আজকের পত্রিকা

নোনা পানিতে বিলীন জলবায়ু তহবিল

  • ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়মে ঝুঁকিতে উপকূল
  • ৫৪ ভাগ অর্থই অপচয় ও দুর্নীতির কারণে লোপাট

বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ করা জাতীয় জলবায়ু তহবিলের প্রায় ৫৪ ভাগ অর্থই অপচয় ও দুর্নীতির কারণে লোপাট হয়ে যাচ্ছে। যার নেপথ্যে রয়েছে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের অনিয়ম, দীর্ঘসূত্রতা ও অপ্রাসঙ্গিক খাতে বরাদ্দ। ফলে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস রোধে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেড়িবাঁধ কোনো কাজে না এসে প্রথম দুর্যোগের ধাক্কাতেই ভেঙে পানিতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, কোস্ট ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাম্প্রতিক যৌথ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। তথ্যানুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটি) থেকে অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রায় দুই হাজার ১১০ কোটি টাকা সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব, ঘুষ ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যে অর্থ সাতক্ষীরা, খুলনা বা বরগুনার মতো অতি ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জেলাগুলোতে টেকসই সিসি (সিমেন্ট কংক্রিট) ব্লক বেড়িবাঁধ নির্মাণ, সুইসগেট সংস্কার কিংবা সুপেয় পানির প্ল্যান্ট বসানোর কাজে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তার একটি বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিন্তু জলবায়ুগতভাবে সম্পূর্ণ নিরাপদ অভ্যন্তরীণ জেলাগুলোতে বিপুল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এমনকি পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এই তহবিলের টাকা শহরাঞ্চলে সাধারণ নর্দমা (ড্রেন) নির্মাণ এবং সড়কবাতি (এলইডি লাইট) বসানোর মতো কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ‘নয়-ছয়’ করা হয়েছে।

একই সাথে ‘প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি’ দেখিয়ে বাজেট বাড়ানোকে অর্থ আত্মসাতের অন্যতম কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। জলবায়ু তহবিলের অধীনে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে প্রায় ৬২ ভাগেরই মেয়াদ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। গড়ে দুই বছরের একটি সাধারণ প্রকল্প শেষ করতে চার থেকে পাঁচ বছর, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৪ বছর পর্যন্ত সময় লাগিয়ে ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করা হয়েছে।

মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে সিসি ব্লক নির্মাণ ও স্থাপনে ভয়াবহ কারিগরি ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে জানান, ব্লক তৈরির সময় বৈজ্ঞানিক অনুপাত অমান্য করে অতিরিক্ত নি¤œমানের বালু ব্যবহার করা হচ্ছে এবং দামি উপকরণ সিমেন্টের পরিমাণ কমিয়ে দেয়া হচ্ছে। শিডিউল অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের চেয়ে অনেক হালকা ও ছোট ব্লক তৈরি করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে, যা তীব্র জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা সহ্য করতে পারছে না।

এ ছাড়া, নদীর ঢালে সিসি ব্লক বসানোর আগে ভেতরের মাটির ক্ষয় রোধ করতে পানির নিচে বিশেষ ‘জিওটেক্সটাইল’ ফিল্টার কাপড় বিছানো বাধ্যতামূলক হলেও ঠিকাদাররা সেখানে নি¤œমানের কাপড় ব্যবহার করছে বা কাপড়ের পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। মাটির নিচে কাজ হওয়ায় এই ফাঁকি সহজে ধরা পড়ে না, ফলে জোয়ারের টানে ব্লকের নিচের মাটি সরে গিয়ে ওপরের সিসি ব্লকগুলো ধসে পড়ে।

শীতকালের শুষ্ক মৌসুম ব্লক তৈরি ও বেড়িবাঁধ সংস্কারের উপযুক্ত সময় হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অনৈতিক দরকষাকষির কারণে তখন কাজ বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তীতে বর্ষা মৌসুম বা ঘূর্ণিঝড়ের ঠিক আগে যখন নদীর পানি বেড়ে যায়, তখন তড়িঘড়ি করে জোয়ারের পানির মধ্যেই ব্লকের ঢালাই দেয়া হয়, যা সঠিকভাবে জমাট বাঁধতে পারে না। এর বাইরে, নদীর গভীর অংশে ¯্রােত কমাতে সিসি ব্লক পানিতে ‘ডাম্পিং’ বা ফেলার ক্ষেত্রে প্রকৌশলগত জটিলতার সুযোগ নিয়ে কাগজে-কলমে অতিরিক্ত ব্লকের হিসাব দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া বিল তুলে নেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বাঁধের সামান্য ফাটল দেখা দিলে তা মেরামত না করে পুরো বাঁধটি পুরোপুরি ধসে যাওয়ার সুযোগ করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কারণ বাঁধ সম্পূর্ণ ধ্বংস হলে পরের বছর আবার নতুন করে কয়েক শ’ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট পাস করানো যায়।

দুর্বল অবকাঠামো ও টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখে পৌঁছেছে, যার বেশির ভাগই উপকূলের অধিবাসী। জাতীয় বাজেটের আকার বাড়লেও মোট বাজেটের তুলনায় পরিবেশ ও জলবায়ু খাতের বরাদ্দের সামগ্রিক অনুপাত বিগত বছরগুলোর চেয়ে হ্রাস পাওয়ায় মাঠপর্যায়ের টেকসই অবকাঠামো নির্মাণে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।

এই সঙ্কট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা সিসি ব্লকের কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা আনার তাগিদ দিয়েছেন। ব্লক তৈরির স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে ‘নজরদারি কমিটি’ গঠন এবং পানির নিচের জিওটেক্সটাইল কাপড়ের কাজ স্বাধীন অডিট এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে। তা না হলে জলবায়ু তহবিলের হাজার কোটি টাকা প্রতি বছর নোনা পানিতে ভেসে যাবে এবং উপকূলের মানুষ চিরকাল জলবায়ু শরণার্থী হিসেবেই থেকে যাবে।

এই সম্পর্কিত আরও

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

সাত মিনিটে এক মাইল দৌড়াতে হবে

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

ডিআরইউ গেমসের পুরস্কার বিতরণ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পিএসজির প্রথম জয়

পিএসজির প্রথম জয়

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

ঝিলি-বর্ষার লক্ষ্য মূল জাতীয় দল

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

পাকিস্তানের পতনে শক্ত অবস্থানে টাইগাররা

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৪ এএম

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

ইউএস ওপেনের নতুন চ্যাম্পিয়ন জভেরেভ

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২৩ এএম

সাম্প্রতিক সংবাদ