বিলুপ্তির পথে কৃষকের ‘বন্ধু’ বক পাখি

বিলুপ্তির পথে কৃষকের ‘বন্ধু’ বক পাখি
বিলুপ্তির পথে কৃষকের ‘বন্ধু’ বক পাখি

মাকসুদুর রহমান পারভেজ লালমোহন (ভোলা)

অতিনগরায়ণ ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে দিন দিন প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব নানা প্রজাতির পাখি। এ ছাড়াও জলবায়ু পরিবর্তন ও পাখিদের আবাসস্থল বড় গাছ ও বন-জঙ্গল ধ্বংসের ফলেও হারাচ্ছে পাখিরা। এমনি এক পাখি দেশী বক। ভোলার লালমোহন উপজেলায় কয়েক বছর আগেও এই পাখিটিকে দল বেঁধে বিল ও জলাশয়ের ধারে দেখা যেত। কিন্তু এখন আর তাদের তেমন দেখা যায় না।

জানা গেছে, আমাদের দেশে সহজে যেসব সুন্দর সুন্দর পাখির সন্ধান মেলে তার মধ্যে অন্যতম বক। পানির মধ্যে এক পায়ে নিঃশব্দে-নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকে বক, যা দেখতে দৃষ্টিনন্দন। আমাদের দেশে চার থেকে পাঁচ রকমের বকের দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ধূসর বক, লালচে বক, সাদা বক, গোবক, কোঁচ বক ও খুন্তে বক উল্লেখযোগ্য।

লালমোহন উপজেলার রমাগঞ্জ ইউনিয়নের পূর্বচর উমেদ এলাকার প্রবীণ কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, আমরা আগে ক্ষেতে গেলেই বকের দেখা পেতাম। এই বক আমাদের কৃষকদের জন্য অনেক উপকারী ছিল। কারণ ফসলি জমিতে ক্ষতিকারক পোকা ও ফড়িংসহ অন্যান্য উদ্ভিদ খেতো বক। এতে ফসলের উপকার হতো। তবে এখন আর তেমন দেখা মেলে না এই বকের।

ন্যাচার কনজারভেশন কমিটি (এনসিসি) ভোলার সমন্বয়কারী মো: জসিম জনি জানান, আমাদের গ্রামীণ জীবনে কমবেশি সবাই বক পাখি দেখে বড় হয়েছে। তবে এখন এই পাখিটি আমাদের কারণেই কমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ নির্বিচারে ফাঁদ পেতে বক শিকার। এ ছাড়া পাখিদের নিরাপদ অভয়ারণ্য কমে যাওয়ায় দিন দিন বিলুপ্তির পথে বক পাখি। একে রক্ষা করতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

ভোলা সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: কামাল হোসেন জানান, বক পাখি ফসলের জন্য খুবই উপকারী। তবে বর্তমান সময়ে এই বক পাখি এখন আর তেমন দেখা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে পতিত জমির অভাব, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার ও নিরাপদ আবাসস্থলের সঙ্কট। এসবের কারণেই দিন দিন বিলুপ্তির পথে বক। এখনো কোথাও কোথাও খুব কম সংখ্যায় দেখা মেলে বকের। তবে আশঙ্কা হচ্ছে কয়েক বছরের মধ্যেই নানা সঙ্কটের কারণে এই বক পাখি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। প্রকৃতি থেকে একটি প্রাণী হারিয়ে যাওয়া মানেই প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাওয়া। তাই সবাই মিলে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

এ বিষয়ে লালমোহন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো: আহসান উল্যাহ বলেন, অপরিকল্পিত বন উজাড়, তালগাছ, খেজুর গাছ কেটে ফেলা, কীটনাশকের অপব্যবহারের ফলে অনেক উপকারী পোকা ও প্রাণী মারা যাচ্ছে। এজন্য কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে আমরা কৃষকদের আইপিএম পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছি। তিনি আরো জানান, সচরাচর বক দেখা না যাওয়ার কারণ হচ্ছে- অতি জনবসতি, মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলাশয় কমে যাওয়া। তবে জনবহুল এলাকায় বক কম দেখা গেলেও চরাঞ্চলে এখনো অনেক বকের দেখা মিলছে। বকসহ অন্যান্য প্রজাতির পাখিরাও কৃষি ফসলের জন্য উপকারী। তাই এসব পাখি রক্ষায় সম্মিলিতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।