আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি করে সমগ্র সৃষ্টির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্যে আল্লাহ তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষকে খুবই সীমিত পরিসরে তাঁর গুণে ভূষিত করেছেন। আল্লাহর বাণী, ‘বলো, আল্লাহর রঙ ধারণ করো! আর কার রঙ তার চেয়ে ভালো? আমরা তো তাঁরই ইবাদতকারী’। (বাকারা- ১৩৮)
আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাকে তাঁর গুণে গুণান্বিত হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন যাতে যথাযথভাবে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা হয়। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও। আল্লাহপাকের গুণবাচক ৯৯টি নাম। মানুষ আল্লাহর এসব গুণ তার মধ্যে আত্মস্থ করবে। আল্লাহ পাক মালেক (শাসক) অর্থাৎ সে আব্দুল মালেক হয়ে সুশাসন কায়েম করবে। আল্লাহ রব, মানুষ আব্দুর রব হয়ে আল্লাহর সৃষ্টির লালন-পালনকারী হবে। আল্লাহ হাকিম, মানুষ তাঁর প্রতিনিধি অর্থাৎ আব্দুল হাকিম হিসেবে সমাজে ন্যায়বিচার কায়েম করবে। প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালনের কারণেই আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মানুষের মর্যাদা ও সম্মান এত উচ্চে।
প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আল্লাহ পাক তাঁর সেরা সৃষ্টি মানুষকে কর্মক্ষমতা ও স্বাধীন এখতিয়ার দান করেছেন এবং তাঁর প্রদত্ত এখতিয়ারেরই বিচার হবে আখেরাতে। মানুষকে দিয়েছেন বিবেক অর্থাৎ ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা এবং সাথে দান করেছেন হেদায়াত। প্রথম নবী আদম আ: প্রথম মানুষ হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর নির্বাচিত প্রথম নবী।
মানুষের চিন্তা-ভাবনার মাঝে নানা পার্থক্য রয়েছে। কারো ধারণা আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেই ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে সে নিজেই তার চলার পথ তৈরি করেছে এবং এ ক্ষেত্রে সে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিপরীতপক্ষে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি, তার স্বাধীনতা বলগাহীন নয়, আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। আল্লাহর বিধানের অধীন থেকে সে স্বাধীনতা ভোগ করবে, যদিও আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ অমান্য করার ক্ষমতা তাকে দেয়া হয়েছে। এই স্বাধীনতার কারণেই তার বিচার হবে।
আমাদের সমাজের কিছু মানুষের ধারণা, কোনো কিছু থেকে কোনো কিছু হয় না, সবকিছু আল্লাহ থেকে হয়। এই ধারণা পুরো সত্য নয়, আংশিক। এই মত মেনে নিলে মানুষ আর তার অপরাধের জন্য দায়ী থাকে না। যেমন, একজন মানুষ বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করল। এই মতের অনুসারীরা বলবে বিষের কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহর হুকুমেই সে মারা গেছে। অথচ বিষের মধ্যে রয়েছে জীবন সংহারক ক্ষমতা বা গুণ। বিষ খেয়ে তার মরে যাওয়াটাই স্বাভাবিক কিন্তু এই মরে যাওয়াটা একান্তভাবে নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর। আবার কেউ একজন মানুষকে খুন করার ইচ্ছা পোষণ করে অগ্রসর হলো এবং আক্রমণ করে ব্যর্থ হলো; এই ব্যর্থতার পেছনে কাজ করছে আল্লাহর ইচ্ছা। আবার ভালো কাজের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য।
আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীটাকে তাঁর প্রতিনিধি দ্বারা আবাদ করতে চান। স্বাভাবিক নিয়মে এই পৃথিবীতে যে যত বেশি কর্মতৎপর হবে সে তত অর্জন করতে পারবে। আল্লাহ চান তাঁর বান্দারা পৃথিবীতে কর্মতৎপর হোক। তাই আল্লাহর নির্দেশ নামাজ সমাপনান্তে রুজির জন্য বেরিয়ে পড়ো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো। আল্লাহকে স্মরণ করা অর্থ রুজি তালাশের ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান (হালাল-হারাম) মেনে চলা।
মানুষ কেবল আল্লাহর গোলাম নন, সাথে সাথে তাঁর প্রতিনিধিও। প্রতিনিধির কাজ নিজে মনিবের হুকুম পালনের পাশাপাশি যাতে অন্যরাও হুকুম মানে সেটি দেখা ও কার্যকর করা। একজন ডিসি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নিজে সরকারের নির্দেশ মেনে চলার পাশাপাশি তার জেলায় যাতে সরকারের নির্দেশ কার্যকর হয় তজ্জন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখেন এবং তাকে সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। হাদিসে বলা হয়েছে প্রত্যেক ব্যক্তিই দায়িত্বশীল এবং দায়িত্বের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে। স্বামী স্ত্রীর ওপর দায়িত্বশীল আবার স্ত্রীও পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল এবং এভাবে সবাই কোনো না কোনোভাবে দায়িত্বশীল; দায়িত্বের ব্যাপারে সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। সর্বোপরি এই বিশ^সাম্রাজ্যের একমাত্র মালিক (শাসক) মহান আল্লাহ এবং রাজত্ব কেবল তাঁরই ও হুকুম তাঁরই চলবে; প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের মৌলিক দায়িত্ব সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালানো। এখানেই রয়েছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এবং যারা প্রচেষ্টা চালায় তারাই আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয়ভাজন। তাদেরই জন্য রয়েছে দুনিয়া ও আখেরাতে সাফল্য এবং অসংখ্য নেয়ামতে ভরা ও চোখ ধাঁধানো জান্নাত, থাকবে অনন্তকাল যা কখনোই শেষ হবে না।
মানুষ মাত্রই আল্লাহর প্রতিনিধি। হাদিসের ভাষায় ক্ষুধার্ত মানুষকে খাওয়ালে আল্লাহকে খাওয়ানো হয়, অসুস্থ লোকের সেবাযতœ করলে আল্লাহকে করানো হয়- এটি যেমন সত্য তেমনি কোনো মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার, জুলুম সেটিতো আল্লাহরই সাথে করা হয়। অপরাধীকে শাস্তিদান আল্লাহর দেয়া নিয়মের অধীনেই হতে হবে এবং কোনো তাড়াহুড়ো নয়, অপরাধী যেন উপলব্ধি করে যে তাকে দেয়া এই শাস্তি যথার্থ।
আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সম্মান ও মর্যাদা এত উচ্চে যে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর পরেই মানুষের অবস্থান। মানুষের জীবন, সম্মান ও ধন-সম্পদ অত্যন্ত পবিত্র। আল্লাহর কাছে ভয়ঙ্কর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলো জুলুম- সেটি আল্লাহর সাথে হোক বা তাঁর বান্দার সাথে। জুলুম বলতে বোঝায় কারো অধিকার হরণ করা- সেটি আল্লাহর হোক বা তাঁর বান্দার। আল্লাহর সাথে শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলুম এবং তওবা ছাড়া আল্লাহপাক শিরকের অপরাধ ক্ষমা করবেন না। বান্দার হক নষ্ট করাও জুলুম। এ ক্ষেত্রে তওবা করার পাশাপাশি বান্দার কাছ থেকেও ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। বান্দার হক নষ্ট হওয়ার মতো যত আমল রয়েছে- ওজনে কমবেশি করা, ভেজাল দেয়া, ধোকা-প্রতারণা করা, মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্যদান, কারো সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করা বা আমানত নষ্ট করা, ঘুষের আদান-প্রদান করা সবই কবিরা গুনাহ। পাশাপাশি কাউকে গালি দেয়া, গিবত করা, সম্মান হানি করা, আঘাত করা, খুন করা সবই জঘন্য অপরাধ। মোট কথা মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- সেটি আর্থিক, শারীরিক বা মানসিক সবই কবিরা গুনাহ। এর প্রায়শ্চিত্ত তখনই সম্ভব যখন আল্লাহর কাছে তওবা করার সাথে সাথে ক্ষতিগ্রস্ত (মজলুম) ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া হবে।
লেখক : সাবেক উপাধ্যক্ষ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ





