অন্তর্বর্তী সরকারের নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন ১৫ দফা সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে পেশ করেছে। সুপারিশমালায় নানা ভ্রান্তি ও ত্রুটি রয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে যেসব বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে তা নিম্নরূপ :

১. বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের আসন সংখ্যা বাড়িয়ে তার অর্ধেক নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে; এটি হাস্যকর একটি প্রস্তাব; বরং পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও সমান অধিকার দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া যেতে পারে, জনগণের ভোটে তারাও নির্বাচিত হয়ে আসবে যোগ্যতার মাপকাঠিতে। মমতাজ মার্কা নারীদের হতে জাতি রেহাই পাবে।

২.কমিশনের পারিবারিক আইনের অদ্ভুত সংস্কর প্রস্তাব দিয়েছে। এর বাস্তবায়ন হলে পারিবারিক কাঠামোকে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সম্পত্তিতে পুরুষদের মতো নারীদের সমান অধিকার দেয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই পুরুষ কেন নারীর মোহরানা বা পারিবারিক দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন? কেন তিনি বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করবেন? সন্তানের ভরণপোষণসহ যাবতীয় দায়-দায়িত্ব বহনে বাধ্য থাকবেন? এমনটা হলে পরিবারের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ভেঙে পড়বে, পরিবার ব্যবস্থা বিপন্ন হবে। আল্লাহর দেয়া আইনের ওপর এর মাধ্যমে সরাসরি হস্তক্ষেপ হবে। স্রষ্টার প্রতি এটি চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন। দেশবাসী কখনোই তা মেনে নেবে না।

৩. বাংলাদেশ এখনো সিইডিএডবিøউ সনদের ধারা ২ ও ১৬(১)(গ) সংরক্ষিত রেখেছে, যেখানে বিয়ে, তালাকসহ পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পূর্ণ সমতার কথা বলা হয়েছে। বিতর্কিত এই কমিশন সেই সংরক্ষণ প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে, যা বিস্ময়কর। এ বিষয়টি অবশ্যই ইসলামী আইনের পরিপন্থী। এমন কোনো আইনকে সমর্থন করা মুসলমানের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। যে দেশে অধিকাংশ নারী ধর্মপরায়ণ সেখানে এই কমিশন কাদের প্রতিনিধি হয়ে এই সুপারিশগুলো করছে?

৪. সুপারিশে বলা হয়েছে- সমতা ও সুরক্ষার ভিত্তিতে পারিবারিক আইনের সব বৈষম্য বিলুপ্ত করা হবে। প্রশ্ন ওঠে ইসলামের পারিবারিক আইনে বৈষম্য বা অসমতা বলে কিছুই নেই; বরং আল্লাহ কুরআনে যা ঘোষণা দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করলে অর্থাৎ যার যেমন প্রাপ্তি, মর্যাদা, অধিকার, ক্ষমতা, সমতা, উন্নয়ন ইত্যাদি যদি আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত থাকত তবে এ সমাজ আনন্দে-সুখে-শান্তিতে মজবুত হয়ে গড়ে উঠত। পরিবার ব্যবস্থা সমাজের মূল ভিত্তি। একে ধ্বংস করে তথাকথিত সমতা প্রতিষ্ঠা করা মানেই পরিবারকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়া। আমাদের দুর্ভাগ্য যারা এ বিষয়ে জ্ঞান রাখে না এবং প্রতিষ্ঠার চিন্তা ও করে না তারাই দিয়েছে সুপারিশমালা!

নারী কমিশনের আরো একটি সুপারিশ হলো- সব ধর্মের জন্য একক পারিবারিক আইন চালু করা। এর অর্থ হচ্ছে- মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান সবার প্রচলিত পারিবারিক আইনকে বাতিল করে একটি ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ আইন চাপিয়ে দেয়া। বাস্তবতা হলো- এটি নিছক ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ধর্মত্যাগকে উৎসাহিত করার কৌশল। এতে কোনো ধর্মেরই কোনোরকম পারিবারিক উন্নতি ঘটবে না, বিশৃঙ্খলা ছাড়া। আইন করে পারিবারিক নীতিনিয়ম হয় না। এটি নিতান্তই আদর্শিক চর্চার ব্যাপার। আর ইসলামে এর সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করা আছে।

৫. কর্মসংস্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ তারা যৌনকর্মীদেরকে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে সুপারিশ করেছে। ভাবনার বিষয়- বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে পতিতাবৃত্তি বা গণিকাবৃত্তি বা যৌনকর্মী ইত্যাদি যে নামেই বলা হোক না কেন, এটিকে বৈধ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। যারা সমাজে এই পেশাকে বিস্তৃত করে দেয়ার জন্য সূ²ভাবে এমন হঠকারী সিদ্ধান্তে মেতে উঠেছেন তারা কখনোই সমাজের মঙ্গল আকাক্সক্ষী নন; নোংরা ও অসামাজিক কর্মকে বিস্তৃত রূপ দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এ পেশায় অনেকেই অনিচ্ছাকৃত গমনকারী আছে। তাদেরকে সুন্দর ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দেয়া সমাজের দায়িত্ব, পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা প্রদানে উদ্বুদ্ধ করে নারীর স্বকীয় মর্যাদায় উন্নীত করা যেতে পারে।

কমিশনের একটি দাবি হচ্ছে বৈবাহিক ধর্ষণ : অর্থাৎ বিবাহিত জীবনে স্ত্রীর অমতে জোরপূর্বক যৌনাচারে লিপ্ত হওয়া। এ ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় উঠে আসে। বিবাহিত জীবন আর পতিতাবৃত্তি কি এক বিষয়? বিবাহিত জীবন কি অবৈধ যৌনাচারের জীবন? এ জীবন কি অর্থের বিনিময়ে আদান-প্রদান? এ জীবন কি শুধুই ভোগ আর লালসা মেটানোর? এখানে কি দায়-দায়িত্বহীন সম্পর্ক বহন করে?

পতিতাবৃত্তিতে নারীটির অনীহা সত্তে¡¡ও উপার্জনের স্বার্থে সে নিজেকে বিলিয়ে দেয় এবং সেখানে ভোক্তাপুরুষটির কোনো দয়া মায়া থাকে না, যেহেতু সে টাকার বিনিময়ে পাচ্ছে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক? এটি তো আল্লাহ প্রদত্ত একটি ভালোবাসার সম্পর্ক। এখানে পরস্পর পরস্পরের দুঃখ-কষ্ট, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বুঝেই সম্পর্ক গড়বে এবং তাদের মধ্যে একটি সুন্দর সৌহার্দ্যময় বোঝাপড়ার বিষয় থাকবে। এ জন্য সেটি অবৈধ যৌনাচার নয়; বরং বলা হয় সহবাস। তারপরও যদি নারীর অনীহা ঘটে থাকে তবে তাদের অভ্যন্তরীণ বুঝাপড়ার মধ্যে সেটির সমাধান হবে। স্বামীকে ধৈর্যশীল হতে হবে। স্ত্রীকে স্বাভাবিক হওয়ার সময় দিতে হবে। সেটি কি আইন করে প্রতিষ্ঠা করার বিষয়? এ যেন এক বালখিল্য আবদার।

ধিক্কার জানাই এমন নোংরামির। আসলে এদের মস্তিষ্ক বিকৃতি আছে। একটি সেমিনারে উপস্থিত থাকার সুযোগ পেয়ে শুনেছিলাম, এদের মতোই সুর মিলিয়ে জনৈক নেত্রী বলছেন, কবে যে দেখব পুরুষরা নারীর জুতার ফিতা বেঁধে দিচ্ছে! তাহলেই আসবে সমতা। আরেকজন বলেছেন, দেখলাম রান্নাঘরে জামাই রান্না করছে আর মেয়ে অফিস থেকে এসে শুয়ে আছে। এতে প্রশ্ন করলে মেয়ে সমঅধিকারের কথা বলায় তৃপ্ত হলাম। কিন্তু তারা জানেন না, একটি পরিবারের একান্ত এ বিষয়গুলো হুকুম দিয়ে জোর করে আদায়ের নয়; বরং ভালোবাসার, ভালোলাগার থেকে ঘটা- এতে অহঙ্কারী হওয়ার কিছুই নেই। আমাদের মহানবী সা:-ও সাংসারিক অনেক কাজে বিবিদের সাহায্য করতেন, তাই বলে তিনি স্ত্রীদের পদানত হয়ে যাননি; বরং উম্মতের জন্য শিক্ষা রেখে গেছেন, এটিই পারিবারিক সম্মিলন-পারিবারিক ঔদার্য। এসব আইন করে প্রতিষ্ঠা করার বিষয় নয়।

৬. সুপারিশে বলা হয়েছে- বেঁচে থাকার অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত না করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিলুপ্ত করা। এটিও একটি হাস্যকর অথচ সংবেদনশীল বিষয়। কারণ আজ পর্যন্ত আমাদের দেশে ধর্ষণের উপযুক্ত বিচার না হওয়াতে ধর্ষণের মতো মহামারীকে নিরোধ করা যাচ্ছে না, আর হানাহানি-মারামারি-কাটাকাটি-ঝগড়া ফ্যাসাদ তো লেগেই আছে, উপরন্তু অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, অনেক নিরপরাধী জিঘাংসার শিকার হয়ে জীবন বলি দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে প্রাণের বদলে প্রাণ, রক্তের বদলে রক্ত আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই বিধান করে দিয়েছেন এবং সে বিধানেও আছে সহনশীলতা সহমর্মিতার ব্যবস্থা যেখানে এতটুকু জুলুম হবে না হত্যাকারীর ওপর। কিন্তু শাস্তি হবে উপযুক্ত। ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলে সমাজে এসব অশান্তি বেড়েই চলবে। এ ক্ষেত্রে উল্লেøখ করতে হচ্ছে, এই কমিশন অত্যন্ত চাতুরতার সাথে অপরাধীদেরকে বাঁচিয়ে দিতে কলকাঠি নাড়ছে। কারণ সামনেই আছে চব্বিশের গণ-আন্দোলনে নির্বিচারে হত্যাকারীদের বিচারিক ব্যবস্থা। ফলে প্রশ্ন জাগে, এ দেশে বসে তারা মূলত কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? আর এতদিন দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কত যে নিরীহ প্রাণ বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে তাদের জন্য ওনাদের এই মানবতা কোথায় লুকিয়ে ছিল? এই কমিশন কখনোই এ দেশের আপামর নারী সংস্কারের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না।

৭. কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক চব্বিশের গণ-আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছেন বলে উদ্ধৃতি এসেছে, কিন্তু তার কথা ও কাজে কোথাও কোনো মিল নেই। কেননা, তিনি চব্বিশের আন্দোলনে নিহতদের জন্য কোনো বিচারের দাবি করেননি এবং আহতদের জন্য উন্নত চিকিৎসার ও কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থার দাবি করেননি। এতে স্পষ্টতই প্রমাণিত যে, ফ্যাসিবাদের সমর্থনকারী প্রেতাত্মাসম এই নারীপক্ষের নেত্রীরা কখনোই এ দেশের আপনজন হতে পারেন না। এরা তারাই যারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে থেকে মূলত তৌহিদবাদি এ দেশের জনমনে আঘাত হানতে সচেষ্ট ও বদ্ধপরিকর। এদের দ্বারাই সৃষ্টি হচ্ছে এ সমাজের বুকে নব নব ইসলামবিদ্বেষী সংস্কৃতি। উল্লেখ করতে হচ্ছে, রবীন্দ্র পূজারি সনজিদা খাতুনের মন্দির ছায়ানট, উদীচী, ঘাদানি, শাহাবাগী, নারীপক্ষ, মহিলা পরিষদ ইত্যাদি সবই একসূত্রে গাঁথা।

মূলত, ইসলামী জ্ঞানের অভাবেই এই কমিশন এমনসব ধৃষ্টতাপূর্ণ সুপারিশ রাখতে পেরেছে। আমরা চাই সমাজে পরিপূর্ণ ইসলামী নীতিনৈতিকতা সৃষ্টির পাশাপাশি সব ধর্মের, সব ব্যক্তির (সে নারী-পুরুষ যেই হোক) প্রকৃত সম্মান, মর্যাদা, অধিকার নিশ্চিত হোক। মনে রাখতে হবে, এ সমাজের পুরুষরাও নিগৃহীত, বৈষম্যের শিকার। তাদের মর্যাদার সাথেই নারীর মর্যাদাও লেপ্টে আছে।

সুতরাং এ দেশবাসীর আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এ কমিশনের সংস্কার সবার আগে প্রয়োজন এবং পুনরায় নবগঠিত কমিশন দ্বারা নারীর অধিকার-ক্ষমতায়ন-সমতা-উন্নয়ন ইত্যাদি বিষয়ে আবারো বিতর্কিত বিষয়গুলো পরিহার করে নতুনভাবে প্রতিবেদন তৈরি করা হোক।

লেখক: কলামিস্ট