অভ্যন্তরীণ সম্পৃক্ততা : গত এপ্রিল বান্দরবানের থানচিতে মাহা সাংগ্রাই উৎসবে তিন শতাধিক আরাকান আর্মি সদস্য প্রকাশ্যে অংশ নেয়। রাজনৈতিক শাখা ‘ইউনাইটেড লিগ অফ আরাকান’-এর নেতাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা স্থানীয় পর্যায়ে কিয়াং ঘর নির্মাণ, বসতি স্থাপন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচার : আরাকান আর্মি সীমান্ত দিয়ে অবাধে অস্ত্র ও মাদক পাচার করছে। মেনচং পাড়া-আলীকদম-চকরিয়া এবং চন্দক পাড়া-থানচি সড়ককে তারা পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। একইসাথে রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে ইয়াবা ও অস্ত্র পাচারও চালাচ্ছে।

ম্রো ও মারমা জনগোষ্ঠীর উপর প্রভাব : পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ম্রো ও মারমা সম্প্রদায়ের সাথে আরাকান আর্মি তথা রাখাইনদের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত সাদৃশ্য রয়েছে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল। সম্প্রতি আরাকান আর্মির সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বান্দরবানে বেশ কয়েকটি কিয়াং ঘর বসবাসের জন্য বাসস্থান এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে। সম্প্রতি লে. কর্নেল লাজেকে বেশ কিছু সামাজিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে দেখা গেছে যেখানে তিনি মারমাদের অভিবাসন ও আরাকান আর্মিতে যোগদানের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র্র পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণে নিতে ধর্ম পরিবর্তনসহ আগ্নেয়াস্ত্র বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর সব কিছুর নেপথ্যে রয়েছে আরাকান আর্মি ও ইউপিডিএফ।

আরাকান আর্মি সদস্যের বিজিবির কাছে আত্মসমর্পণ : গত ১১ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রনি তঞ্চঙ্গ্যা একটি রাইফেল এবং ৫২ রাউন্ড অ্যামোনিশনসহ ৬৪ বিজিবির অধীনস্থ বিএসপি পোস্টে আত্মসমর্পণ করে। মংডু টাউনশিপের সীমান্তবর্তী চার মাইল এলাকায় আরাকান আর্মির ক্যাম্পে রনি তঞ্চঙ্গ্যাকে তিন মাস মেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এ সময়ে রনি তঞ্চঙ্গ্যা একে-৪৭, পিস্তল, স্নাইপার ও আরপিজি অস্ত্রের ব্যবহার ও বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। আরাকান আর্মিতে যোগদানের জন্য তাকে অর্ধ লক্ষ কিয়াত (মিয়ানমারের মুদ্রা) বেতন প্রদান করা হতো এবং রনি তঞ্চঙ্গ্যা অফিসার ছিলেন বলে জানান। তার ভাষ্যমতে, আরাকান আর্মি বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন জায়গায় আরসা ও আরএসও যাতায়াত রোধের জন্য মাইন স্থাপন করেছে।

আরাকান আর্মির রবি সিম ব্যবহার : বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অংশে রবি সিমের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় এবং অধিকাংশ আরাকান আর্মির সদস্য রবি সিম ব্যবহার করে। আরাকান আর্মির সদস্যদের নিকট হতে উখিয়ার কোর্টবাজার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু এলাকা এবং সীমান্ত পিলার এলাকা ব্যবহার করে অস্ত্র ও ইয়াবা পাচার করে নিয়ে যায়। এ ছাড়াও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপে বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বাংলাদেশি উপজাতি বিশেষ করে চাকমা, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের নাগরিক আরাকান আর্মি সদস্য হিসেবে কাজ করছে। বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলার আনুমানিক ১৫০ থেকে ২০০ জন, বান্দরবান সদরের আনুমানিক ৮০ থেকে ১০০ জন, রুমার ১০ থেকে ২০ জন ও নাইক্ষ্যংছড়ির ২০ থেকে ৪০ জন আরাকান আর্মির সদস্য হিসেবে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে দায়িত্ব পালন করছে।

রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ : গত ছয় মাসে অন্তত দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে আরাকান আর্মি। এদের কেউ শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধিত হয়েছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন- গোটা পরিস্থিতি এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তির মদদে আরাকান আর্মি সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করছে। অস্ত্র, মাদক, মানবপাচার ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করা তাদের মূল লক্ষ্য। সীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।