পদত্যাগ নয়, ড. ইউনূসের ‘সম্মানজনক বিদায়’ চায় বিএনপি
কোনো মহল সরকারকে ভিন্ন দিকে ডাইভার্ট করছে কি না প্রশ্ন দলটির
পদত্যাগ নয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘সম্মানজনক বিদায়’ চায় বিএনপি। দলটি মনে করছে, বিদ্যমান ঘোলাটে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুতই অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। একই সাথে রাজনৈতিক দলগুলোকে সাথে নিয়ে চিড় ধরা জাতীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নেবে। জানা গেছে, বিএনপি সরকারের ওপর ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে চাপ অব্যাহত রাখবে। তবে রাজপথে আপাতত কোনো কর্মসূচি দেবে না দলটি। নির্বাচন নিয়ে সরকারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সামনে এগুবে তারা।
গত এক সপ্তাহব্যাপী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ ড. ইউনূস গত বৃহস্পতিবার পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন বলে বিভিন্ন মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ছাত্রদের রাজনৈতিক দল এনসিপির নেতারাই এই বিষয়টি সামনে আনে। যদিও বিষয়টি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। গতকাল অবশ্য প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এক ফেইসবুক পোস্টে জানান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ করবেন না।
ড. ইউনূসের পদত্যাগ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড: আব্দুল মঈন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘প্রথমত আমরা এখনো এই খবরের সত্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে জানি না, কারণ এটি প্রধান উপদেষ্টার অফিস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। দ্বিতীয়ত এটিও হতে পারে যে, সরকার নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে এটি ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রচার করেছে। আমি বরং বলতে চাই যে, বাংলাদেশের জনগণের সত্যিকারের চাওয়া হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের মর্যাদাপূর্ণ বিদায়। জনগণ দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন, সত্যিকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ রূপান্তর নিশ্চিত করার জন্য তার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছে, জনগণ সেটিরও সফল বাস্তবায়ন দেখতে চায়। একই সাথে এটাও দেখতে চায় যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর যে আস্থা রেখেছে, এই সরকার দেশকে গণতন্ত্রে উত্তরণের মাধ্যমে সেই আস্থার সঠিক প্রতিফলন ঘটাবে ।’
বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, রাজপথে গত একসপ্তাহে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতির উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে একটি বার্তা দেয়া। নির্বাচন নিয়ে কোনো ‘তালবাহানা’ হলে আগামী দিনে যেকোনো সময় একই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বলেও শীর্ষ নেতারা আলোচনা করেছেন। তবে বিএনপি চায় না, সেই ধরনের কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হোক। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে দলটি প্রত্যাশা করে। বিএনপি এও মনে করে, বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মধ্য দিয়ে নির্বাচন, সংস্কার এবং আওয়ামী লীগের বিচার ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের যৌক্তিকতার বিষয়টি বর্তমানে যেভাবে বিভিন্ন ফোরামে তুলে ধরছে, আগামী আরো বেশ কিছু দিন ঠিক একইভাবে তা অব্যাহত রেখে সরকারের ওপর চাপ বজায় রাখবে। ঈদুল আজহার পর দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিও থাকবে। সেখান থেকেও নির্বাচনের জোরালো দাবি তুলে ধরা হবে। বিএনপি নেতারা বলছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে তারা কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। এটা ক্রমেই বাড়বে। দলটি মনে করছে, সরকার আন্তরিক হলে আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই নির্বাচনের দিনক্ষণের বিষয়টি স্পষ্ট করবেন।
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত বুধবার ঢাকা সেনানিবাসের সেনাপ্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত বলে নিজের মতামত জানান। নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার অবস্থান আগের মতোই। দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের অধিকার একটি নির্বাচিত সরকারেরই রয়েছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধান তার যে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন, সেটিকে যৌক্তিক বলছে বিএনপি। সরকার এটিও আমলে নিবে বলে দলটি মনে করে।
এদিকে গত সপ্তাহে অন্তত দুটি ইস্যুতে বিএনপিকে হার্ডলাইনে দেখা গেছে। ঢাকার দক্ষিণে মেয়র পদে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের শপথ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতা সৌম্য হত্যার প্রতিবাদে রাজধানীতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে দলটির নেতাকর্মীরা। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে শঙ্কা সেটিই মূলত দলটিকে হঠাৎ করে রাজপথে এমন সিদ্ধান্ত নিতে কিংবা তাদেরকে এই পথে ঠেলে দিয়েছে বলে দায়িত্বশীল নেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপি এই অবস্থান নেয় ।
বিএনপি মনে করে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। এমন অবস্থায় দলটির পক্ষ থেকে বার বার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের দাবি জানানো হলেও সরকারের তরফ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা এখনো আসেনি। একই সাথে নানান ধরনের শঙ্কা, গুজব সামনে চলে আসায় সরকারকে একটি বার্তা দেয়ার জন্য রাজপথে তাদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন করে দলটি। নেতারা বলছেন, এই সরকার ব্যর্থ হোক, সেটা তারা চান না। তারা শুরু থেকেই সরকারকে সর্বোতভাবে সহযোগিতা করে আসছেন। তবে তাদের নির্বাচনের দিনক্ষণের দাবি বারবার উপেক্ষিত হওয়ায় রাজপথে হঠাৎ বিশাল জমায়েতে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে তারা সরকারকে এই বার্তা দিতে চেয়েছে যে, বিএনপি চাইলে সরকারকে যেকোনো সময়ই ‘বেকায়দায়’ ফেলতে পারে।
জানা গেছে, রাজপথে এমন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা বিএনপির সিদ্ধান্ত নয়। কারণ, তারা এই সরকারকে কোনোভাবেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে চায় না। সর্বশেষ গত সোমবার অনুষ্ঠিত দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ইস্যুতে তারা কমপক্ষে আরো দুই মাস সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সময় পরে নির্বাচন নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনো সুস্পষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা করা না হলে কিংবা নির্বাচন প্রলম্বিত করার কোনো লক্ষণ স্পষ্ট হলে তখন রাজপথের কর্মসূচির কথা ভাববে বিএনপি।
এ দিকে এই সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন তুলেছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, ঐক্যের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার কথা ছিল। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো মহলের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই যেন সরকারের কর্মপরিকল্পনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টার নানান বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড সরকারের নির্দলীয়-নিরপেক্ষ পরিচিতিকে যেমন ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ করে চলেছে, তেমনি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। তাই সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের পদত্যাগের দাবি তুলেছে দলটি।
অন্য দিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ছোট হওয়া উচিত বলে মনে করে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করাই যেহেতু এই সরকারের প্রধান কাজ; তাই মাথাভারী উপদেষ্টা পরিষদ না রেখে শুধু রুটিন ওয়ার্ক (দৈনন্দিন কার্যক্রম) পরিচালনার জন্য একটি ছোট আকারের উপদেষ্টা পরিষদ রাখাই বাঞ্ছনীয়।
জানা গেছে, দেশে বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শিগগির সর্বদলীয় বৈঠক ডাকতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা। এমনটা না হলে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে। সেখানে এই বিষয়গুলো তারা সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে। একই সাথে নির্বাচন নিয়ে দলের ‘ক্লিয়ার-কাট’ অবস্থানের কথাও জানাবে। বিএনপি মনে করে, আগামী নির্বাচনের জন্য ডিসেম্বর একটা কাটঅফ টাইম। দলটি এই ব্যাপারে এখন আরো বেশি শক্ত অবস্থানে রয়েছে
বিএনপি মনে করে, অন্তর্বর্তীকালীন অস্থায়ী সরকারের একমাত্র ম্যান্ডেট হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। কিন্তু সরকারকে এই দায়িত্ব থেকে অন্য দিকে ডাইভার্ট করতে সরকারের ভেতরের কোনো একটি শক্তি কিংবা ভেতরের একটি মহল কাজ করছে বলে মনে করে দলটি। নেতারা মনে করেন, সরকারের একটি অংশ বিরাজনীতিকরণ বা তাদের মদদপুষ্ট একটি দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাইছে। তাদের এ চেষ্টা সফল হলে কিংবা দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা না করলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।








