আজকের পত্রিকা

সেতুর পিলারে গতি হারাচ্ছে নদী

  • জমছে পলি
  • কমছে নাব্যতা
  • বাড়ছে ভাঙন

দেশের যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে একের পর এক সড়ক ও রেলসেতু। কিন্তু উন্নয়নের এই অবকাঠামোই অনেক ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য নতুন সঙ্কট তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনাহীন সেতু নির্মাণ, অপর্যাপ্ত পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং নদীর স্বাভাবিক হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করার ফলে দেশের বহু নদী ধীরে ধীরে নাব্যতা হারাচ্ছে। সেতুর পিলারের কারণে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে কোথাও পলি জমছে, কোথাও তীরভাঙন তীব্র হচ্ছে, আবার কোথাও নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। এর ফলে নদীর জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও স্থানীয় অর্থনীতি মারাত্মক ঝুঁঁকির মুখে পড়ছে।

বাংলাদেশে নদীর ওপর নির্মিত সেতুর সুনির্দিষ্ট ও হালনাগাদ কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের শত শত নদীর ওপর হাজার হাজার সড়ক ও রেলসেতু নির্মিত হয়েছে। অনেক বড় নদীর ওপর একাধিক সেতুও রয়েছে। কিন্তু এসব সেতু নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সমন্বিত মূল্যায়ন খুবই সীমিত।

দেশে নদীর প্রকৃত সংখ্যা নিয়েও রয়েছে দীর্ঘদিনের বিভ্রান্তি। ঘধঃরড়হধষ জরাবৎ ঈড়হংবৎাধঃরড়হ ঈড়সসরংংরড়হ ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে দেশের নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আটটি উল্লেখ করলেও ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে এক হাজার ১৫৬ এবং সর্বশেষ হিসাবে এক হাজার ৪১৫টি নদীর তথ্য প্রকাশ করে। অন্য দিকে গরহরংঃৎু ড়ভ ডধঃবৎ জবংড়ঁৎপবং ২০২৩ সালে এক হাজার আটটি, ২০২৪ সালে এক হাজার ১৫৬টি এবং ২০২৫ সালে এক হাজার ২৯৪টি নদীর খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে। নদীর সংখ্যা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর এই অসঙ্গতি যেমন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তেমনি দেশের নদীগুলোর বর্তমান অবস্থা, নাব্যতা বা পরিবেশগত ঝুঁঁকি সম্পর্কেও কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র পাওয়া যায়নি।

এর আগে ২০১১ সালে ইধহমষধফবংয ডধঃবৎ উবাবষড়ঢ়সবহঃ ইড়ধৎফ দেশের ৪০৫টি নদ-নদী নিয়ে একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল। পরে দেখা যায়, ওই সমীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত অন্তত ১৩৯টি নদীর নাম জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে তখন বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক সমালোচনা হয়।

এ দিকে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএফএম) ২০২২ সালে দেশের ২৩৯টি সেতুস্থল নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় এক হাজার ৪৩৪ কিলোমিটার নদীতল জরিপ এবং শত শত নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যায়, সেতুর পিলার নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের গতিশীলতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায়। এর ফলে নদীতলে স্থানীয় ক্ষয়, গভীর গর্তের সৃষ্টি, তীরভাঙন এবং অতিরিক্ত পলি জমার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

গবেষণায় আরো উঠে এসেছে, সেতুর পিলারের কারণে অনেক নদীতে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে কোথাও নাব্যতা দ্রুত কমে যাচ্ছে, আবার কোথাও প্রবাহের গতি বেড়ে তীর ক্ষয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সাথে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নির্মাণকাজের বর্জ্য নদীর পানিদূষণ বাড়াচ্ছে এবং বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে জলাবদ্ধতার ঝুঁঁকিও বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর হাইড্রোলজি ও মরফোলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য বিবেচনা না করে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দীর্ঘমেয়াদে নদীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাদের মতে, প্রতিটি সেতু নির্মাণের আগে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ), নদীর প্রবাহ বিশ্লেষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। অন্যথায় দেশের বহু নদী ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে বিলুপ্তির ঝুঁঁকিতে পড়বে।

এ বিষয়ে নদী বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে সেতু নির্মাণের বিকল্প নেই। তবে উন্নয়ন যেন নদীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সেতু নির্মাণের আগে নদীর প্রবাহ, পলি পরিবহন, তলদেশের গঠন এবং সম্ভাব্য ভাঙনের ঝুঁঁকি বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক নকশা প্রণয়ন করতে হবে। একই সাথে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ পদ্ধতি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণও নিশ্চিত করতে হবে।

অন্য দিকে, সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, ‘বর্তমান পদ্ধতিতে সেতু নির্মাণ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কারণে দেশের প্রধান নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যবস্থায় ইতোমধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এখন ‘রিভার-সেনসিটিভ ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ ধারণাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ নদী শুধু পানির প্রবাহের মাধ্যম নয়; এটি দেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। সেতু নির্মাণের নামে যদি নদীর স্বাভাবিক গতিশীলতা ধ্বংস হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফলের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বহন করতে হবে একটি ভয়াবহ পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সঙ্কটের বোঝা।

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম