[গতকালের পর]
অসংখ্য হাদিসেও দান-সদকার ফজিলত তুলে ধরা হয়েছে। গোপনে দান করার ব্যাপারে হাদিসে অধিক ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। গোপনে দানকারী কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহর আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে, নবী সা: বলেন, ‘কিয়ামত দিবসে সাত শ্রেণীর মানুষ আরশের নিচে ছায়া লাভ করবে। তাদের মধ্যে এক শ্রেণী হচ্ছে, ‘এক ব্যক্তি এত গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত কি দান করে বাম হাত জানতেই পারে না।’ (বুখারি ও মুসলিম)
দান-সদকা গুনাহ মাফ করে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচায়। নবী সা: বলেন, ‘হে কাব বিন উজরা! নামাজ (আল্লাহর) নৈকট্য দানকারী, রোজা ঢালস্বরূপ এবং দান-সদকা গুনাহ মিটিয়ে ফেলে যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে ফেলে।’ (আবু ইয়ালা, সনদ সহিহ) রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘খেজুরের একটি অংশ দান করে হলেও তোমরা জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করো’ (বুখারি ও মুসলিম)। বর্তমান যুগে অনেক মানুষ এমন আছে, যারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে দান করে এবং তা মানুষকে দেখানোর জন্য। মানুষের ভালোবাসা নেয়ার জন্য। মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য। মানুষের মাঝে গর্ব অহঙ্কার প্রকাশ করার জন্য। কিন্তু দান যদি একনিষ্ঠভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হয় তা দ্বারা হয়তো দুনিয়াবি কিছু স্বার্থ হাসিল হতে পারে কিন্তু আখিরাতে এর কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না। হাদিসে কুদসিতে নবী সা: বলেন, ‘আমি শিরককারীদের শিরক থেকে মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো আমল করে তাতে আমার সাথে অন্যকে শিরক করবে, তাকে এবং তার শিরকির আমলকে আমি পরিত্যাগ করব’ (মুসলিম)।
লোক দেখানো দান-সদকার শাস্তি : যারা মানুষের প্রশংসা নেয়ার উদ্দেশে দান করবে, তাদের দ্বারাই জাহান্নামের আগুনকে সর্বপ্রথম প্রজ্বলিত করা হবে। রাসূল সা: বলেন, ‘সর্বপ্রথম তিন ব্যক্তিকে দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্বলিত করা হবে।... তাদের মধ্যে (সর্ব প্রথম বিচার করা হবে) সেই ব্যক্তির, আল্লাহ যাকে প্রশস্ততা দান করেছিলেন, দান করেছিলেন বিভিন্ন ধরনের অর্থ-সম্পদ। তাকে সম্মুখে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর (আল্লাহ) তাকে প্রদত্ত নিয়ামত পরিচয় করাবেন। সে তা চিনতে পারবে। তখন তিনি প্রশ্ন করবেন, কী কাজ করেছ এই নেয়ামতসমূহ দ্বারা? সে জবাব দেবে, যে পথে অর্থ ব্যয় করলে আপনি খুশি হবেন এ ধরনের সব পথে আপনার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেছি। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এরূপ করেছ এই উদ্দেশ্যে যে, তোমাকে বলা হবে, সে দানবীর। আর তা তো বলাই হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হবে। তখন তাকে মুখের ওপর উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ (মুসলিম)।
কাদের দান করা যাবে?
কাদের দান করা যাবে এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে তাদের তালিকা দেয়া হয়েছে। যথা- ‘জাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য, এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবা, আয়াত-৬০) এ আয়াত দ্বারা ফকিহগণ আট শ্রেণীর লোকদের দান করার কথা বলেছেন-
১. গরিব। যার সম্পদ আছে কিন্তু নিসাব পরিমাণ মালের মালিক নয়।
২. মিসকিন। যার একদমই কোনো সম্পদ নেই।
৩. ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য শরিয়ত নির্দিষ্ট জাকাত আদায়কারী আমেল। এটা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা নিযুক্ত হতে হবে। নিজে নিজে মনে করে নিলে হবে না (জাওয়াহিরুল ফিকহ-৬/৬৯)।
৪. নওমুসলিমদের ইসলামের প্রতি মোহাব্বত বাড়ানোর জন্য উৎসাহমূলক জাকাত প্রদান। এ বিধানটি রহিত হয়ে গেছে। তাই বর্তমানে কোনো ধনী নওমুসলিমকে জাকাত দেয়া জায়েজ নয় (হিদায়া-১/১৮৪, মাআরিফুল কুরআন-৪/১৭১, তাফসিরে মাজহারি-৪/২৩৫)।
৫. দাসমুক্তির জন্য। যেহেতু বর্তমানে দাসপ্রথা নেই। তাই এ খাতটি বাকি নেই।
৬. ঋণগ্রস্তের জন্য।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ। তথা আল্লাহর রাস্তায় থাকা ব্যক্তিদের জন্য। এখন প্রশ্ন হলো- আল্লাহর রাস্তায় কারা আছে? ফুকাহায়ে কিরাম বলেন, এতে রয়েছেন জিহাদরত মুজাহিদরা। তাদের জিহাদের অস্ত্র ও পাথেয় ক্রয় করার জন্য জাকাতের টাকা গ্রহণ করবে। হজের সফরে থাকা দরিদ্র ব্যক্তির জন্য। ইলমে দ্বীন অর্জনকারী দরিদ্র ব্যক্তির জন্য (আদ দুররুল মুখতার-৩৪৩, হিদায়া-১/১৮৫, রূহুল মাআনি-৬/৩১৩)।
৮. সফররত ব্যক্তিকে। যার টাকা পয়সা আছে বাড়িতে। কোনো সফর অবস্থায় অসহায়। তাকে জাকাতের টাকা দেয়া জায়েজ।
মহান আল্লাহ আমাদের এ আলোচনার ওপর আমল করার তাওফিক দারু করুন। আল্লাহুম্মা আমীন।
ইমাম, মসজিদ আল আনাস রা: জিজান, সৌদি আরব





