ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সঙ্ঘাতে প্রবাসী প্রত্যাবর্তন
সাময়িক রেমিট্যান্স উল্লম্ফনের আড়ালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে নতুন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখে পড়ছে বাংলাদেশ। যুদ্ধের প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী দীর্ঘ দিনের জমানো সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফিরতে শুরু করেছেন। এর ফলে স্বল্পমেয়াদে রেমিট্যান্সপ্রবাহে একটি অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা গেলেও, অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৫৭ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩৪ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিপিএম-৬ অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ রয়েছে প্রায় ২৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ রিজার্ভ আপাতদৃষ্টিতে স্বস্তিদায়ক হলেও, এর পেছনের প্রবাহগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্চ মাসজুড়ে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী। ৩০ মার্চ একদিনেই দেশে এসেছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। আর পুরো মার্চ মাসে এসেছে ৩৬২ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৩২৭ কোটি ২০ লাখ ডলারের তুলনায় প্রায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২৬ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই ‘ডিস্ট্রেস রেমিট্যান্স’ অর্থাৎ প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসার আগে তাদের সঞ্চয় এককালীনভাবে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ফলে রেমিট্যান্সের এই প্রবাহকে টেকসই প্রবৃদ্ধি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হলে বাংলাদেশের নতুন জনশক্তি রফতানি কমে যাবে। একই সাথে বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের একটি অংশ দেশে ফিরে এলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্সপ্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে গিয়ে ডলারের ওপর চাপ তৈরি হবে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়বে আমদানিব্যয়ের ওপর। ইতোমধ্যে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতি মাসে অতিরিক্ত কয়েক শ’ মিলিয়ন ডলার ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রিজার্ভ থেকে বেশি ডলার ছাড়তে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়বে। ফলে রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সাথে আমদানি নিয়ন্ত্রণ বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপের প্রয়োজন হতে পারে, যা শিল্প উৎপাদন ও বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ডলারের সরবরাহ কমে গেলে টাকার অবমূল্যায়ন হতে পারে, যা আমদানি পণ্যের দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি আরো ত্বরান্বিত করবে। ইতোমধ্যে ডলারের বিনিময় হার নিয়ে চাপ রয়েছে, তার ওপর নতুন এই সঙ্কট পরিস্থিতি বাজারকে আরো অস্থির করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে প্রণোদনা, ব্যাংকিং চ্যানেল সহজীকরণ এবং হুন্ডি দমনের কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ছে। তবে তারা স্বীকার করছেন, প্রবাসী শ্রমবাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব সামাল দেয়া কঠিন হবে। অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন, এই পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষ জনশক্তি রফতানি বৃদ্ধি এবং রফতানি আয়ের উৎস বহুমুখীকরণে জোর দেয়া। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমানো, জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
তারা আরো মনে করেন, রেমিট্যান্স প্রবাহকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই রাখতে প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা এবং বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রণোদনা অব্যাহত রাখা জরুরি। একই সাথে দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও নিতে হবে, যাতে তারা দেশের অর্থনীতিতে নতুনভাবে অবদান রাখতে পারেন। সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও রিজার্ভের অবস্থান স্বস্তিদায়ক হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির ইঙ্গিত। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশকে একই সাথে রেমিট্যান্স হ্রাস, আমদানিব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতার মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এ অবস্থায় এখনই সতর্ক নীতি গ্রহণ না করলে সাময়িক স্বস্তি দ্রুতই বড় সঙ্কটে রূপ নিতে পারে এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা।





