দেশের সব নদীই সঙ্কটাপন্ন
সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ৮০ শতাংশ বিলীন
দখল ও দূষণের কারণে দেশের প্রায় দেড় হাজার নদ-নদীর মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে আনুমানিক আড়াই শ’। প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বে বহু নদী বিলীন হয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে পানিসঙ্কটে দেশের নদীগুলো করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে।
সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়েছে দেশের শতভাগ নদনদী। দখল ও দূষণের কারণে দেশের প্রায় দেড় হাজার নদ-নদীর মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে আনুমানিক আড়াই শ’। প্রভাবশালীদের দখলদারিত্বে বহু নদী বিলীন হয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের একের পর এক বাঁধ নির্মাণের ফলে পানিসঙ্কটে দেশের নদীগুলো করুণ পরিণতির শিকার হয়েছে।
নদীর বর্তমান অবস্থা ও সংখ্যা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে দেখা গেছে, কার্যকর উদ্যোগ তো দূরের কথা, নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও সঠিক ও অভিন্ন কোনো তথ্য নেই। অনুসন্ধানে সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থা ও নদী বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে প্রাপ্ত পরস্পরবিরোধী তথ্য বিভ্রান্তি আরো বাড়িয়েছে। দেশের নদীর সংখ্যা ও বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে কেউই নিশ্চিত তথ্য দিতে পারছেন না।
সরকারি তথ্য মতে, দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। এসব নদীর কোনোটি অচল নয়; সবগুলোই জীবিত। তবে শুকনো মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, একাধিক বেসরকারি সংস্থা ও নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে একসময় দেড় হাজারেরও বেশি নদী ছিল। গত কয়েক দশকে তার প্রায় ৮০ শতাংশই প্রাণ হারিয়েছে। বহু নদীর কোনো চিহ্নই আর নেই। দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে এসব নদী পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। আর যেসব নদী এখনো অস্তিত্বশীল, সেগুলোর সবই দখল ও দূষণে নাব্যতা হারিয়ে সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
২০২২ সালের নভেম্বরে দেশের নদীর সঠিক সংখ্যা নির্ধারণে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করে পরিবেশবাদী আইনজীবীদের সংগঠন বেলা। রিটে দেশের নদ-নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির নির্দেশনা চাওয়া হয়। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত হয়নি। অথচ নদী রক্ষার দায়িত্বে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, যৌথ নদী কমিশন, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক সংস্থা রয়েছে। তারপরও দেশের নদী নিয়ে একটি সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বরং এসব সংস্থার তথ্যেই রয়েছে বিস্তর গরমিল।
২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এক প্রতিবেদনে দেশে নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি বলে উল্লেখ করে। একই সংস্থা ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সেই সংখ্যা জানায় এক হাজার ১৫৬টি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে বলা হয়, দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। অন্যদিকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালে হালনাগাদ তথ্যে নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি উল্লেখ করলেও ২০২৪ সালে তা বাড়িয়ে এক হাজার ১৫৬ এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ২৯৪টি নদীর একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করে। সরকারি প্রতিবেদনে নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি থাকলেও কোন নদীর কী অবস্থা, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১১ সালে দেশের ৪০৫টি নদ-নদী নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। সেই সমীক্ষার ১৩৯টি নদীর নাম জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়ায় তখন ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সমালোচকরা বলেছিলেন, পাউবোর সমীক্ষায় চিহ্নিত বহু নদী সরকারি তালিকায় অনুপস্থিত।
বেসরকারি পরিবেশবাদী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। তাদের গবেষণায় নদী দূষণ, শুকিয়ে যাওয়া ও দখলদারিত্বের ভয়াবহতা উঠে এলেও মোট নদীর সংখ্যা ও সঙ্কটাপন্ন নদীর পরিসংখ্যানেও রয়েছে অসামঞ্জস্য।
নদী নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) ২০২৩ সালে স্যাটেলাইট ইমেজ, জেলা প্রশাসনের তথ্য এবং নদী রক্ষা কমিটির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দাবি করে, বর্তমানে দেশে জীবিত নদীর সংখ্যা ৭৫৪টি। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে তারা জানায়, দেশের ৮১টি নদী শুষ্ক মৌসুমে প্রায় পুরোপুরি শুকিয়ে যাচ্ছে। গত বছরের এপ্রিলে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও কুষ্টিয়া অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী নিয়ে কাজ করা যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) জানায়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মোট নদীর সংখ্যা প্রায় ৪০৫টি এবং এর মধ্যে ৬০টির বেশি আন্তর্জাতিক নদী, যেগুলো নিয়ে কমিশনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নদী বিলীনের সাথে সাথে কমেছে নৌপথও। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) এক জরিপে দেখা যায়, তখন দেশে নদীপথের মোট দৈর্ঘ্য ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র আট হাজার কিলোমিটারে। অর্থাৎ প্রায় চার দশকে ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ হারিয়ে গেছে।
দূষণের চিত্রও ভয়াবহ। পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) ২০২৪ সালের এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের নদীগুলোতে প্রতিদিন ১৫ হাজার ৩৪৫ টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ভারত থেকে দুই হাজার ৫১৯ টন এবং মিয়ানমার থেকে ২৮৪ টন বর্জ্য ভেসে আসে। এসব বর্জ্য দেশের ১৮টি আন্তঃসীমান্ত নদী দিয়ে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া প্রতি বছর প্রায় অর্ধ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য বঙ্গোপসাগরে গিয়ে জমা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক আরেক গবেষণায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন নদীর পানিতে ১১ ধরনের ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে জিংক, কপার, আয়রন, লেড, ক্যাডমিয়াম, নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, কার্বন মনোক্সাইড ও মার্কারি শনাক্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, তার কাছে সর্বশেষ কোনো নতুন পরিসংখ্যান নেই। ২০২১-২২ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে নদীর সংখ্যা এক হাজার ৪১৫টি। তবে শুকনো মৌসুমে প্রায় সব নদীতেই পানিপ্রবাহ কমে যায়। কতগুলো নদী মৃতপ্রায়, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি। দখল-দূষণের বিষয়ে তিনি জানান, প্রভাবশালীদের দখলের তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং উচ্ছেদ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, দেশের দেড় হাজারের মতো নদীর প্রায় সবই দখল ও দূষণের শিকার। শুকনো মৌসুমে আড়াইশোর বেশি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। প্রবাহ কমে যাওয়া, সঙ্কোচন এবং পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার কারণেই নদীগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে। তার দায়িত্বকালে নদী দখলদারের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার। ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এর মধ্যে ৩৩ শতাংশ উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়েছিল। এরপর আর উল্লেখযোগ্য উচ্ছেদ হয়নি বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল বলেন, দেশের সব নদীর অবস্থা এখন সঙ্কটাপন্ন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তার ধারণা, দেশে একসময় দেড় হাজারের বেশি নদী ছিল। দখল ও দূষণে এখন মাত্র আড়াইশোর মতো নদী কোনোভাবে টিকে আছে। অধিকাংশ নদীর জায়গা দখল করে সেখানে স্থাপনা গড়ে ওঠায় নদীর কোনো চিহ্নই আর নেই। ঢাকার সব নদী কার্যত খালে পরিণত হয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বাঁধ, পলি জমা, দূষণ এবং উজানে ভারতের বাঁধ, এই পাঁচটি প্রধান কারণে নদীগুলো সঙ্কটাপন্ন। গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে নদীর পানিতে ভারী ধাতুর দূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় অনেক নদী মরে গেছে বা দখল হয়ে গেছে। অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপরিশোধিত বর্জ্য নদী ও খালে ফেলছে। ব্রিজ ও অবকাঠামো নির্মাণের সময় নদী ভরাট করায় প্রবাহ আরো কমে যাচ্ছে। এসব কারণেই নদীগুলো মারা যাচ্ছে।
নদী রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি জানান, ২০১৩ সালের পানি আইন বাস্তবায়নে এতদিন তেমন অগ্রগতি হয়নি। তবে বর্তমানে ২০টি নদী নিয়ে বিস্তারিত কাজ চলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দূষিত তিনটি নদী, লবণদহ, হাঁড়িধোয়া ও সুতাং, খননের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঢাকার চারটি নদী নিয়েও বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।








