‘হে ইমানদারগণ! যদি কোনো পাপাচারী (ফাসেক) তোমাদের কাছে কোনো খবর নিয়ে আসে তা হলে তা যাচাই করে দেখো। এমন যেন না হয় যে, তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীর ক্ষতিসাধন করে বসবে এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে।’ (সূরা হুজুরাত ০৬)
তাফসির গ্রন্থগুলোয় বলা হয়েছে হজরত ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা: সম্পর্কে এটি নাজিল হয়েছে। বনি মুস্তালিক গোত্রের নেতা হারিস ইবনে দিরার (উম্মুল মুমিনিন হজরত জুয়াইরিয়ারের পিতা) রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করে জাকাত দিতে সম্মত হয়ে লোক পাঠাতে বলেন।
সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী বনি মুস্তালিক গোত্র থেকে জাকাত আদায় করতে হজরত ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা:-কে রাসূল সা: পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো কারণে তিনি ভয় পেয়ে সেখানে না গিয়ে মদিনায় ফিরে এসে বলেন, তারা জাকাত দিতে অস্বীকার করেছে ও তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। আসলে বিষয়টি এমন ছিল না। একটি তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা:-কে সংবর্ধনা দিতে এগিয়ে আসা লোকজনকে দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সা: ওয়ালিদের কথায় দারুণভাবে কষ্ট পান এবং সাহাবায়ে কেরাম বনি মুস্তালিক গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য পীড়াপীড়ি করেন। কিন্তু আল্লাহর রাসূল সা: খালিদ বিন ওয়ালিদ রা:-কে পাঠান বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য। সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি দ্বিধান্বিত ছিলেন।
পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে রাসূল তোমাদের মধ্যে বর্তমান। কল্যাণ-অকল্যাণের বিষয়টি তিনি তোমাদের চেয়ে বেশি জানেন। বনি মুস্তালিক গোত্রের নেতা হারিস ইবনে দিরার রা: প্রতিনিধি দলসহ রাসূলুল্লাহ সা:-এর সমীপে হাজির হয়ে বলেন, জাকাত আদায়ের লক্ষ্যে কেউ তাদের কাছে যায়নি বা তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি এবং তাদেরকে হত্যা করার প্রশ্নই ওঠে না। তারা ইসলাম ত্যাগ করেননি এবং ইসলামের ওপর অবিচল রয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা: কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপ খুবই ফলপ্রসূ হয়। যাচাই-বাছাই ও অপেক্ষা না করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিত।
এই সূরায় মুসলমানদের এমন আদব-কায়দা, আচার-আচরণ, শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া হয়েছে, যা তাদের ইমানদারসুলভ স্বভাব-চরিত্র ও ভাবমর্যাদার সহায়ক। নির্দেশ দেয়া হয়েছে প্রতিটি খবর বিশ্বাস করার আগে সেটি যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য।
হজরত ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা: একজন সাহাবি। সাহাবিগণও মানুষ, ভুলত্রুটি তাদেরও হয়েছিল। তারা অন্যায় করলে রাসূলুল্লাহ সা: তাদেরকে শাস্তিও দিয়েছেন। অন্যায় হয়ে গেলে তারা স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকার করে নিজেরাও শাস্তি ভোগ করেছেন। তাদের বড় বৈশিষ্ট্য হলো কোনো ভুল হলে সেই ভুলের ওপর কখনোই তারা অবিচল থাকতেন না। তাৎক্ষণিক তওবা করতেন। তওবার মাধ্যমে বদ আমল নেকিতে পরিণত হয়ে যায়। সাহাবিদের নেকির পাল্লা এত ভারী যে আল্লাহ পাক তাদের দোষত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং তিনি তাদের প্রতি রাজি হয়েছেন। ফলে সব সাহাবির প্রতি উম্মাহর সুধারণা রয়েছে।
মিথ্যা খবর প্রচার করা বড় ধরনের গুনাহ। আল্লাহ পাক এ-জাতীয় অপরাধের সাথে যুক্ত ব্যক্তিকে (ফাসেক) বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে মিথ্যাচার ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মনে হয় না যে, আমরা মুসলিম। ফলে পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি লেগেই আছে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরস্পরের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ কম নয়। এখানে আল্লাহ পাকের নির্দেশ,কোনো খবর পাওয়া গেলে ত্বরিত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি যাচাই করতে হবে। যাচাই ছাড়া দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। আল্লাহ পাক বারবার ধৈর্য অবলম্বনের তাগিদ দিয়েছেন এবং এটিও বলেছেন, তিনি ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয়ে কেউ কারো সম্পর্কে বিরূপ কথা বললে অবশ্যই তা যাচাই করতে হবে এবং পরস্পর আলোচনা করে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হবে। একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রূঢ় আচরণ ইসলামী মূল্যবোধের খেলাফ ও গুনাহের শামিল। আলোচনা ছাড়া এমন সিদ্ধান্তে কেউ কষ্ট পেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি হবে সুস্পষ্ট জুলুম। অবশ্যই তওবা করে সংশোধন না করলে জালেম হিসেবে বিবেচিত হবে। পক্ষান্তরে, মালুম যদি জালেমকে ক্ষমা করে দেয় সেটি হবে উত্তম কাজ এবং আল্লাহ পাক এ অবস্থায় মজলুম বান্দাকে ক্ষমা করে উত্তম বিনিময় দান করবেন।
ক্ষমার মধ্য দিয়ে আল্লাহ পাক বান্দাকে যা দেন অন্য কিছুতে তা লাভ করা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে তার ভাইকে ক্ষমা করবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকে ক্ষমা করবেন। আসুন, আমরা আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আশায় আল্লাহর বান্দার সাথে সদাচরণ করি ও ক্ষমা করে দেই।
উপাধ্যক্ষ (অব:), কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ





