রাজশাহীতে সার আছে গুদামে, পাচ্ছে না কৃষক

গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার দাবি প্রশাসনের, মাঠে সার না পাওয়ার অভিযোগ কৃষকদের

আব্দুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

রাজশাহীতে চলতি আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত দামে চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না এবং ডিলারের দোকানে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। তবে কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন দাবি করছে, জেলায় কোনো সার সঙ্কট নেই এবং সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।

রাজশাহীতে চার লাখ ১২ হাজারের বেশি কৃষক এবং প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর আবাদি জমি রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় এক হাজার ৪৫ মেট্রিক টন টিএসপি, এক হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন এমওপি এবং তিন হাজার ১৫ মেট্রিক টন ডিএপি সার বরাদ্দ দেয়া হয়। আমন ধানের সুষম বৃদ্ধির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনের সারের সঙ্কট ফলনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ৭ সেপ্টেম্বর পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারে কৃষকেরা সিন্ডিকেট ভাঙা ও সারের সুষম সরবরাহের দাবিতে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক প্রায় ১ ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন। পরে পুঠিয়া উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে তারা অবরোধ তুলে নেন। উপস্থিত কৃষক আবদুর রহিম ও রফিকুল ইসলাম জানান, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সরকারি দামে সার মিলছে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবশ্য অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে ডিলাররা কৃষকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) রাজশাহী জেলা সভাপতি ওসমান আলী জানান, জেলায় ইউরিয়া বা অন্যান্য সারের সঙ্কট নেই। তার মতে, কৃষকরা সুনির্দিষ্ট পরামর্শের বাইরে অতিরিক্ত সার ব্যবহার করছেন এবং অনেকে বস্তা ধরে কিনতে চাওয়ায় সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে। এছাড়া অক্টোবর-নভেম্বর মাসের আলু ও পেঁয়াজ চাষকে সামনে রেখে কিছু কৃষক আগাম সার কিনে রাখছেন বলেও জানা গেছে।

বিএফএ জেলা ইউনিটের মতে, প্রকৃত চাহিদার সাথে সারের বরাদ্দের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। জেলায় বিসিআইসির ৮৬ জন ও বিএডিসির ১৩০ জনসহ মোট ২১৬ জন ডিলার এবং ৪৭৫ জন খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন। বিএফএ সারের উপ-বরাদ্দ দ্রুত করা, ডিলারদের কমিশন বৃদ্ধি এবং জেলায় বিদ্যমান ১৪ হাজার হেক্টর পুকুরে মাছ চাষের জন্য কৃষিজমির বাইরে পৃথক সার বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে। বর্তমানে প্রতি বস্তা ৫০ কেজি ইউরিয়া ও টিএসপি এক হাজার ৩৫০ টাকা, ডিএপি এক হাজার ৫০ টাকা এবং এমওপি এক হাজার টাকায় নির্ধারিত রয়েছে।

মাঠপর্যায়ের উত্তেজনার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার রাজশাহী বিএডিসি গুদাম পরিদর্শন শেষে বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী বলেন, সঙ্কট নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সেপ্টেম্বরে জেলায় এক হাজার ৪৫ মেট্রিক টন টিএসপি বরাদ্দের বিপরীতে বিএডিসির গুদামেই ছয় হাজার ৩০০ মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে। একইভাবে ইউরিয়ার পাঁচ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন বরাদ্দের বিপরীতে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে। এছাড়া বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ মেট্রিক টন ইউরিয়া এবং বিএডিসিতে চার হাজার ৩৪৮ মেট্রিক টন ডিএপি রক্ষিত আছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোস্তফা কামাল হোসেন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার সার মজুদ বেশি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কোনো কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হচ্ছে কি না তা মনিটর করা হচ্ছে এবং নতুন ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রভাবও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গুদামে প্রচুর মজুদ থাকা সত্ত্বেও মাঠে কেন হাহাকার, সেই সমন্বয়হীনতা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।