ্যমতে ৮৫ ভাগ পথশিশু মাদকাসক্ত। তাদের ১৯ শতাংশ হেরোইন, ৯০ শতাংশ শিশু ধূমপান, ৮ শতাংশ ইনজেকশনে আসক্ত। এদের বেশির ভাগই গাঁজা, ড্যান্ডি, ইয়াবাতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। তারা পলিথিনের মধ্যে গামবেল্ডিং দিয়ে শুঁকে নেশা করে। পলিথিন, প্লাস্টিক ছাড়াও নিজের জামায় ড্যান্ডি গাম লাগিয়ে তারা নেশা করে।
ড্যান্ডি একপ্রকার গাম, যা সহজেই বাষ্প বা ধূমে পরিণত হয়। প্রতিটির দাম ১৫০-২০০ টাকা। হার্ডওয়্যারের দোকানে এগুলো পাওয়া যায়। কিন্তু দাম বেশি হওয়ায় হ্যার্ডওয়্যার থেকে না কিনে জুতার দোকান থেকে ২০-৩০ টাকায় কিনে নেশা করে। এই ড্যান্ডি কারো জন্য কল্যাণকর নয়। ড্যান্ডি সেবন করার ফলে রক্ত বমি, শ্বাসকষ্ট, লিভার ডিজিজ, কিডনি ডিজিজ, নিউমোনিয়া, হার্ট ফেইলিউর, যক্ষ্মা, এইডস ও ফুসফুসের ক্যান্সার হতে পারে।
জনগণের কল্যাণে প্রত্যেক সরকারের আমলে রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, কালভার্ট, সেতু, ব্রিজ, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করা হয়। এ উন্নয়ন কার জন্য? শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে কোনো দেশ বেশিদূর এগোতে পারে না। পথশিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এ উন্নয়ন অর্থবহ হবে না। কারণ আগামী দিনের কর্ণধার যারা তাদের একটি অংশ অঙ্কুরে বিনাশ হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে তাদের পুনর্বাসন করা প্রয়োজন। নতুবা সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব জেলা উপজেলায় পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। চাইলেই পথশিশুদের ভালো থাকার ব্যবস্থা করা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু সংশ্লিষ্ট মহলের একটু সদিচ্ছা। তাহলেই ওরা ভালো থাকবে। ফিরে পাবে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন।