সাক্ষাৎকার : ড. ফেরদৌস আরা খানম
নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে ফেলবে
‘‘নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারকেও ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা।’’
সম্মিলিত নারী প্রয়াসের সেক্রেটারি ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল বলেছেন নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন অবিলম্বে ভেঙে দিয়ে নতুন করে এ ধরনের সংস্কার কমিশন গঠন করা হোক। যেখানে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে অভিজ্ঞ নারীরা তাদের মতামত দিতে পারবে। একই সাথে তিনি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু সুপারিশ উপস্থাপনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে মুসলিমদের উসকে দেয়ার অপপ্রয়াস হিসেবে এ ধরনের অপচেষ্টা করা হয়েছে।
নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের এসব সুপারিশ অন্তর্বর্তী সরকারকেও ইসলামবিদ্বেষী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা বলে দাবি করেছেন তিনি।
নয়া দিগন্তের সাথে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় সংসদে নারীদের আসন সংখ্যা ৩০০ বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নারীদের সংখ্যা বেশি; কিন্তু সচেতন নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে নাই, তাই এক সাথে এতগুলো আসনে নারীদের সদস্য হিসেবে নির্বাচনের সুযোগ দেয়ার আগে তাদের এ ক্ষেত্রে প্রস্তুতির প্রয়োজন, যে কারণে পর্যায়ক্রমে সরাসরি নারী প্রার্থীদের সংসদে নির্বাচনের সুযোগ দেয়া উচিত। এতে সংসদ সদস্য হিসেবে তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়বে।
নয়া দিগন্ত : পারিবারিক অবকাঠামোতে সম্পদের হিস্যার ব্যাপারে পুরুষের সমান নারীদের সম্পদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে। এতে পারিবারিক বা সামাজিক শৃঙ্খলা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে, কেউ কেউ বলছেন, নারীদের পুরুষের তরফ থেকে দেনমোহর দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ভরণপোষণের বাধ্যবাধকতা আছে, এখন সম্পদ পুরুষের সমান দিলে অনেকেই তা মেনে নিতে চাইবেন না, আপনি কি মনে করেন?
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : প্রথমত আমি বলতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকার, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করেছে ১০ সদস্যবিশিষ্ট। এই সংস্কার কমিশনের ব্যাপারে আমরা আপত্তি তুলছি, এই সংস্কার কমিশন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। শিরিন পারভীন হক যার নেতৃত্বে এ কমিশন, তিনি নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নারীপক্ষের অনেক বিষয়ের সাথে মুসলিম নারী ও মুসলিম বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং এটি আমাদের বিশ্বাস মূল্যবোধের সাথে যায় না। যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম, সে দেশে যদি এ রকম কিছু তৈরি করতে হয়, সংস্কার কমিশনের মত, অবশ্যই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের ভেতর থেকেই এমন কোনো ইসলামিক স্কলারদের নেয়া উচিত ছিল যারা ইসলামকে রিপ্রেজেন্ট করবে, মুসলিম নারীকে রিপ্রেজেন্ট করবে। সে ক্ষেত্রে আমার প্রথম আপত্তি হচ্ছে, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন আমাদের জন্যে উপযুক্ত সংস্কার কমিশন হয়নি। এটিকে পুনর্গঠন করে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশে উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে নারীদের সমতা বিধানের জন্য বলা হয়েছে। ইসলামে উত্তরাধিকার আইনটি কুরআন দ্বারা নির্ধারিত। কুরআনের সেই আইন আমাদের দেশের মুসলিমরা মেনে থাকে এবং মানতে বাধ্য। নারীদের সম্পদের ভাগ যেটুকু ইসলামের বিধানে দেয়া হয়েছে, সেটুকু কিন্তু আমাদের দেশে প্রতিপালিত হয় না বা নারীরা পায় না। ভাইরা, স্বামীরা বা পিতাদের পক্ষ থেকে পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েরা সম্পত্তির সেই অধিকারটুকু পায় না। সে জন্য আমরা চাই যেটুকু ইসলাম দিয়েছে, নারীদের সেটুকু আগে নিশ্চিতের ব্যবস্থা করা হোক। শরিয়া-বিরোধী কোনো আইন আমরা মানি না। আমরা এর প্রতিবাদ করছি। নারী সংস্কার কমিশনের এ ধরনের সুপারিশ আমরা কখনো মেনে নেবো না। কারণ এটি কুরআন কর্তৃক নির্ধারিত এবং আল্লাহ যে বিধান অনুযায়ী নারীদের যেটুকু অংশ দিয়েছেন আমরা সেটুকুতেই সন্তষ্ট এবং আমরা মনে করি এটিই ন্যায্য পাওনা। আমরা সমতা চাই না, আমরা নায্যতা চাই।
নয়া দিগন্ত : নারী সংস্কার কমিশনের সুপারিশে যৌনকর্মীদের পেশাগত স্বীকৃতি দেয়ার কথা বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে আপনাদের অভিমত কী?
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : যৌনকর্মীদের পেশাগত স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগের ১৮ নম্বর ধারায় বলা আছে গণিকাবৃত্তি ও জুয়া খেলা নিরোধের জন্যে রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। যেখানে সংবিধান আমাদের বলে দিচ্ছে গণিকাবৃত্তি নিরোধ করা হবে, বন্ধ করা হবে, সেখানে এই নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন যদি যৌনকর্মীদের পেশাগত স্বীকৃতি দাবি করে তাহলে প্রথমত তারা রাষ্ট্রের সংবিধানবিরোধী দাবি করেছে, দ্বিতীয়টি মুসলিম বিধান অনুযায়ী এই ধরনের একটি পেশাকে হারাম বা নিষিদ্ধ করেছে অর্থাৎ ইসলামবিরোধী একটি দাবি এটি। তৃতীয়ত, এটি একজন মুসলিম নারীর জন্য চরম অবমাননা, চরম অবমূল্যায়ন। আমি আমার মেয়ের জন্য, আমার মায়ের জন্য, খালার জন্য যৌনতাকে কখনো পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না। বরং আমরা দাবি করি যারা বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে বা সামাজিক পরিবেশের কারণে এই রকম একটা পেশার জন্য জড়িত হয়েছে অথবা এখনো করতে বাধ্য হচ্ছে, তাদেরকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সামাজিকভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। এই যে নারী সংগঠনগুলো রয়েছে তারা এ ধরনের উদ্যোগ নেবে বলে আমরা আশা করি এবং আমরাও এধরনের উদ্যোগ নেবো বা নিতে সাহায্য করার জন্যে এগিয়ে যাবো। যাতে করে তারা পুনর্বাসিত হতে পারে। যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতির দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা কখনোই আমরা মেনে নেবো না এবং এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
নয়া দিগন্ত : যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তো আর পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয় না। বরং শঙ্কা আছে যে নারী পাচার আরো বেড়ে যেতে পারে। আপনি কী মনে করেন?
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : যে দেশে আসিয়ার মতো শিশুরা ধর্ষিত হচ্ছে, নৈতিকতার এত অবক্ষয় ঘটেছে, সেই সমাজব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত না করে বিগত ফ্যাসিবাদি সরকার ট্রান্সজেন্ডার এসব শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলামের মধ্যে এনে নৈতিক শৃঙ্খলাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে। সেখানে যদি আমরা নতুন করে যদি এসব বিষয় উৎসাহিত বা পৃষ্ঠপোষকতা করি, তাহলে দেশের নারী সমাজকে বিপথগামী করা হবে। তাদেরকে আবার উছৃঙ্খল একটি সমাজে ঠেলে দেয়া হবে, সমাজে মা জাতি, মেয়ে জাতিকে বিপথগামী করা হবে, এর থেকে বাঁচার জন্য একমাত্র পথ হচ্ছে তাদেরকে নৈতিক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা, তাদেরকে নৈতিকভাবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সামাজিকভাবে পুনর্বাসন করা। এর বিকল্প কোনো কিছুই নেই।
নয়া দিগন্ত : নারী তার পরিবারকে আগলে রেখে নেতৃত্ব দেয় এখন তাকে যদি এই বিশৃঙ্খল পরিবেশে ফেলা হয় তাহলে তো পরিবার ভেঙে যাবে, সমাজের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসবে...
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : দেখুন পাশ্চাত্য সমাজ পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্যে ফ্যামিলি ডে, মাদারস ডে, ফাদারস ডে পালন করছে। এর উদ্দেশ্য কী উদ্দেশ্য তাদের সমাজ, তাদের পরিবারকে তারা যাতে ধরে রাখতে পারে। তারা নৈতিকতাকে ধরে রাখতে পারছে না, সে জন্য তারা এইসব দিবসকে উদযাপন করে বাবা-মা’কে দায়িত্ববোধের প্রতি জাগ্রত করার জন্য। পরিবারের প্রতি সন্তানদের কর্তব্যকে জাগ্রত করার জন্য এসব দিবস পালন করা হচ্ছে। সেখানে যদি আমাদের সমাজে এ রকম পরিকল্পনা করা হয় যে, এমন নোংরা ও ঘৃণতম কাজকে দাবি করা হয় পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য এবং এটাকে লাইসেন্সকৃত ব্যবসা হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তাহলে তো পরিবার ব্যবস্থা ভেঙেই যাবে।
নয়া দিগন্ত : নারীবিষয়ক সংস্কারে ম্যারিচুয়াল রেপের কথা বলা হচ্ছে।
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : এটা তাদের আরেক উদ্ভট দাবি। এটা একটা হাস্যকর ব্যাপার। একজন নারী ও পুরুষের বিয়ে হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীকে বা স্ত্রী স্বামীকে কখনো রেপ বা জোর করে দৈহিক সম্পর্কে বাধ্য করার বিষয়টির কোনো সাক্ষী থাকে না। প্রমাণ করারও বিষয় নাই। কে কখন এটা প্রমাণ করবে যে স্বামী তার স্ত্রীকে জোর করে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করছে, অথচ তারা দাবি করছে এ ধরনের ম্যারিচুয়াল রেপ যদি স্বামী কর্তৃক সংঘটিত হয়, তাহলে আইনগতভাবে পুরুষকে দোষী করা হবে এবং তাকে শাস্তি দেয়া হবে। এ ধরনের হাস্যকর দাবি কোনো সমাজ বা সুস্থ মানুষ কখনো মেনে নিতে পারে না। আমরা মনে করি তাদের এই সব চিন্তাচেতনা কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের চিন্তাচেতনা নয়। আমরা এরও তীব্র প্রতিবাদ করি।
নয়া দিগন্ত : এ ধরনের বিষয়গুলো সংসারের শৃঙ্খলাকে তো বিনষ্ট করবে।
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : আরেকটা জিনিস, তারা এই সব জিনিস উত্থাপন করে ইসলামের মৌলিক বিষয়ের সাথে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সংশোধনী চেয়েছে। আমরা দেখেছি তারা খ্রিষ্টান মিশনারির লোকদের সাথে বৈঠক করেছে, নায়িকা, গায়িকা, ট্রান্সজেন্ডারদের সাথে বৈঠক করেছে অথচ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিম বিধান আইনের সাথে তাদের বিরোধ মনে হয়, তারা কিন্তু কোনো আলেম ওলামা বা এই ধরনের স্টেক হোল্ডারদের সাথে মিটিং করে নাই। কোনো মতবিনিময় করে না। এ ছাড়া কিন্তু তারা বাকি সবার সাথে তারা করেছে।
নয়া দিগন্ত : এটা কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : অবশ্যই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা যদি মনে করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী নারীরা বঞ্চিত হয়েছে, অথবা তাদের কাছে ইসলামের এ বিষয় আপত্তিকর মনে হয়েছে, তাহলে তাদের সংশ্লিষ্ট সেসব ব্যক্তির সাথে মিটিং করা উচিত ছিল এবং এটা যে তারা করে নাই, তারা বসেনি, আলোচনা করে নাই, কারণ তাদের এ উদ্যোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইসলামের এই দাবিকে বিতর্কিত করে তোলা, অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তোলাও ছিল তাদের লক্ষ্য। নারী সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে তারা উসকে দিচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাস্তায় নামার জন্য, প্রতিবাদ করার জন্য আর জনগণের সামনে এটা প্রমাণ করতে চাচ্ছে এই সরকার ইসলামবিদ্বেষী কাজ করছে, বিদেশের সামনে প্রমাণ করতে চাচ্ছে যে মৌলবাদীরা এ দেশে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। এই সব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুকে একত্রিত করে এটিকে একটি যড়যন্ত্রমূলক অপচেষ্টা হিসেবে সুপারিশ প্রতিবেদন তৈরি করে দাখিল করেছে। এটা কখনো মুসলিম দেশ ও উম্মার জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নয়া দিগন্ত : দেশে এখন রাজনৈতিক পরিবর্তিত পরিবেশে সংস্কার উদ্যোগ ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। এখন এধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করলে সার্বিক পরিস্থিতি কি অন্য দিকে মোড় নিতে পারে?
ড. ফেরদৌস আরা খানম বকুল : যেসব রাজনৈতিক দল আছে তাদেরকে নারীবিষয়ক সংস্কারের এসব দাবি বিতর্কিত পরিবেশের মুখে ফেলবে। এতে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের এসব সুপারিশ ষড়যন্ত্রমূলক বলে মনে করি। আমরা দাবি করছি এই নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন বাতিল ও নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে এতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলিম নারীদের মধ্যে যারা ইসলামের আকিদা বিধির বিষয়ে অভিজ্ঞ তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। তাহলেই একটি সুন্দর সংস্কার কমিশন গঠন হবে।









