প্রশ্ন : সম্প্রতি আপনি জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেছেন। কেন জামায়াতকে বেছে নিলেন? যোগদানের আগে দলটিকে কিভাবে মূল্যায়ন করেছেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আমি মনে করি মানুষের জীবন খুবই ক্ষুদ্র। এই ক্ষুদ্র জীবনে ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’ হয়ে থাকার কোনো অর্থ নেই। এমন জায়গায় কাজ করা দরকার, যেখানে নিজের যোগ্যতা, মেধা ও প্রতিভা ব্যয় করলে দ্বীন ও মানবতার বড় উপকার হওয়ার আশা করা যায়। বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে আমি সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শক্তি মনে করি।
আজ জামায়াত যে অবস্থানে আছে, অন্য দলগুলোর সেই অবস্থানে পৌঁছাতে আগামী ১০-২০ বছরও লেগে যেতে পারে। ততদিনে জামায়াতে ইসলামী ইনশাআল্লাহ আরো উচ্চতায় পৌঁছবে। কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা নেক কাজ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতার নির্দেশ দিয়েছেন। একটি গাড়ি সামনে এগোতে হলে যেমন সব চাকার সমর্থন দরকার, তেমনি ইসলামী রাজনীতির অগ্রগতির জন্যও সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
আমি রাজনীতিকে ইবাদতের অংশ হিসেবেই দেখি। যে নিয়তে আমরা তাহাজ্জুদ পড়ি, সেই নিয়তেই রাজনীতি করি। একজন মুসলমানের উচিত এমন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা, যেখানে ইসলামের এবং মানবতার কল্যাণ নিহিত। সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি, বিশেষ করে ৫ আগস্ট পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর বিকল্প খুব কমই আছে।
প্রশ্ন : জামায়াতে যোগদানের পর আপনার ওপর কোনো হুমকি বা চাপ এসেছে কি?
মুফতি আলী হাসান উসামা : হ্যাঁ, বাস্তবতা হলো- যোগদানের পর চারদিক থেকে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। অনলাইনে গালিগালাজ, কটূক্তি ও নানা রকম হুমকি এসেছে। যারা একসময় ভালোবাসত, রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে তাদের কেউ কেউ এখন প্রতিপক্ষ হয়ে গেছে।
তবে আমি এসবকে খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। কারণ আমরা তো আল্লাহর জন্যই কাজ করি। জীবন-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। যেদিন যতটুকু হায়াত লেখা আছে, ততদিনই বাঁচব। শিয়ালের মতো বেঁচে থাকার চেয়ে সিংহের মতো বাঁচাই শ্রেয়। তাই এসব হুমকি আমার মানসিক অবস্থাকে দুর্বল করেনি, বরং আগের চেয়ে আরো দৃঢ় করেছে।
আমি অপ্রস্তুত ছিলাম না। দ্বীনের পথে চলতে গিয়ে নবীদের ওপরও আঘাত এসেছে। সুতরাং আমাদের ওপর এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নবীরা যদি ইস্তেকামাত দেখাতে পারেন, আমরা ইনশাআল্লাহ সেটুকু তো পারব।
প্রশ্ন : নির্বাচনের আগে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যে ঐক্যের চেষ্টা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা ভেঙে গেল কেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমাদের সবাইকে একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। দীর্ঘদিন আলাদা আলাদা আন্দোলনে আমরা কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পর অল্প সময়েই আল্লাহ তাআলা আমাদের কল্পনার বাইরে মুক্তি দিয়েছেন। এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল- ঐক্য ছাড়া ফ্যাসিবাদ বা আধিপত্যবাদ মোকাবেলা সম্ভব নয়।
শুরু থেকেই বলা হয়েছিল, এই ঐক্য দলীয় আদর্শ একাকার করার জন্য নয়; বরং ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে বৈচিত্র্যের মধ্যেই ঐক্য। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে আসনভিত্তিক স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। ‘আমাকে এত আসন দিতেই হবে’- এই মানসিকতাই ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
যদি প্রত্যেকে নিজের স্বার্থের চেয়ে ইসলামের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিত, তাহলে এই ঐক্য ভাঙত না। গোটা জাতি আশায় বুক বেঁধে তাকিয়ে ছিল। সেই আশা ভেঙে যাওয়া সত্যিই দুঃখজনক।
প্রশ্ন : শরিয়া ইস্যুতে ঐক্য ভাঙার যে ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, সেটাকে আপনি কিভাবে দেখেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : আমি মনে করি এখানে বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। শরিয়া মানে শুধু চোরের হাত কাটা বা পাথর নিক্ষেপ নয়। এগুলো শরিয়ার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। শরিয়ার বড় অংশ হলো ইনসাফ, ন্যায়বিচার, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, দরিদ্রের অধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম।
আজকে যারা এসব কথা বলছে- ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতি দূর করব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব- এগুলো কি শরিয়া নয়? জনগণের ৮০-৯০ শতাংশ শরিয়ার এই মৌলিক দিকগুলোর পক্ষেই আছে। একদিনে পূর্ণাঙ্গ শরিয়া বাস্তবায়ন কোনো দেশেই সম্ভব নয়। এর জন্য সময়, প্রেক্ষাপট ও প্রস্তুতি দরকার।
প্রশ্ন : ইসলামী ঐক্য ভেঙে যাওয়ার ফলে কারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে?
মুফতি আলী হাসান উসামা : এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে সেক্যুলার শক্তি, হিন্দুত্ববাদী শক্তি এবং পরাজিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী। ইসলামী দলগুলোর কেউই প্রকৃত অর্থে লাভবান হয়নি। বরং যারা ঐক্য থেকে বের হয়ে গেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।
আমি দেশের বিভিন্ন জায়গায় গেলে সাধারণ মানুষ আমাদের বলত- ‘আপনারা শুধু এক থাকেন, বিজয়ের দায়িত্ব আমরা নেব।’ সেই গণজোয়ার দেখে মনে হয়েছিল ইসলামী রাজনীতির পক্ষে বড় পরিবর্তন আসবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ঐক্য ভাঙায় সেই সম্ভাবনা কিছুটা হলেও ক্ষুণœ হয়েছে।
প্রশ্ন : ভারতীয় আধিপত্যবাদের কথা বলা হচ্ছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
মুফতি আলী হাসান উসামা : ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্ক হতে হবে চোখে চোখ রেখে। শত্রুতা নয়, আবার দাদাগিরিও নয়। প্রতিবেশী বদলানো যায় না- এটা বাস্তবতা। কিন্তু আধিপত্য মেনে নেয়ার প্রশ্নই আসে না। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ- সব মিলিয়ে আমাদের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। আগামী দিনে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, সম্পর্ক হতে হবে নিছক স্বার্থভিত্তিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। শুধু ভারতের ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্র চালালে তা সম্ভব নয়। বরং বহুমুখী কূটনীতি ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।
যদি কেউ আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের পথ খুলে দেয় বা আধিপত্যবাদীদের সুযোগ করে দেয়, এই জাতি তা কখনো ক্ষমা করবে না। প্রয়োজনে আবারো গণআন্দোলন সৃষ্টি হবে- এটা আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন : নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত- দু’টি পক্ষই অতীতে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার। কিন্তু বর্তমানে তাদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে কাদা ছোড়াছুড়ি দেখা যাচ্ছে। এতে কি নতুন করে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ তৈরি হতে পারে?
মুফতি আলী হাসান উসামা : দুঃখজনক হলেও সত্য-নির্বাচনী প্রচারণায় কথার যুদ্ধ এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভদ্রতা ও সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আমরা দেখলাম, দেশের একটি বড় দলের শীর্ষ নেতা বিদেশ থেকে এসে এমন বক্তব্য দিয়েছেন, যা ধর্মীয় ফতোয়ার পর্যায়ে পড়ে। তিনি বলেছেন- ঢাকা ও নরসিংদীতে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প নাকি জামায়াতে ইসলামীর ‘শিরক’-এর কারণে হয়েছে। এই বক্তব্য ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক-দুই দিক থেকেই চরম আপত্তিকর।
তৃণমূলের কোনো নেতা এমন কথা বললে সেটাকে ব্যক্তি পর্যায়ে বিবেচনা করা যেত। কিন্তু একজন জাতীয় নেতা, যার দিকে শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্ব তাকিয়ে থাকে- তার মুখ থেকে এমন কথা অবশ্যই দায়িত্বজ্ঞানহীন। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার ধর্মকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে- ‘জান্নাতের টিকিট বিক্রি’- এ ধরনের ভাষা পুরো পরিস্থিতিকে আরো ঘোলাটে করছে।
যদি কোনো ব্যক্তি ভুল করে, তার সংশোধন হবে ব্যক্তিগতভাবে। কিন্তু সেই ভুলের দায় পুরো একটি দলের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ‘কাফের’, ‘মুশরিক’- এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এমন ফতোয়া দিতে একজন মুফতিও বহুবার চিন্তা করেন।
প্রশ্ন : তাহলে এই পরিস্থিতিতে করণীয় কী হওয়া উচিত ছিল বলে আপনি মনে করেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : আমার মতে, দরকার ছিল- আগামীতে ক্ষমতায় যে-ই যাক না কেন, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্য শক্তিগুলোকে সাথে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করা। যাতে ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার মাথাচাড়া দিলে সবাই মিলে প্রতিরোধ করা যায়।
কারণ আমরা ভুলে গেলে চলবে না- ফ্যাসিবাদের শীর্ষ নেতারা হয়তো পালিয়েছে, কিন্তু তাদের কোটি কোটি কর্মী এখনো দেশে আছে। তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছে। সুযোগ পেলে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো বিস্ফোরিত হবে। আমরা দেখেছি, দিনে-দুপুরে কিভাবে শরিফ ওসমান হাদিকে টার্গেট করে শহীদ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটবে না- এর কোনো গ্যারান্টি নেই, এমনকি ক্ষমতায় যাওয়ার পরও।
এই বাস্তবতায় নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি করা সত্যিই দুঃখজনক। তৃণমূলের কেউ করলে এক কথা, কিন্তু জাতীয় নেতাদের উচিত সংযম, ভদ্রতা ও দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার করা। আপনি অন্যকে সম্মান দিলে নিজেও সম্মান পাবেন। এতে জাতীয় ঐক্য টিকে থাকবে এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ নিরাপদ থাকবে।
প্রশ্ন : শাসনতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণ মাঠে নেমেছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আধিপত্য এখনো রয়ে গেছে- বিশেষ করে ভাষা ও ধর্মীয় শব্দচয়নে। বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : ৫ আগস্টের পর থেকেই আমি বারবার বলে আসছি- রাজনৈতিক ফ্যাসিস্টরা বিদায় হয়েছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক ফ্যাসিস্টরা বিদায় হয়নি। যাদের ওপর ভর করে রাজনৈতিক ফ্যাসিজম দাঁড়িয়ে ছিল, তারা এখনো সমাজে সক্রিয়।
আপনি কিছু উদাহরণ দিলেন- ‘জানাজা’ শব্দকে ‘অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ বলা, ‘লাশ’ শব্দের জায়গায় ‘মরদেহ’ ব্যবহার-এগুলো কাকতালীয় নয়। জানাজা শব্দটির সাথে মুসলমানদের ধর্মীয় সম্মানবোধ জড়িত। লাশ বললেও সেখানে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধার জায়গা থাকে। অথচ ‘মরদেহ’ শব্দটি পশুপাখিসহ সব কিছুর জন্য ব্যবহার হয়। মানুষ মারা গেলে ধর্মীয়ভাবে যে মর্যাদাবোধ, সেই জায়গাটাই মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে।
এটা নিছক শব্দের পরিবর্তন না, এটা একটি পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। বিশেষ করে হিন্দুয়ানি বা কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকে ‘প্রাচীন বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা আমরা দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করছি।
প্রশ্ন : এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : একটা জাতি যদি তার সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা ধরে রাখতে না পারে, তাহলে সেই জাতির পতন অনিবার্য। সংস্কৃতি একটি জাতিকে শক্তি জোগায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হয়েও ইসলামী সংস্কৃতিকে সামনে আনতে পারিনি।
বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রমিত ভাষানীতি- অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে কলকাতার সাহিত্যধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। মিডিয়ার একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে এই ন্যারেটিভ তৈরি করছে যে, এগুলোই আধুনিকতা, এগুলোই খাঁটি বাঙালিত্ব। আর এগুলো না মানলে আমরা যেন আরব, পার্সিয়ান বা আফগান মুসলমান হয়ে যাই- এমন ভীতি তৈরি করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে আলেম সমাজ, ধর্মীয় বক্তা এবং সচেতন মিডিয়ার বড় ভূমিকা রয়েছে। ইসলাম শুধু নামাজ-রোজার নাম নয়, ইসলাম সংস্কৃতিরও নাম। আল্লাহর রাসূল সা. এমনকি শব্দচয়ন, পোশাক, চুল কাটার ক্ষেত্রেও সতর্ক ছিলেন- যাতে শিরক বা ভিন্ন ধর্মীয় সাদৃশ্য না আসে। সেই উম্মাহ হিসেবে আমাদের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও সচেতন হতে হবে।
প্রশ্ন : সাংস্কৃতিক বিভাজনের পেছনে বাংলাদেশের বহুধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থা কতটা দায়ী?
মুফতি আলী হাসান উসামা : একটি জাতির জন্য শিক্ষাব্যবস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে লর্ড মেকলে বলেছিলেন- এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যাতে মানুষ দেখতে ভারতীয় হলেও মননে হয় ব্রিটিশ। আজও সেই নকশাই কার্যকর।
বাংলাদেশে একই দেশে চার-পাঁচ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা- কওমি, আলিয়া, বাংলা মাধ্যম, ইংলিশ মিডিয়াম। ফলে জাতির মন-মানসিকতা এক জায়গায় থাকছে না। ইংলিশ মিডিয়ামে বেড়ে ওঠা শিশুদের মধ্যে বাঙালিত্বের চেয়ে পশ্চিমা সংস্কৃতি বেশি দৃশ্যমান। কারণ শিক্ষা শুধু বই নয়, আদর্শ ও সংস্কৃতিও তৈরি করে।
আমি মনে করি, একটি লেভেল পর্যন্ত সবার জন্য এক ধরনের শিক্ষা থাকা দরকার। এরপর যার যে আগ্রহ- ধর্ম, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি- সে অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা নেবে। এতে জাতিগত ঐক্য ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকত।
প্রশ্ন : কওমি ও আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার বিভাজন কি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণ হয়ে উঠেছে?
মুফতি আলী হাসান উসামা : অতীতে কওমি ও আলিয়া-দুই ধারার আলেমরাই একসাথে জাতির নেতৃত্ব দিয়েছেন। কওমি থেকে পড়ে আলিয়ায় শিক্ষকতা করেছেন, আবার আলিয়া থেকে পড়ে কওমিতে শাইখুল হাদিস হয়েছেন-এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে।
কিন্তু বিগত সময়ে পরিকল্পিতভাবে আলিয়া ধারাকে দুর্বল করা হয়েছে। সরকারি অনুদাননির্ভরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান স্বকীয়তা ধরে রাখতে পারেনি। কওমি ধারার মূল অবস্থান হলো- আমরা জনগণের অর্থে চলব, সরকারের নয়। ‘যার নুন খাই, তার গুণ গাই’- এই মানসিকতা তারা প্রত্যাখ্যান করে।
আমি মনে করি, আয়ের উৎসে পার্থক্য থাকলেও আদর্শ ও জ্ঞানের জায়গায় ঐক্য থাকলে আজকের এই দূরত্ব তৈরি হতো না।
প্রশ্ন : সামনে নির্বাচন। এই নির্বাচন নিয়ে আপনি কী ধরনের সঙ্কট দেখছেন?
মুফতি আলী হাসান উসামা : আমি গুরুতর সঙ্কট দেখছি। কালো টাকার ছড়াছড়ি, পেশিশক্তির ব্যবহার, হুমকি- এসব আগের মতোই চলছে। সরকার এখনো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে পারেনি।
বড় দলগুলো আচরণবিধি ভাঙলেও প্রশ্নের মুখে পড়ছে না, অথচ দুর্বলদের ছোট ভুল নিয়েও শোকজ করা হচ্ছে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। আরো বড় আশঙ্কা হলো- ৫ আগস্টের আগে ও পরে যে বিপুল অস্ত্র লুট হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। এগুলো নির্বাচনের সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রশ্ন : কেন্দ্র দখল বা প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা কি বাস্তব?
মুফতি আলী হাসান উসামা : অবশ্যই। যারা এখনই ভোটারদের হুমকি দিতে পারে, তারা যে নির্বাচনকেন্দ্র দখল করবে না- এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রশাসন চাইলে কঠোর হতে পারে, কিন্তু তার জন্য সদিচ্ছা দরকার। বর্তমান প্রশাসনের বড় অংশ আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত। অনেকেই মানসিকভাবে এখনো সেই ধারায় বন্দী। আবার কেউ কেউ ভবিষ্যৎ ক্ষমতার হিসাব কষে পক্ষপাতিত্ব করছে। মানসিকভাবে নিরপেক্ষ না হলে মাঠে নিরপেক্ষ থাকা সম্ভব নয়।
প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন- এই পরিস্থিতিতে জাতির জন্য আপনার বার্তা কী?
মুফতি আলী হাসান উসামা : যদি এই নির্বাচন তামাশায় পরিণত হয়, যদি জনগণের ভোটাধিকার আবার পদদলিত হয়, তাহলে ভয়ঙ্কর সঙ্কট তৈরি হবে। এই জাতি চুপ থাকবে না। অতীতে যেমন জেগেছে, প্রয়োজনে আবারো জাগবে।








