পৃথিবীর জঘন্য পাপীদের সেরা হলো ফিরাউন। হজরত জিবরাইল আ: মহানবী সা:-কে বলেন, ‘ইবলিসের অনুসারীদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো ফিরাউন। ফলে তার ডুবে মরার সময় যখন- আমানতু আমি বিশ্বাস করছি বলতে শুরু করে তখন আমি তার মুখে মাটি নিক্ষেপ করেছি, যাতে পূর্ণ কালেমা বলতে না পারে এবং আল্লাহর করুণা তার প্রতি না হয়।’ (তিরমিজি-৩১০৮)
ফিরাউন ছিল আমালিকা বংশের। তার নাম ওলিদ ইবন মুস আব ইবন রাইয়ান। কারো মতে- তার নাম মুসআব ইবন রাইয়ান। কেউ বলেন, তার নাম রাইয়ান, ইবন কাসিরের মতে-তার উপাধি আবু মুররা, কারো মতে- তার নাম রাশসিস, কারো মতে- তার নাম মুনফাতাহ। ফিরাউন তৎকালীন মিসরীয় রাজাদের উপাধি। তার ছিল সুদক্ষ একদল জাদুকর। হজরত ইবন আবদুল হেকাম বলেন, ফিরাউনের জাদুকর তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথম ভাগে ছিল ১২ জন। এদের বলা হতো নকিব বা নেতা। এই ১২ জনের প্রত্যেকের অধীনে ছিল ২০ জন করে ২৪০ জন। এদের বলা হতো আরিফ বা দক্ষ। এদের প্রত্যেকের অধীনে ছিল ১০০ জন করে ২৪ হাজার। এদের প্রধান ছিল শামউন।
ইবন জুবাই বলেন, ‘জাদুকরদের সংখ্যা ছিল ৯০০। তারা তিন দলে বিভক্ত ছিল : ১. আরিশ; ২. আল ফাইউম ও ৩. আল ইসকান্দারিয়া। প্রত্যেক দলে ছিল ৩০০ করে জাদুকর। ইবনে ইসহাক বলেন, জাদুকরদের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার । কারো মতে- তাদের সংখ্যা ছিল ১২ হাজার। ইবনুল মুনকাদির বলেন, তাদের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার। কারো মতে- ১৪ হাজার। কেউ বলেন, ৯ হাজার। তারা তিন হাজার করে বিভক্ত ছিল। এক দলের নাম রাইফ, আরেক দলের নাম সায়িদ, আরেক দলের নাম ফাইউম। কারো মতে- তারা ছিল ৭০ জন পুরুষ। কারো মতে- তারা ছিল ৭৩ জন। সেকালে মিসরীর জাদু ছিল শীর্ষস্থানীয় ও বিশ্ববিখ্যাত। তারা সাধ্যানুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে উপস্থিত। তাদের জাদুর উপকরণ ছিল রশি ও লাঠি। ৩০০ উট তা বহন করে মাঠে এনেছিল। জাদুকররা সবগুলোকে সাপে রূপান্তরিত করল।’ (কুরতুবি, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭৫) হজরত মুসা আ:ও আল্লাহর নির্দেশে জাদুকরদের মোকাবেলা করতে প্রস্তুত হলেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘তারা বলল, হে মুসা! তুমি প্রথমে নিক্ষেপ করবে, না আমারাই প্রথম নিক্ষেপ করব। মুসা বললেন; বরং তোমরাই নিক্ষেপ করো। এরপর তাদের জাদু ক্রিয়ার প্রভাবে তাদের রজ্জু ও লাঠিগুলো বিচরণ করছে বলে অনুমিত হলো।’ (সূরা-ত্বাহা : ৬৫-৬৬)
আরো ইরশাদ করেন- ‘আমি মুসার কাছে ওহি পাঠালাম, তুমিও তোমার লাঠি নিক্ষেপ করো। সহসা তা তাদের অলীক সৃষ্টিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল। ফলে সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং তারা যা করেছিল তা মিথ্যা প্রতিপন্ন হলো। এরপর সেখানে তারা পরাভূত হলো ও লাঞ্ছিত হলো এবং জাদুকররা সিজদাবনত হলো। তারা বলল, আমরা ঈমান আনলাম বিশ^ প্রতিপালকের প্রতি, যিনি মুসা ও হারুনের রব।’ (সূরা আরাফ : ১১৭-১২২)
ফিরাউন যখন দেখল যে, জাদুকররা সবাই মুসলমান হয়ে গেছে, তখন সে ক্রোধে অন্ধ হয়ে বলল, ‘আমি তোমাদেরকে আদেশ করার আগেই তোমরা তার প্রতি বিশ^াস স্থাপন করলে, অতএব, নিশ্চয়ই তোমাদেরকে খেজুরকাণ্ডে শূলবিদ্ধ করব আর তখন তোমরা অবগত হবে যে, আমাদের মধ্যে কার শাস্তি কঠোরতম ও দীর্ঘস্থায়ী।’ (সূরা ত্বাহা-৭১) জাদুকররা উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহর বাণী আমাদের কাছে যে স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার ওপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তার ওপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেবো না। সুতরাং তুমি যা করতে চাও করো। তুমি তো কেবল এ পার্থিব জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করতে পারো। আমরা আমাদের রবের উপর ঈমান এনেছি, যাতে তিনি আমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেন এবং তুমি আমাদের যে জাদু করতে বাধ্য করেছ সেই অপরাধও। আর আল্লাহ শ্রেষ্ঠতম ও চিরস্থায়ী।’ (সূরা ত্বাহা : ৭২-৭৩)
ইবন ওহাব বলেন, মুসা আ:-এর লাঠির সাপের ভয়ে ২৫ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল এবং ফিরাউন মুসা আ:-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিল। (কুরতুবি, অষ্টম খণ্ড, পৃষ্ঠা-২৭৫)
ফিরাউন তার ক্ষোভ ও ক্রোধ মেটানোর জন্য ঈমানদার জাদুকরদের কঠিন শাস্তি দিতে লাগল। মুসা তখন তাদের কোনো উপকার করতে পারেননি। তিনি বলেছেন, মুসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলল, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো এবং ধৈর্য ধারণ করো, রাজ্য তো আল্লাহরই। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তার উত্তরাধিকারী করেন এবং শুভ পরিণাম তো মুত্তাকিদের জন্য।’ (সূরা আরাফ-১২৮)
লেখক : প্রধান ফকিহ, আল-জামিয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী
ফিরাউনের জাদুকর
পৃথিবীর জঘন্য পাপীদের সেরা হলো ফিরাউন। হজরত জিবরাইল আ: মহানবী সা:-কে বলেন, ‘ইবলিসের অনুসারীদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো ফিরাউন। ফলে তার ডুবে মরার...





