১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর। নিউইয়র্কের এক কক্ষে বাংলাদেশ ও চীনের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দলিলে সই করলেন। অথচ মাত্র তিন বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন ছিল। ১৯৭২ সালে জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ ঠেকাতে চীন ভেটো দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেইজিং ছিল পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। স্বাধীনতোত্তর ঢাকা ছিল মস্কোর ঘনিষ্ঠ বলয়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলে কিছু নেই—থাকে পরিবর্তিত স্বার্থ ও বাস্তবতা। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই বাস্তবতাই বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন দরজা খুলে দেয়।

একসময় যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল পরস্পরবিরোধী ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে, ৫১ বছর পর সেই দরজা এখন একটি বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রবেশপথ। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি শুধু চীনের কাছ থেকে পণ্য, অবকাঠামো ও অর্থায়ন নেবে, নাকি চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের শিল্পায়ন, রপ্তানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের শক্তিতে পরিণত করবে?

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ অর্থনীতি। সত্তরের দশকের কূটনৈতিক দূরত্ব থেকে বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ দেখলে পরিবর্তনের ব্যাপ্তি বোঝা যায়। ২০০৬ সালে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে উঠে আসে এবং এরপর দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক, টেক্সটাইলসহ অসংখ্য পণ্য বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতির সঙ্গে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থাকে যুক্ত করেছে। একইসঙ্গে পদ্মাসেতু রেলসংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের উন্নয়ন কাঠামোকে দৃশ্যমানভাবে বদলে দিয়েছে।

২০১৬ সালে বাংলাদেশের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যোগদান এই সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। এখন এটি শুধু ঢাকা-বেইজিং কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্য, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষাও জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ।

কিন্তু এই সাফল্যের মধ্যেই একটি বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে—বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য কি দুই দেশের জন্য সমানভাবে লাভজনক? উত্তরটি সহজ নয়। চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি বিপুল, কিন্তু চীনা বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে আগামী দিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত চীন থেকে আরও বেশি আমদানি করা নয়; বরং চীনের শিল্প ও বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা।

এখানেই আসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ—‘চায়না প্লাস ওয়ান’।

চীনে উৎপাদন ব্যয় বাড়া, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে অনেক আন্তর্জাতিক কোম্পানি চীনের বাইরে দ্বিতীয় উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। ভিয়েতনাম গত কয়েক বছরে এই প্রবণতার বড় সুবিধাভোগী। ২০২৪ সালে দেশটি ৩৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি নিবন্ধিত বৈদেশিক বিনিয়োগ পেয়েছে। এর বড় অংশ গেছে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পে।

বাংলাদেশ ভিয়েতনামের অনুকরণ করতে পারে না, করাও উচিত নয়। কিন্তু অভিজ্ঞতাটি থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়। বড় জনসংখ্যা, তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজার, তৈরি পোশাকশিল্পের অভিজ্ঞতা, বঙ্গোপসাগরের উপকূল এবং এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর কাছাকাছি অবস্থান—বাংলাদেশের হাতে কম সুবিধা নেই। সমস্যা হলো, এসব সুবিধাটিকে বিনিয়োগযোগ্য পরিবেশে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন সেই সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের এই শিল্পাঞ্চল থেকে লক্ষাধিক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু শিল্পাঞ্চল তৈরি করাই শেষ কথা নয়। সেখানে কী ধরনের শিল্প আসছে, কতটা স্থানীয় কর্মসংস্থান হচ্ছে, কতটা প্রযুক্তি স্থানান্তর হচ্ছে এবং উৎপাদিত পণ্যের কত,টা বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হচ্ছে—এসবই হবে প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।

বাংলাদেশের আলোচনার টেবিলেও তাই নতুন কিছু বিষয় থাকা দরকার। শুধু ঋণ ও অবকাঠামো নয়—প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় সরবরাহকারী তৈরি, গবেষণা ও উন্নয়ন, যৌথ উদ্যোগ এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

আর এখানেই চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর বা সিএমবিইসি-এর সম্ভাবনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় এই করিডোর নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পায়। ধারণাটি বাস্তবায়িত হলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পর্যন্ত সড়ক, রেল, বন্দর, জ্বালানি ও শিল্পসংযোগ গড়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এর গুরুত্ব শুধু একটি নতুন সড়ক বা রেলপথ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে সেই অবকাঠামোর ওপর দিয়ে কী যাবে তার ওপর।

পণ্য যাবে, নাকি শুধু যানবাহন চলবে? শিল্পাঞ্চল তৈরি হবে, নাকি শুধু রাস্তা তৈরি হবে? বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হবেন, নাকি বিদেশি পণ্যই শুধু বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই ঠিক করবে করিডোরটি বাংলাদেশের জন্য কতটা অর্থবহ হবে।

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং কক্সবাজারকে ঘিরে অবকাঠামো উন্নয়ন বঙ্গোপসাগরের এই উপকূলকে ভবিষ্যৎ লজিস্টিকস ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে। মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হলে এই অঞ্চল চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগের নতুন দরজা হয়ে উঠতে পারে।

তবে ভূগোল নিজে কোনো দেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র বানায় না। প্রয়োজন দক্ষ বন্দর, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, দ্রুত কাস্টমস, উন্নত রেল ও সড়ক যোগাযোগ, আধুনিক গুদাম, ডিজিটাল বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমেয় নীতিমালা।

সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কারখানা করলে স্থানীয় কোম্পানিগুলো যেন তার সরবরাহকারী হতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশী প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের উচ্চদক্ষতার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চীনের সঙ্গে যৌথভাবে লজিস্টিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ই-কমার্স, প্রকৌশল, শিল্প ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি বিষয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।

একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক যতই গভীর হোক, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বহুমুখী রাখতে হবে। ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আসিয়ান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শক্তি হবে—একটি দেশের ওপর নির্ভরতা নয়, বরং বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে একটি সেতু হয়ে ওঠা।

৫১ বছর আগে বাংলাদেশ ও চীন যখন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, তখন দুই দেশই বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছিল। আজ আবার সেরকম একটি পরিবর্তনের সময় এসে গেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠিত হচ্ছে। চীনা ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো নতুন উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। এশিয়ার যোগাযোগের মানচিত্র বদলাচ্ছে। আর বঙ্গোপসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ সেই পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক বিন্দুতে অবস্থান করছে।

তাই আগামী ৫০ বছরের বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের লক্ষ্য শুধু আরও সেতু, আরও ঋণ কিংবা আরও আমদানি হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত—চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে বাংলাদেশের শিল্পায়নের সঙ্গে যুক্ত করা, চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো, স্থানীয়শিল্পকে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা এবং বঙ্গোপসাগরকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বারে পরিণত করা।

৫১ বছর আগে দুই দেশ কূটনীতির একটি দরজা খুলেছিল। আজ বাংলাদেশের সামনে অর্থনীতির আরও বড় একটি দরজা খুলছে। বৈশ্বিক উৎপাদনের নতুন মানচিত্রে বাংলাদেশ সেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেনটি হয়তো ইতিমধ্যে স্টেশন ছেড়ে দিয়েছে—কিন্তু এখনও সময় আছে উঠে পড়ার। শর্ত একটাই:
শুধু যাত্রী হয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যৎ গন্তব্য ঠিক করে সেই ট্রেনে উঠতে হবে।

লেখকদ্বয় • মো. সৈকত হোসেন: চিয়াংশি ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকসের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিকসের পিএইচডি শিক্ষার্থী ও গবেষক।

• ড. মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম: চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওভারসিজ এডুকেশন (স্কুল অব ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ)-এর সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক।