শিক্ষকতা এক মহান পেশা। সবাই এ পেশায় আসতে পারে না। শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা আছে যাদের তারাই কেবল জীবনের ব্রত হিসেবে এ পেশাকে বেছে নেয়। ক্ষেত্রবিশেষে এর ব্যত্যয় ঘটছে। কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী পেটান। ছাত্র পেটানোর খবর প্রায়ই চোখে পড়ে। অথচ শিশুরা ফুলের মতো। তাদের কচি মুখ প্রশান্তি এনে দেয়। আদর ভালোবাসা দিতে ইচ্ছে হয়। পিতৃতুল্য কিছু শিক্ষক শিশুর নরম শরীরে আঘাত করে। মারধর করে কাউকে ভালো করা যায় না। মারধর শুধু ঘৃণা সৃষ্টি করতে পারে। ভালোবাসা দিতে পারে না। কিছু অভিভাবক এবং শিক্ষক মনে করেন, শিশুদের মারধর না করলে কিংবা শাসন না করলে তারা ভালো মানুষ হবে না। অথচ ভালো মানুষ হওয়ার মাপকাঠি মারধর নয়। উন্নত বিশ্বে বাবা-মা পর্যন্ত শিশুকে শাস্তি দেয়ার অধিকার রাখে না। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কথায় কথায় শাস্তি চলে।
আমাদের দেশে স্কুলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক শাস্তি ভোগ গা সওয়া হয়ে গেছে। প্রতি বছর অসংখ্য শিক্ষার্থী শারীরিক ও মানসিক শাস্তি ভোগ করলেও তার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে আমাদের জাতীয় মনোযোগ নেই। শিক্ষার্থীর গায়ে আঘাত দেয়ার অধিকার রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। এটি সংবিধান স্বীকৃত নয়। আমাদের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেয়া যাইবে না কিংবা কাহারো সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’
সন্তান অপরাধ করলে বাবা-মা মৃদু মারধর করে। সেটি নির্যাতনের পর্যায়ে পড়ে না। একজন শিক্ষকের ভালো আচরণ যেমন তাদের উজ্জীবিত করে তেমনি মন্দ আচরণ বিপথে ঠেলে দেয়। জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদের ৩৭ নম্বর অনুচ্ছেদে শিশুর ওপর নির্যাতন বা নৃশংস, অমানবিক, মর্যাদাহানিকর আচরণ বা নির্যাতন না করার ওপর নির্দেশনা রয়েছে। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ২০১১ সালের ১১ এপ্রিল শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধে এক আদেশ জারি করেছে। ওই আদেশের ব্যাখ্যা অনুসারে শারীরিক শাস্তি বলতে বোঝায়- বেত্রাঘাত, চক বা ডাস্টার ছুড়ে মারা, আছাড় দেয়া, চুল টানা বা চুল কেটে দেয়া, হাতের আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল চাপা দিয়ে মোচড় দেয়া, ঘাড়ে ধাক্কা দেয়া, কান টানা বা ওঠা-বসা করানো ইত্যাদি। মানসিক শাস্তি বলতে বোঝায়- মা-বাবা, বংশ পরিচয়, গোত্র বর্ণ ও ধর্ম সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য ও অশোভন অঙ্গভঙ্গি করা যা শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
পরিচিত একজন আমাকে বললেন, ভাই যে সন্তানকে ফুলের টোকা দিই না ব্যথা পাবে বলে, সেই সন্তানকে যখন স্কুলের শিক্ষক বেত দিয়ে হাত লাল করে দেয় তখন হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। নিজের ভেতর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। প্রতিবাদ করতে পারি না। মফস্বলের কথা না হয় বাদ-ই দিলাম। রাজধানী ঢাকায় অনেক স্কুলে শিশুদের শাস্তি প্রদান করা হয়। অথচ একজন শিশুর মেধা ও মনন বিকাশের জন্য প্রয়োজন ভয়হীন শিক্ষার পরিবেশ। শাস্তি দেয়া যতটা সহজ, শিক্ষা দেয়া ততটা সহজ নয়! শাস্তি দেয়ার জন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়ে না। ভয়হীন পাঠদানের জন্য শ্রম ও মেধা ব্যয় করতে হয়। অনুকরণীয় শিক্ষক হতে হলে মেধা ও ভালোবাসা দিয়ে মন জয় করতে হয়।
বর্তমান শিক্ষার্থীরা আগের মতো নয়; তারা অনেক আবেগপ্রবণ ও অধিকারসচেতন। তাদের দৃষ্টি বিশ্বময় বিস্তৃত। সে বিষয়টিও খেয়াল রাখতে হবে। একটা সময় সব শিশু স্কুলে ভর্তি হতো না। নামমাত্র ভর্তি হতো। স্কুলে পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করতে হতো। এখন আর তেমনটি দেখা যায় না। অভিভাবকরা দ্রুত স্কুলে পাঠাতে চান। অথচ ভয়হীন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। আগেকার সময় অনেকে শিক্ষকের বেতের মার খাওয়ার ভয়ে স্কুল থেকে পালিয়ে যেত। যারা পালিয়ে যেত তাদের আর কোনোদিন স্কুলের আঙিনায় দেখা যেত না। শিক্ষার আলো জীবন থেকে বিদায় নিত। একজন শিক্ষকের ভুলের কারণে যে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ল তার দায়ভার কে নেবে? এই দায়ভার অবশ্যই শিক্ষকের! এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিশু কোনো-না-কোনো রকমের নির্যাতনের শিকার।
স্কুলে শিশু নির্যাতন বন্ধে আদালতেরও নির্দেশনা রয়েছে। ২০১০ সালে চুরির অভিযোগে এক ছাত্রকে পিটিয়ে শিক্ষক আহত করে। অপমান সহ্য করতে না পেরে বাড়ি ফিরে ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আইন ও সালিশকেন্দ্র এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্ট আদালতের দ্বারস্থ হন। একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক ও মানসিক শাস্তির নামে শিক্ষার্থী নির্যাতন করাকে অবৈধ, অসাংবিধানিক, মৌলিক অধিকার পরিপন্থী বলে রায় দেন। অথচ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্যাতন বন্ধে শিক্ষার্থী দ্বারা শিক্ষকদের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা এবং অভিযোগ বাক্স রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। যেন শিক্ষার্থীরা শিক্ষক সম্পর্কে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারে। এটা করতে পারলে কথায় কথায় মারধরের সংস্কৃতি কিছুটা হলেও কমবে। শিক্ষকদের জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। এমনকি কোনো শিক্ষক ক্লাসে কেমন আচরণ করেন তার মূল্যায়ন করা সহজ হবে। এ ব্যাপারে সরকার, শিক্ষা কমিটি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, সমাজ, অভিভাবক ও শিক্ষকমণ্ডলী সোচ্চার ভূমিকা পালন করবেন, এমনটিই অভিভাবকদের প্রত্যাশা।