ইসলাম নারীকে মা, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে অপরিসীম মর্যাদা দান করেছে। মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। নারী জাতিকে হেয় করার জন্য বলা হয়, অর্ধেক জনশক্তিকে কর্মহীন রেখে জাতি অগ্রসর হতে পারে না। সংসারে মা বা স্ত্রীর কাজকে অর্থ দ্বারা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, স্ত্রী স্বামীর সংসারে রান্নাবান্না এমনকি সন্তানকে দুধ পান করাতেও বাধ্য নন। স্ত্রী সংসারে যা করে সবই সদকা অর্থাৎ দান এবং এর বিনিময়ে স্বামীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ মানে সদাচরণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে পাবে অফুরন্ত সওয়াব। আমরা লক্ষ করি, সংসারে সবার আগে ঘুম থেকে জাগে মা বা স্ত্রী এবং সব কিছু গুছিয়ে সবার শেষে ঘুমাতে যায় একজন নারী। সন্তান লালন-পালন ও দুগ্ধদানের মতো কষ্টকর কাজের কারণে একটু বিরক্ত ও গালমন্দ করা সহ্য করার কথা হাদিসে বলা হয়েছে।
হজরত ওমর রা:-এর খেলাফতের সময়ে জনৈক ব্যক্তি স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে খলিফার সাথে দেখা করতে আসেন। খলিফার বাড়ি তো আর রাজপ্রাসাদ নয়, সাধারণের বাড়ির মতোই। খলিফার বাড়িতে এসে দেখেন, গৃহের ভেতরে খলিফার স্ত্রী তাকে খুব গালমন্দ করছেন। লোকটি ভাবলেন, আমি তো বিপদগ্রস্ত আছিই, আমার চেয়ে খলিফা আরো বেশি অসহায়। এটি ভেবে সে বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছে। এমন সময় খলিফা বের হয়ে এসে তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনÑ ঘটনা বলার পর বললেন, আমার চেয়ে আপনাকে বেশি অসহায় ভেবে ফিরে যাচ্ছিলাম। খলিফা বললেন, ‘দেখো তারা আমাদের কত খেদমত করে। চারিত্রিক হিফাজতের পাশাপাশি সন্তানদের দুগ্ধপান, লালনপালন, রান্নাবান্নাসহ সংসারের সব কাজ সম্পন্ন করে। ফলে তাদের একটু কটুকথা, গালমন্দ শুনতেই হয়।’ এই হলো নারীর কাজ সম্পর্কে একজন মুসলিম শাসকের মূল্যায়ন। সংসারে স্ত্রীর নানাবিধ খেদমতের কারণে স্বামীর উচিত তার স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা।
হজরত ফাতেমা রা: নারী জাতির আদর্শ। রাসূলুল্লাহ সা: তাঁর কলিজার টুকরা আদরের কন্যা ফাতেমা রা:-এর জন্য যোগ্য স্বামী হিসেবে বাছাই করেছিলেন ইলম ও তাকওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত দরিদ্র হজরত আলী রা:কে। ফাতেমা রা: সংসারের সব কাজ নিজ হাতে সম্পন্ন করতেন। তিনিও জানতেন, এত কিছু করা তাঁর দায়িত্ব না হলেও স্বামীর প্রতি এটি তাঁর ইহসান এবং আল্লাহ তাঁর মুহসিন বান্দাদের পছন্দ করেন। জাঁতা পিষতে পিষতে ফাতেমা রা:-এর হাতে ফোশকা পড়ে যায় এবং তিনি বেশ কষ্ট পান। একদিন তার পিতার কাছে একজন দাসী চান এবং সে সময়ে তাঁর পিতা ছিলেন ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান। তিনি তাঁর আদরের কন্যাকে দাসীর পরিবর্তে অধিক সওয়াবের আমল শেখালেনÑ সুবহান আল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার। দুনিয়া নয়, আখিরাতই ছিল তাদের কাছে অগ্রাধিকার।
ইসলাম সবসময় মধ্যমপন্থা অবলম্বন অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের তাগিদ দেয়। কুরআন ও হাদিস থেকে আমরা নিজের পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তানসন্ততি ও আত্মীয়স্বজন সবার সাথে উত্তম আচরণের তাগিদ পাই। অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে পিতা-মাতা, দাদা-দাদী ও নানা-নানীকে, কিন্তু সদাচরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কেউ অবহেলার পাত্র-পাত্রী নন। আমরা ফেসবুকে মাঝেমধ্যে লক্ষ করি, অনেকে বলতে চান, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহারের এত তাগিদ থাকলেও শ^শুর-শাশুড়ি সম্পর্কে তেমন দেখি না। প্রশ্ন উঠে, শ^শুর-শাশুড়ির খেদমত করা পুত্রবধূর কতটুকু দায়িত্ব বা জামাইয়ের দায়িত্বই বা কতখানি? আমার উপলব্ধি, সদাচরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ফিতরাতের ধর্ম ইসলামে পিতা-মাতা ও শ^শুর-শাশুড়ির মাঝে কোনো পার্থক্য রাখা হয়নি। আল্লাহপাক পুরুষকে কর্তৃত্বশীল করেছেন এবং পরিবারের সবার প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব প্রধানত পুরুষের। যদি কোনো মানুষের পুত্র না থাকে এবং শুধুই কন্যা থাকে তাহলে অবশ্যম্ভাবী তার সব দায়িত্ব অর্পিত হয় জামাইয়ের ওপর। আসলে মানবিক ধর্ম ইসলাম সব ক্ষেত্রে ইহসান করার কথা বলে।
আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি হয় দ্বিবিধ উপায়ে। এক. রক্ত সম্পর্ক; দুই. বৈবাহিক সম্পর্ক। চাচা-ফুফু রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয় এবং বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে খালা-মামারাও সমমর্যাদার অধিকারী। ইসলামে এই আত্মীয়তার (সব ধরনের আত্মীয়) সম্পর্ক বজায় রাখার জোর তাগিদ রয়েছে এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর স্পষ্ট উক্তি, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না’। পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে তারা শৈশবের অবস্থায় ফিরে যায় এবং সে সময়ে বাড়তি সেবাযতœ প্রয়োজন হয়ে পড়ে। সন্তান পিতা-মাতার খেদমত করতে বাধ্য এবং অবশ্যম্ভাবী স্ত্রী ও সন্তানসন্ততি অপেক্ষা তারা অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহপাক নারীর ফিতরাতে সেবার মনোবৃত্তি দান করেছেন। সন্তান গর্ভে ধারণ, দুগ্ধদান, লালন-পালন নারীর প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যুদ্ধের ময়দানে পুরুষ যুদ্ধ করে এবং নারী আহতদের সেবা করে একজন মুজাহিদের সমান সওয়াব পায়।
নারীর কর্মক্ষেত্র ঘর এবং পুরুষের কর্মক্ষেত্র বহিরাঙ্গন। শ^শুর-শাশুড়ির খেদমত করা পুত্রবধূর দায়িত্বের অংশ না হলে সেই পরিবারে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। তখন বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য ফরজ।
নারীর কর্মক্ষেত্র ঘর এবং পুরুষের কর্মক্ষেত্র বহিরাঙ্গন। শ^শুর-শাশুড়ির খেদমত করা পুত্রবধূর দায়িত্বের অংশ না হলে সেই পরিবারে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। তখন বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া কোনো বিকল্প থাকে না। স্বামীর আনুগত্য স্ত্রীর জন্য ফরজ। এমন কোনো স্বামী কি পাওয়া যাবে যার বাবা-মাকে অবহেলা, অনাদর করা হলে সেই স্ত্রীর প্রতি স্বামী সন্তুষ্ট থাকবে?
ইসলামে তালাক যদিও জায়েজ কিন্তু খুবই অপছন্দনীয়। স্বামীর পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা করলে সেই স্ত্রীকে তালাক দেয়া স্বামীর জন্য জায়েজ। স্ত্রীকে তালাক দেয়ার জন্য হজরত ওমর রা: তাঁর ছেলেকে বললে তিনি বিষয়টি নবী মুহাম্মদ সা:-এর কাছে পেশ করেন। রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘তোমার পিতা কি তালাক দিতে বলেছেন?’ জবাবে বলেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, ‘তাহলে তালাক দাও। হজরত ইবরাহিম আ: তাঁর ছেলে ইসমাইল আ:কে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার কথা বললে পরপর দুইজন স্ত্রীকে তিনি তালাক দেন। এই হলো সন্তানের কাছে পিতা-মাতার মর্যাদা।
ইসলাম পারিবারিক জীবনকে খুবই গুরুত্ব প্রদান করে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ব্যয় হলো আপন পরিবারের জন্য ব্যয়। সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার জন্য পরিবারের সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্যও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। আজকে যে বধূ আগামী দিনে সেই মা-শাশুড়ি। যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। পরস্পরের প্রতি দয়া-মায়া প্রদর্শনের মাধ্যমে পাওয়া যায় স্বস্তি। আমরা স্বামী-স্ত্রী, পিতা-মাতা-সন্তান, ভাইবোনসহ সব আত্মীয়স্বজন ও আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়ার্দ্র হই তাহলে আল্লাহও আমাদের প্রতি দয়ার্দ্র হবেন। রাসূলুল্লাহ সা:-এর একটি হাদিস স্মরণ করে দিয়ে লেখার সমাপ্তি টানতে চাই, ‘জমিনে যারা আছে তাদের সাথে সদাচরণ করো, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের প্রতি সদাচরণ করবেন।’
উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ