আজকের পত্রিকা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার লড়াই সঙ্কটে শিক্ষার পরিবেশ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতার লড়াই  সঙ্কটে শিক্ষার পরিবেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্যাম্পাসগুলোতে, যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার সঙ্ঘাত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। শুধু ছাত্ররাজনীতিই নয়, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পুরনো সংস্কৃতি এখন আরো প্রকট রূপ নিয়েছে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্যাম্পাসগুলোতে, যেখানে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল সমর্থিত ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার সঙ্ঘাত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। শুধু ছাত্ররাজনীতিই নয়, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের পুরনো সংস্কৃতি এখন আরো প্রকট রূপ নিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অন্তত ২০-২৫টি বড় ধরনের সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। হল দখল, প্রশাসনিক ভবনে হামলা এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাকার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব যখন ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কেবল সহিংসতার জন্ম দেয় না, বরং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যকেও ব্যাহত করে।

সম্প্রতি ছাত্ররাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ বা ছদ্মনামীয় রাজনীতি নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

ছাত্রদলের অভিযোগ : শিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে ব্যবহার করে ‘ছদ্মনামে’ হলের ভেতরে অবস্থান নিচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বট আইডি’ ব্যবহার করে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

শিবিরের বক্তব্য : তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তারা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারেনি। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ক্যাম্পাসে তাদের কল্যাণমূলক কাজের জন্যই তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাচ্ছে।

এই বৈরী সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় ক্যাম্পাসগুলোতে, যেখানে দেয়াল লিখন ও সাইবার যুদ্ধ এখন প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এর আঁচ লেগেছে। বিএনপির নেতা ও সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে ছদ্মনামে গুপ্ত কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। তাদের এই গোপন অবস্থান ও ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারই সাম্প্রতিক অস্থিরতার মূল কারণ।’

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ক্যাম্পাসে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে শিক্ষার পরিবেশ বিঘিœত করতে চায়। সরকারের উচিত এখনই কঠোর হওয়া, অন্যথায় এর দায়ভার তাদেরই নিতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : অন্ধ আনুগত্যের ঝুঁকি

দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে ‘অশনিসঙ্কেত’ হিসেবে দেখছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী : তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সংস্কার যদি যথাযথভাবে না হয়, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আবার ‘নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনীতির’ কবলে পড়বে। এতে গণতান্ত্রিক চর্চা এবং মুক্তবুদ্ধির বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : তার মতে, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশাসনে যখন দলীয় বিবেচনা মেধার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার মান ধ্বংস হয়ে যায়।

বিশ্লেষক মোজাহেদুল ইসলাম : তিনি মনে করেন, জাতীয় পর্যায়ের সঙ্ঘাত তৃণমূল বা শিক্ষাঙ্গন পর্যায়ে সহিংসতাকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

শিক্ষাবিদ মনজুর আহমদ : তিনি সতর্ক করে বলেন, পরিচালনা পর্ষদে যোগ্যতার মান কমিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় লোক নিয়োগ করলে শিক্ষাঙ্গনে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ স্থায়ী রূপ নেবে।

বিশেষজ্ঞরা আরো মনে করেন, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের মূল সমস্যা শুধু সহিংসতা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা। গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব এবং জরাজীর্ণ অবকাঠামোর সাথে যখন রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি যুক্ত হয়, তখন সঙ্কট বহুমাত্রিক রূপ নেয়। সুশীলসমাজের মতে, ছাত্ররাজনীতি থাকতে পারে, তবে তা হওয়া উচিত ইতিবাচক ও সহিংসতামুক্ত। কিন্তু বর্তমানে ‘অন্ধ আনুগত্যের’ যে সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধাকে ধ্বংস করছে।

বর্তমান সরকার অবশ্য শিক্ষাকে রাজনীতিমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বরদাস্ত করা হবে না। আমরা শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি নয়, বরং শিক্ষা দিয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে চাই।’ তবে প্রতিমন্ত্রীর এই দৃঢ় অঙ্গীকারের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি প্রতিশ্রুতির পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

নির্বাচন-পরবর্তী এই উত্তাল সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি দলীয় প্রভাব ও ক্ষমতার লড়াই থেকে মুক্ত রাখা না যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাঙ্গনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এখন কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।

এই বিষয়ে আরও

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন ককটেল বিস্ফোরণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন ককটেল বিস্ফোরণ

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৫ এএম

ডাকসুর বড় সফলতা সরকার পরিবর্তনের পরেও হল দখল হয়নি

ডাকসুর বড় সফলতা সরকার পরিবর্তনের পরেও হল দখল হয়নি

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:৪৭ পিএম

এই সম্পর্কিত আরও

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পিএসজির প্রথম জয়

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

সোম, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ