পুলিশ বিভাগ সতর্ক : ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে পুলিশ। মিছিল থেকে এরই মধ্যে অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের হাই কমান্ড থেকে সবাইকে সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। ঝটিকা মিছিল ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিট পুলিশের পক্ষে। নির্দেশনা অনুযায়ী, পুলিশের পেট্রোলিং, গোয়েন্দা নজরদারি ও চেকপোস্ট জোরদারের কথা জানানো হয়েছে।

শাহবাগ, বাংলামোটর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, ফার্মগেট, তেজগাঁও, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল ও যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর অর্ধশতাধিক স্থানে ঝটিকা মিছিল করেছে পতিত দলটির নেতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও ককটেল বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। আওয়ামী লীগের এমন ঝটিকা মিছিলের কারণে চাপে পড়ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কর্মকর্তারা। বিশেষ করে যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এমন ঝটিকা মিছিল করবে সংশ্লিষ্ট এলাকার সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি), পেট্রোল ও পুলিশ পরিদর্শক পেট্রোলের (পিআই) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি ঝটিকা মিছিল নিয়ে ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাত আলী এক ওয়ারলেস বার্তায় বলেন, ‘আপনারা কী করতেছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমি আপনাদের অফিসে ডেকে বলেছি, যে এলাকায় মিছিল হবে ওই এলাকার অফিসারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না। আগারগাঁওয়ে সকালে মিছিল হয়েছে, সন্ধ্যায়ও মিছিল হয়েছে। এখন পিআই ও এসি পেট্রোলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া আমার এখন কোনো গতি নেই।’ গত ১৫ সেপ্টেম্বর ডিএমপি মাসিক অপরাধ পর্যালোচনায় ডিএমপির সব পুলিশ কর্মকর্তার উদ্দেশে শেখ সাজ্জাত আলী বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যেকোনো সংগঠনের অপতৎপরতা রোধে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বিঘœকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন বানচাল করা, নাশকতার পরিকল্পনা করা, ফের আওয়ামী লীগ দলকে চাঙ্গা করা ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে এই ঝটিকা মিছিল চলতে থাকবে। আরো উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- সাম্প্রতিক সময়ের মিছিলগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। আবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও রয়েছে শিক্ষক, ব্যবসায়ী ও বিশিষ্টজনদের উসকানিমূলক পোস্ট। ১৫ সেপ্টেম্বর ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল একটি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন- ‘দিন যত যাচ্ছে আওয়ামী লীগের মিছিল তত বড় হচ্ছে’। এর তিন দিন আগে তিনি আরেকটি পোস্টে লিখেন- ‘আজ রাজধানীর ১১টি জায়গায় ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে একাধিকবার মিছিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ এভাবেই ফিরে আসছে।’ আরেকটি পোস্টে লিখেন- ‘জুম্মা নামাজের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের মিছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।’ গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি আরেক পোস্টে লিখেন- ‘আওয়ামী লীগের ফিরে না আসার ইতিহাস নেই। আওয়ামী লীগ সবসময় ফিরে আসে বিজয়ের পতাকা নিয়ে।’ এসব পোস্টের নিচে সহস্রাধিক কমেন্ট পড়েছে, যেখানে লেখা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’।

ফেসবুক মেসেঞ্জারের মাধ্যমে রাজধানীজুড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলগুলোতে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে তেজগাঁও ইন্দ্রিরা রোড থেকে আশরাফুল আলম নামে এক শিক্ষককে গ্রেফতার করেছে তেজগাঁও থানা পুলিশ। আশরাফুল আলম তেজগাঁও কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান হলেও তিনি গাজীপুর জেলার কাশিমপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। এ বিষয়ে তেজগাঁও থানার ওসি মোবারক হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিলগুলোতে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে আশরাফুলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে থানা-পুলিশ। তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলাও হয়েছে।

শুধু ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বা শিক্ষক আশরাফুল আলম নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আওয়ামী লীগ মতাদর্শীরা বিভিন্নভাবে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, যা দেখে অনেকেই সক্রিয় হচ্ছে ঝটিকা মিছিলে। গত ১২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁওয়ের নাবিস্কো এলাকায় ‘ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের’ ব্যানারে নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করে। এর আগে বাংলামোটর, গুলশান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও মতিঝিলসহ ঢাকার প্রায় এলাকায়ই আওয়ামী লীগের একাধিক ঝটিকা মিছিল হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ ৫০-১০০ জন বা এরও অধিক লোকজন নিয়ে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। ‘শেখ হাসিনা, শেখ হাসিনা’, ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশে হাসবে’; ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’; ‘হটাও ইউনূস, বাঁচাও দেশ’ ইত্যাদি স্লোগানে বিক্ষোভ মিছিল করেন তারা। মিছিলে অংশ নেয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, ঘরে বসে থাকলেও বাঁচার সুযোগ নেই, তাইলে আর ঘরে থেকে লাভ কী? এ জন্য মিছিলের নির্দেশ পেয়ে লোকজন নিয়ে নেমে পড়ছি। শেখ হাসিনাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে মিছিল করছি।

ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে ডিএমপির একাধিক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সাথে কথা বলে জানা গেছে, হঠাৎ করেই ৩০-৪০ জন লোক একটি ছোট ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে যায়। তখন ওই স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ না থাকায় কিছু করা সম্ভব হয় না। তবে প্রায়ই ঝটিকা মিছিল থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া মিছিলের ছবি, ফেসবুক লাইভ ও সিসি ফুটেজ দেখেও প্রতিনিয়ত গ্রেফতার করা হচ্ছে।

ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ডিএমপি বা পুলিশ সদর দফতরে পরিষ্কার বলে দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল-মিটিং দেখামাত্রই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই অনুসারে সব থানা-পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিনিয়ত গ্রেফতার করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট এক সূত্র বলেছে, ঝটিকা মিছিলের ব্যাপারে বিভিন্ন থানার কর্মকর্তাদের গাছাড়া ভাব থাকায় ডিএমপি কমিশনার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভায় রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে একটি সংস্থার প্রতিনিধি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির ভেতরে অনৈক্য বাড়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দল সুযোগ নিচ্ছে; বিশেষ করে ডাকসু নির্বাচন ঘিরে এই বিভাজন প্রকট হয়েছে। ঝটিকা মিছিলে অংশ নেয়া বেশির ভাগ লোক বরগুনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলা থেকে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ওই বৈঠকে ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি পুলিশকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপি মিডিয়া বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) তালেবুর রহমান বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ঠেকাতে সব কর্মকর্তাকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ডিএমপির ৫০ থানাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে তৎপর রয়েছে। গত এক মাসে আওয়ামী লীগের তিনশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।