শোয়াইব নামের অর্থ আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহপ্রাপ্ত। তিনি ইবরাহিম আ:-এর বংশোদ্ভূত নবী। শোয়াইব আ:-এর পিতা ফাহমিল, ফাহমিলের পিতা এছজার এবং তার পিতা মাদইয়ান। ইবরাহিম আ:-এর পুত্র মাদইয়ানের নামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে। হজরত শোয়াইব আ: এই জনপদে প্রেরিত হয়েছিলেন। ইনি হজরত মূসা আ:-এর শ^শুর ছিলেন। কওমে লুতের ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমে মাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন। চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি নবীদের মধ্যে সেরা বাগ্মী নামে খ্যাত ছিলেন। কোথাও কোথাও ‘আছহাবুল আইকাহ’ বলা হয়েছে যার অর্থ জঙ্গলের বাসিন্দারা।
মাদইয়ান ছিলেন হাজেরা ও সারাহর মৃত্যুর পর হজরত ইবরাহিম আ: আরব বংশোদ্ভূত কেনআনি স্ত্রী ইয়াক্কতিনের ছয়টি পুত্রের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র। হজরত শোয়াইব আ: সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াত রয়েছে। তন্মধ্যে সূরা আল-আরাফ ৮৫-৯৩, হুদ ৮৪-৯৫, আল হিজর ৭৮-৭৯, আশ-শোয়ারা ১৭৬-১৮৯, আল-আনকাবুত ৩৬-৩৭। ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াত রয়েছে।
আল্লাহর গজবে ধ্বংসপ্রাপ্ত ছয়টি জাতির মধ্যে পঞ্চম হলো আহলে মাদইয়ান। মাদইয়ান লুত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাজের সীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধি পূর্ব জর্দানের সামুদ্রিক বন্দর মোআনের অদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফুরি ছাড়াও এই জনপদের লোকেরা মাপে কম দিত, রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায় পথে জনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত।
হজরত শোয়াইব আ:-এর দাওয়াত: ‘আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়াইবকে প্রেরণ করেছিলাম। সে তাদের বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো ইলাহ নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসে গেছে। অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়ো না। ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পর তোমরা সেখানে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ^াসী হও’(সূরা আরাফ-৮৫)।
‘তোমরা পথেঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে, ঈমানদারদের হুমকি দেবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণ করো যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবং লক্ষ করো কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছে অনর্থকারীদের’ (সূরা আরাফ-৮৬)।
কওমে শোয়াইবের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থা : কওমে শোয়াইব আল্লাহর হক তারা নষ্ট করেছিল। আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে তারা কুফুরি, শিরক ও সৃষ্টিপূজায় লিপ্ত ছিল। তারা মাপ ও ওজনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করেছিল। মানুষের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করত। পৃথিবীতে তারা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করেছিল। তারা সংখ্যায় কম ছিল ও দরিদ্র ছিল। আল্লাহ সংখ্যা বৃদ্ধিসহ সচ্ছলতা দান করলেও তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত না।
শোয়াইব আ:-এর দাওয়াতের প্রতিক্রিয়া : সব নবীর সাথে ইতঃপূর্বে যেমন আচরণ করা হয়েছিলÑ শোয়াইব আ:-এর সাথে তার ব্যতিক্রম হয়নি। তাদের কথা এভাবে এসেছে, ‘তোমার সালাত কি তোমাকে এ কথা শেখায় যে, আমরা আমাদের ওইসব উপাস্যের পূজা ছেড়ে দেই, আমাদের পূর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে যেসবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামতো আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগ করি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (সূরা হুদ-৮৭)।
দ্বিতীয়ত : তারা ইবাদত ও মুআমালাতকে পরস্পর প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তার সম্প্রদায়ের কিছু নেতৃস্থানীয় লোক, যারা অহঙ্কার করছিলÑ বলল, হে শোয়াইব! আমরা অবশ্যই তোমাকে এবং তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেবো, অথবা তোমাদের অবশ্যই আমাদের জাতিতে ফিরে আসতে হবে; সে বলল, যদি আমরা (তোমাদের দ্বীনকে) পছন্দ না-ও করি তাহলেও (কি তা মানতে হবে) (সূরা আরাফ-৮৮)।
মাদইয়ানের ওপরে আপতিত গজব : ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের জাতির মাঝে তুমি সঠিক ফায়সালা করে দাও।, কারণ তুমিই হচ্ছো সর্বোত্তম ফায়সালাকারী।’ (সূরা আরাফ-৮৯)। ‘এরপর শোয়াইব তাদের কাছ থেকে সরে গেল, যাওয়ার সময় বলল, হে আমার জাতি, আমি তোমাদের কাছে আমার মালিকের বাণীসমূহ পৌঁছে দিয়েছিলাম, আমি আন্তরিকভাবেই তোমাদের কল্যাণ কামনা করেছিলাম। আমি কিভাবে এমন সব মানুষের জন্য আফসোস করব যারা স্বয়ং আল্লাহকেই অস্বীকার করে।’ (সূরা আরাফ-৯৩)। ‘অতঃপর একটা প্রচণ্ড ভূকম্পন এসে তাদের (এমনভাবে) আঘাত করল, দেখতে দেখতে সবাই তাদের নিজ নিজ ঘরেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল’ (সূরা আরাফ-৯১)। ‘যারা শোয়াইবকে অমান্য করল তারা যেমনভাবে ধ্বংস হয়ে গেল দেখে মনে হয়েছে, সেখানে কোনো দিন কেউ বসবাসই করেনি, বস্তুত যারা শোয়াইবকে অস্বীকার করেছে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত’ (সূরা আরাফ-৯২)।
শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ : ‘আমি কোনো জনপদে নবী পাঠিয়েছিÑ অথচ সেই জনপদের মানুষদের অভাব ও কষ্ট দিয়ে পাকড়াও (পরীক্ষা) করিনি, এমনটি কখনো হয়নি, আশা করা গিয়েছিল, তারা (আল্লাহ তায়ালার কাছে) বিনয়াবনত হবে’ (সূরা আরাফ-৯৪)। কওমের নেতারা ধর্মীয় ও বৈষয়িক ভাগ করে নিয়ে জীবনের সব ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে প্রস্তুত নয় এবং বর্তমানেও একই অবস্থা বিরাজমান। আল্লাহর সাথে শিরক ও নৈতিক অধোপতনের কারণেই তারা আল্লাহর গজবে পতিত হয়েছিল। এমন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
লেখক : উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ





