আজকের পত্রিকা

গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় থমকে আছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল

অলস পড়ে আছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় থমকে আছে নতুন শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন কার্যক্রম। জমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং কারখানা প্রস্তুত থাকলেও জ্বালানির অভাবে বিনিয়োগকারীরা উৎপাদনে যেতে পারছেন না। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে এক দিকে বিনিয়োগ আটকে পড়ছে, অন্য দিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে উঠেছে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাসসঙ্কট। গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ অলস পড়ে আছে। অন্য দিকে উৎপাদন না থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ, স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও অন্যান্য পরিচালনব্যয় বহন করতে গিয়ে আর্থিক চাপের মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা। একই সাথে নতুন কর্মসংস্থান, রফতনি বৃদ্ধি এবং প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের লক্ষ্যও হুমকির মুখে পড়েছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন, ২০১০ অনুযায়ী দেশে ১৩টি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলকে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। একই সাথে আরো ১১টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাক-যোগ্যতাপত্র দেয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান তাদের শিল্প কারখানা স্থাপন করে গ্যাসের অভাবে এখন উৎপাদনে যেতে পারছে না।

জ্বালানি বিভাগ, বেজা, শিল্পোদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্পে নতুন গ্যাস সংযোগের প্রায় এক হাজার ৮০০টি আবেদন জমা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫৫০টি প্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের অর্থ পরিশোধসহ সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেও চার থেকে পাঁচ বছর ধরে সংযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। বেশির ভাগ প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ এবং উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকলেও গ্যাসের অভাবে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। এই সঙ্কটের অন্যতম বড় ভুক্তভোগী সিটি গ্রুপ। প্রায় ছয় বছর আগে মুন্সীগঞ্জের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ছয়টি শিল্প ইউনিট নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠানটি। গ্যাস সংযোগের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৮ ও ২০২১ সালে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা জামানতও জমা দেয়া হয়। কিন্তু এখনো গ্যাস না পাওয়ায় কোনো ইউনিটই উৎপাদনে যেতে পারেনি।

সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ হাসান নয়া দিগন্তকে বলেন, উৎপাদন শুরু না হলেও নিয়মিত ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। একই সাথে বিদ্যমান কারখানাগুলোও গ্যাসের নি¤œচাপের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। এতে কার্যকর মূলধনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

একই পরিস্থিতিতে রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। নারায়ণগঞ্জের মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা এবং কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। কুমিল্লা অঞ্চলে স্টিল, কাচ ও পেপার বোর্ড কারখানাসহ একাধিক প্রকল্প নির্মাণ শেষ হলেও দুই বছরের বেশি সময় ধরে গ্যাস ও শিল্প বিদ্যুতের সংযোগ না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি।

মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, প্রায় ৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরও দুই বছর ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায়নি। গ্যাস সরবরাহ সহজ করতে নিজস্ব অর্থায়নে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে পাইপলাইন নির্মাণ করা হলেও শুধু কারখানা রক্ষণাবেক্ষণেই বছরে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে।

একই ধরনের সমস্যায় রয়েছে আব্দুল মোনেম গ্রুপের অর্থনৈতিক অঞ্চল। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা এই অঞ্চলে হোন্ডা ছাড়া অন্য কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারেনি। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে নিটল-নিলয় গ্রুপের কিশোরগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বে গ্রুপের গাজীপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল, আমান গ্রুপের সোনারগাঁও শিল্পাঞ্চল, বসুন্ধরা গ্রুপের সিড ক্রাশিং প্ল্যান্ট এবং টিকে গ্রুপের স্টিল মিলেও।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এটি শুধু শিল্প মালিকদের ক্ষতির বিষয় নয়; এর সাথে যুক্ত রয়েছে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। অধিকাংশ প্রকল্পই ব্যাংকঋণের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। উৎপাদন শুরু না হওয়ায় প্রত্যাশিত নগদপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে না, ফলে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন উৎপাদনহীন অবস্থায় থাকা শিল্পপ্রকল্পগুলো ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর জন্যও ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ প্রকল্প চালু না হলে ঋণ পুনরুদ্ধার ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। কিন্তু গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক ইউটিলিটি নিশ্চিত করতে না পারায় সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারের আশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এখন প্রতিশ্রুত গ্যাস সংযোগ না পাওয়ায় নতুন বিনিয়োগেও অনীহা তৈরি হচ্ছে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ দশমিক ৬ থেকে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিল্প খাতে। বিদ্যমান অনেক কারখানাই পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন সংযোগ দেয়ার সক্ষমতাও সরকারের নেই।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত না করেই শিল্পে গ্যাস সংযোগের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে সীমিত সরবরাহের কারণে পুরনো শিল্পগুলোতেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন সংযোগের আবেদন বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ইউটিলিটি পরিকল্পনা থাকলেও বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব সরাসরি বেজার নয়। যদিও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এই অবস্থানকে বৈষম্যমূলক বলে মনে করছেন। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল অনুমোদনের সময় গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং বৈদেশিক দায় পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছে। তারা বলছেন, গ্যাসসঙ্কট শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে। সরকার বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিলেও প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি নিশ্চিত না হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী উৎপাদনে যেতে পারছেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে নিট বিদেশী বিনিয়োগ কিছুটা বাড়লেও নতুন ইকুইটি বিনিয়োগ কমেছে। প্রতিযোগী দেশ ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করলেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। নীতিগত অনিশ্চয়তার পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের সঙ্কটও এর বড় কারণ।

অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে গ্যাসসঙ্কট পুরোপুরি কাটার সম্ভাবনা কম। তাই নতুন প্রতিশ্রুতি না দিয়ে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে আগে সংযোগের আশ্বাস দেয়া হয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা উচিত। একই সাথে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর করলে সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন, জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, অপচয় রোধ এবং ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। তিনি বলেন, শিল্পকারখানা চালু না হলে শুধু উদ্যোক্তার ক্ষতি হয় না; কর্মসংস্থান সৃষ্টি থেমে যায়, রফতানি আয় বাড়ে না, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বাড়ে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও কমে যায়। ফলে একটি গ্যাস সংযোগের সঙ্কট ধীরে ধীরে পুরো অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ আহ্বান ও শিল্পায়নের ঘোষণার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা বলছেন, নতুন কোনো প্রণোদনা নয়, প্রয়োজন শুধু প্রতিশ্রুত গ্যাস সংযোগ।

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ