অনিয়মের লাগাম টানতে শিক্ষক নিয়োগে নতুন কৌশল
দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে এসব পদে নানাভাবে ফন্দি-ফিকির করে কিংবা অর্থের বিনিময়ে নিজস্ব লোক নিয়োগের বিষয়টি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। এতে অনেক অদক্ষ ও অযোগ্য লোক প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে আসছিল।
- ম্যানেজিং কমিটির পরিবর্তে দায়িত্ব পাচ্ছে এনটিআরসিএ
- অযোগ্য ও অদক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের পথও বন্ধ হচ্ছে
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কলেজে অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ এবং স্কুলপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মের লাগাম টানতে এবার ভিন্ন কৌশল নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অতীতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের সময়েই এই অনিয়ম বন্ধ করা যায়নি। ফলে স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কিংবা গভর্নিং বডির ক্ষমতা খর্ব করে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষকে (এনটিআরসিএ)। সূত্র জানিয়েছে, এখন থেকে দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান’ ও ‘সহকারী প্রধান’ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা’ নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে এসব পদে নানাভাবে ফন্দি-ফিকির করে কিংবা অর্থের বিনিময়ে নিজস্ব লোক নিয়োগের বিষয়টি ছিল ‘ওপেন সিক্রেট’। এতে অনেক অদক্ষ ও অযোগ্য লোক প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে আসছিল। ফলে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গতি এবং শিক্ষার মানও ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। তবে সম্প্রতি ম্যানেজিং কমিটির ক্ষমতা খর্ব করে এনটিআরসিএকে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে।
এ দিকে সর্বশেষ তথ্য মতে সারা দেশে বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার ৫৯৯টি শূন্যপদে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ সুপারিশ করতে প্রশাসনিক অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। একই সাথে এসব পদে নিয়োগ সুপারিশের জন্য একটি ‘অনুসরণীয় পদ্ধতি’র নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
প্রশাসনিক অনুমোদন সংক্রান্ত একটি চিঠিতে গত ২৭ জানুয়ারি বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) চেয়ারম্যানের কাছে পাঠিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। ওই চিঠিতে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যানকে এসব পদে নিয়োগের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বাছাই পরীক্ষা গ্রহণ ও সুপারিশের কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক অনুবিভাগ) মো: মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এই সংস্কার আনা হয়েছে। ইতোমধ্যে এসব পদে নিয়োগে অনুসরণীয় পদ্ধতি সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। তিনি জানান, দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে ১৩ হাজার প্রশাসনিক পদে এখন থেকে সরকার এনটিআরসিএর মাধ্যমে বাছাই পরীক্ষা সম্পন্ন করবে এবং নিয়োগ সুপারিশ করবে। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি কেবল সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগপত্র প্রদান করবে। অপর দিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এত দিন এসব প্রশাসনিক পদে নিয়োগ কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে ন্যস্ত ছিল। স্থানীয় পর্যায়ের এই নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ সামনে আসছিল। এজন্য সরকার নতুন এ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রশাসনিক অনুমোদন সংক্রান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এনটিআরসিএর এক চিঠিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিনটি অধিদফতর (মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী মোট ১৩ হাজার ৫৯৯টি শূন্য পদের বিপরীতে এই নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের অধীনে ১০ হাজার ২৭৮টি, মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে ৩ হাজার ১৩১টি এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের অধীনে ১৯০টি শূন্য পদ রয়েছে।
এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো: আমিনুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, গত ২২ জানুয়ারি অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সুপারিনটেনডেন্ট ও সহকারী সুপারিনটেনডেন্টসহ সাড়ে ১৩ হাজারের বেশি পদে নিয়োগ সুপারিশের লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক অনুমতি মিলেছে। শিগগিরই রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর কোম্পানি টেলিটকের মাধ্যমে নিয়োগের আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, শূন্যপদের মধ্যে মোট ৫৯৯ জন অধ্যক্ষ, ৬৮০ জন উপাধ্যক্ষ, ৪ হাজার ৪২৭ জন প্রধান শিক্ষক, ৩ হাজার ৮৭২ জন সহকারী প্রধান শিক্ষক, ১ হাজার ১৯ জন সুপারিনটেনডেন্ট এবং ১ হাজার ৪৪ জন সহকারী সুপারিনটেনডেন্ট নিয়োগ দেয়া হবে। এর মধ্যে স্নাতক (পাস) ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজ, মাধ্যমিক ও নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ভোকেশনাল এবং কামিল, ফাজিল, আলিম ও দাখিল মাদরাসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এনটিআরসিএর একজন কর্মকর্তা জানান, মাঠ পর্যায় থেকে প্রাপ্ত চাহিদার ভিত্তিতে এই বিশাল নিয়োগ কার্যক্রমের প্রশাসনিক অনুমোদন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদগুলো পূরণ হবে, যা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার করবে।
এ বিষয়ে নিয়োগ সংক্রান্ত পরিপত্রে বলা হয়েছে, এসব প্রশাসনিক পদে নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএ একটি পৃথক পরীক্ষা গ্রহণ করবে। এই পরীক্ষায় মোট ১০০ নম্বর থাকবে। এরমধ্যে লিখিত/বাছাই পরীক্ষা হবে ৮০ নম্বর, শিক্ষাগত যোগ্যতা সনদে ১২ নম্বর এবং মৌখিক পরীক্ষা হবে ৮ নম্বরের। পরিপত্র অনুযায়ী, লিখিত ও মৌখিক উভয় পরীক্ষায় আলাদাভাবে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে পদভিত্তিক শূন্য পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ তিন গুণ প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হবে। আর চূড়ান্ত মেধাক্রম প্রস্তুত করা হবে লিখিত, মৌখিক ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নম্বরের ভিত্তিতে।
পরিপত্রে আরো বলা হয়েছে, মেধাতালিকা ও প্রার্থীর পছন্দক্রম অনুযায়ী প্রতিটি পদের বিপরীতে একজনকে (১:১ অনুপাতে) নিয়োগের জন্য সুপারিশ করবে এনটিআরসিএ। আর এনটিআরসিএর সুপারিশপত্র পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডিকে অবশ্যই এক মাসের মধ্যে সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিয়োগপত্র দিতে হবে। পরিপত্রে আরো বলা হয়, প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর, কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর এবং মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদের চাহিদা এনটিআরসিএর কাছে পাঠাবে।








