ঈদের আনন্দ থেকে কেউ যেন বাদ না যায়
প্রতিবেশী অসচ্ছল অমুসলিম হলে তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের খেয়াল রাখা উচিত ঈদ উৎসবের আনন্দ থেকে কেউ যেন বাদ না যায়।
ঈদ উৎসবে প্রতিবেশীসহ সবাইকে নিয়ে করতে হবে। কারো অভাব থাকলে তার দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য। প্রতিবেশী অসচ্ছল অমুসলিম হলে তার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের খেয়াল রাখা উচিত ঈদ উৎসবের আনন্দ থেকে কেউ যেন বাদ না যায়।
গতকাল নয়া দিগন্তকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র ইমাম মুফতি মুহাম্মদ মুহিববুল্লাহিল বাকী এ কথা বলেন। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহি মসজিদের পেশ ইমাম হিসেবে নিয়োগ পান মুফতি মুহিববুল্লাহিল বাকী। পরে ২০০৩ সালে তাকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে বদলি করা হয়। নয়া দিগন্তকে দেয়া তার একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিচে তুলে ধরা হলো-
নয়া দিগন্ত : রমজান মাস শেষ হতে চলেছে। রমজানের শিক্ষা পরবর্তীতে আমরা কিভাবে কাজে লাগাতে পারি?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : পবিত্র রমজান মাসে আমরা সব ধরনের ভালো কাজ করার চেষ্টা করেছি। খারপ কাজ থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছি। নামাজ, দান-খয়রাত, তসবিহ-তাহলিল করেছি। গত এক মাস ধরে যে অনুশীলন হয়েছে তা বাকি ১১ মাসও অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলেই রমজানের শিক্ষা সার্থক হবে। ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি এটি সমাজ ও রাষ্ট্রেও প্রভাব ফেলবে।
নয়া দিগন্ত : একজন মুসলিম হিসেবে কিভাবে ঈদ উদযাপন করা উচিত?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : মহানবী (সা.) আমাদেরকে দু’টি ঈদে উৎসব করতে বলেছেন। এ উৎসব সবাইকে নিয়ে করতে হবে। আমার প্রতিবেশী, তিনি মুসলিম, নন মুসলিম- যেই হোন না কেন তাকেও আনন্দে শরিক করতে হবে। তার যদি আর্থিক অসঙ্গতি থাকে তাহলে তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। প্রতিবেশী অসচ্ছল অমুসলিম হলে তার দিকেও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে সবাই যদি তাদের প্রতিবেশীর দিকে খেয়াল করে তাহলে সবাই মিলে ঈদের আনন্দ একটি উৎসবে পরিণত হবে। একই সাথে ইসলাম যে একটি মানবতার ধর্ম সেটিও মানুষ বুঝতে পারবে।
নয়া দিগন্ত : এবার ঈদে বিভিন্ন স্থানে র্যালি, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : ঈদ-পরবর্তী র্যালি ও ঢোল-তবলা বাজানোর বিষয়ে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। সেজন্য ঈদ-পরবর্তী র্যালি, ঢোল-তবলা বাজানোর বিষয়ে সুলতানি আমলের যে রেফারেন্স দেয়া হচ্ছে তা কোন প্রেক্ষাপটে করা হয়েছিল এবং কোন প্রেক্ষাপটে বন্ধ করা হয়েছিল তা পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে এটা ইসলামিক সংস্কৃতি হিসেবে বাস্তবায়ন করতে গেলে ইসলামী শরিয়াহর প্রমাণ ও রেফারেন্স প্রয়োজন হবে। এর বাইরে গিয়ে কেউ যদি এসব কাজ করেন তাহলে বলা হবে যে, এটা ইসলামের মধ্যে একটা নতুন সংযোজন, যা নিষেধ এবং যার কোনো প্রয়োজন নেই।
নয়া দিগন্ত : দেশে ৯২ ভাগ মুসলমান। বেশিরভাগ মানুষ নামাজ পড়ে, রোজা রাখছে, হজ করছে, আবার ঘুষ-দুর্নীতির সাথেও জড়িত। এর কারণ কী?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : মূলত বেশিরভাগ মানুষ বর্তমানে যেভাবে নামাজ-রোজা করছে তা শপিংমলের ইলেট্রনিক যন্ত্রের সালাম দেয়ার মতো। শপিংমলের ইলেকট্রনিক যন্ত্রের সালামের যেমন আবেদন, অনুভূতি নেই তেমনি অনেক মানুষের নামাজ-রোজায় আবেদন, অনুভুতি নেই। তাদের কাছে নামাজ আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ইসলামে ঘুষ-দুনীতি নিষিদ্ধ। মানবিকতার দিক থেকেও এটি খারাপ কাজ; কিন্তু এখন নামাজ পড়া, রোজা রাখা ব্যক্তিরাও ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িত। তাদের এ ব্যাপারে কোনো অনুভূতি নেই। ব্যাপারটা এমন ডায়াবেটিস হয়েছে তিনি ওষুধও খাচ্ছেন আবার মিষ্টিও খাচ্ছেন এমন অবস্থা। এটা হলে তার ডায়াবেটিস কখনো ভালো হবে না। মূলত ইসলামের সঠিক শিক্ষা না থাকার কারণেই এটি হচ্ছে। মানুষের মনে একদিকে যেমন আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন ও পরকালীন জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগ্রত হতে হবে তেমনি মানবিক আচরণ হিসেবেও তা নিজেকে ধারণ করতে হবে। মানুষকে ঠকানো-ক্ষতি করা খারাপ কাজ, ইসলামে নিষেধ এ অনুভূতি জাগ্রত করতে হবে। তাহলেই সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে অন্যায়-খারাপ কাজ কমে যাবে।
নয়া দিগন্ত : সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সুনির্দিষ্ট আছে; কিন্তু সেটিও ভাইয়েরা দিচ্ছে না। এর সমাধান কোন পথে?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : ইসলামি আইন অনুসারে বাবা মারা যাওয়ার পরই যেমনভাবে ভাই সম্পত্তির অধিকারী হচ্ছেন একই আইনে বোনও সম্পত্তির অধিকারী হচ্ছেন। এটা তাদের প্রাপ্য; কিন্তু ভাইয়েরা জোরজবরদস্তি করে সেটি বোনদের দিচ্ছে না। এটি ইসলামের কোনো দোষ নয়। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পাওয়ার কারণে এটি হচ্ছে। এটি যে অন্যায় তা অনেক সময় ভাইয়েরা বুঝতে চান না। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বাবা মারা যাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভাইবোনদের মধ্যে বাধ্যতামূলক সম্পত্তি ভাগবাঁটোয়ারা করে দিতে হবে। আইন অনুসারে ভাগবাঁটোয়ার সম্পন্ন না হলে সরকার তাদের ট্যাক্স নিবে না। আর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা সম্পন্ন করে ট্যাক্স না দিলে তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হবে- এ রকম আইন করলে তখন ভাইয়েরাও বোনদের সম্পত্তি দিতে বাধ্য হবে। এ ছাড়া যারা চাচার ছেলে নেই বলে চাচা ও চাচাতো বোনদের সম্পত্তি নেয়ার চিন্তায় থাকেন তাদের নানাভাবে হয়রানি করেন তাদের ব্যাপারেও সরকারের পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
নয়া দিগন্ত : সাম্প্রতিককালে দেখা যাচ্ছে বাবার লাশ ফেলে রেখে সন্তানরা জমি ভাগবাঁটোয়ার নিয়ে ব্যস্ত। এটা কেন হচ্ছে বলে মনে করেন?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : এটি মূলত হচ্ছে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষার অভাব, যা খুবই দুঃখজনক। অনেক বাবা তার সন্তানকে ইসলামের শিক্ষা, নৈতিকতার শিক্ষা না দিয়ে সম্পত্তি গড়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। তার ফলেই তারা মারা গেলে সন্তানরাও সম্পত্তিকেই গুরুত্ব দেয়। এজন্য প্রতিটি বাবা-মায়ের উচিত তাদের সন্তানদের সুশিক্ষিত করা, ধার্মিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেয়া। তাহলে তারা বরং বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তার জানাজা-দাফন ও সদকায়ে জারিয়া নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। সম্পত্তি নিয়ে নয়।
নয়া দিগন্ত : বর্তমানে মব জাস্টিস সংস্কৃৃতি চলছে? এতে মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। বিষয়টি কতটা সঠিক হচ্ছে?
মুহিববুল্লাহিল বাকী : এটি কোন দিক থেকেই সঠিক হওয়ার প্রশ্নই আসে না। মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে। এটা কোনো ভালো কথা হতে পারে না। এটিও একধরনের সন্ত্রাস। এটি যেমন আইনে বৈধ নয়, তেমনি ইসলামেও এটি নিষিদ্ধ। এভাবে যদি বেআইনি কাজ অব্যাহতভাবে চলতে থাকে তাহলে মানুষের প্রাণ যাবে। সমাজ অস্থিতিশীল হবে। এর প্রভাব যে কারো ওপর পড়তে পারে। এজন্য এখনই এটি বন্ধ করা উচিত। ওয়াজে, রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনায় এটি নিয়ে কথা বলা উচিত। এটি কোনোভাবেই আর চলতে দেয়া ঠিক হবে না। রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের সচেতন ব্যক্তিদেরও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।








