অন্ন-বস্ত্রের মতো বাসস্থানও মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। এর আসল উদ্দেশ্য নিরাপত্তা ও শান্তিময় বসবাসের ব্যবস্থা করা। প্রত্যেক মানুষই নিজ নিজ বাসস্থানে নির্বিঘেœ ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে চায়। এ ক্ষেত্রে ইসলাম কিছু বিধান ও নীতিমালা নির্ধারণ করেছে, যার চর্চা ও অনুশীলন একটি সভ্য সামাজের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি হলো- ‘অন্যের ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতি নেয়া।’
অনুমতি ছাড়া কারো বাড়ি বা ব্যক্তিগত কক্ষে প্রবেশ- হতে পারে পর্দা লঙ্ঘনের কারণ কিংবা বিরক্তি ও কষ্টের কারণ। তাই বিনা অনুমতিতে কারো ঘরে বা কক্ষে প্রবেশ শুধু শরিয়ত পরিপন্থীই নয়; বরং সাধারণ ভদ্রতা ও সুরুচিরও পরিপন্থী।
পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। অন্যের প্রবেশদ্বারে অনুমতির গুরুত্বের বিষয় আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে ঈমানদাররা, তোমাদের অধীনস্থ যে দাস-দাসী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা রয়েছে যারা সবসময় তোমাদের কাছে যাতায়াত করে, তারাও যেন তিন সময় তোমাদের অনুমতি ছাড়া তোমাদের ঘরে প্রবেশ না করে। এক. ফজরের আগে; দুই. দ্বিপ্রহরে; তিন. ইশার নামাজের পর। আর যারা প্রাপ্তবয়স্ক তারা সর্বদা অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করবে।’ (সূরা নূর : ৫৮-৫৯)
একবার হজরত ইবনে মাসউদ রা:-কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, আমার মায়ের ঘরে প্রবেশের আগে আমার কি অনুমতি নিতে হবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘তুমি কি তোমার মাকে সর্বাবস্থায় (বস্ত্রসহ বা বস্ত্রহীন) দেখতে পছন্দ করো?’ (আদাবুল মুফরাদ-১০৫৯)
উল্লিখিত আয়াতগুলো ও সাহাবি রা:-এর ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, প্রাপ্তবয়স্ক নর-নারীরা কোনো অবস্থাতেই অনুমতি ছাড়া নিজের আপনজনের (বাবা-মা, ভাইবোনের) ঘরে প্রবেশ করবে না, আর অন্যের ঘরে অনুমতি ছাড়া প্রবেশের তো প্রশ্নই আসে না। এমনকি ছোট শিশুরাও তিন সময় অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করবে।
শরিয়ত শুধু অনুমতির বিধানেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং কিভাবে অনুমতি নিতে হবে, কতবার নিতে হবে ও অনুমতি না পেলে কী করবে সেটিও বলে দিয়েছে।
পবিত্র গ্রন্থে মহান রবের ইরশাদ- ‘হে মু’মিনরা, তোমরা অন্যের ঘরে ততক্ষণ পর্যন্ত প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না অনুমতি নাও এবং তার অধিবাসীদের ওপর না সালাম দাও। এটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো। আর যদি তোমরা সেখানে কাউকে না পাও তাহলে তোমাদের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত তোমরা সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি তোমাদের বলা হয় ফিরে যাও, তাহলে ফিরে যাবে। এটিই তোমাদের জন্য অধিক পবিত্রতা। তোমরা যা করো আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।’ (সূরা নূর : ২৭-২৮)
হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা: বলেন, ‘একবার আমি আনসারদের এক মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আবু মুসা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এসে বলেন, আমি তিনবার উমর রা:-এর কাছে অনুমতি চাইলাম; কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া না হলে আমি ফিরে এলাম। উমর রা: আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে কিসে বাধা দিলো? আমি বললাম, আমি প্রবেশের জন্য তিনবার অনুমতি চাইলাম; কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হলো না। তাই আমি ফিরে এলাম। রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যদি তোমাদের কেউ তিনবার প্রবেশের অনুমতি চায়; কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া না হয়, তাহলে সে যেন ফিরে যায়।’ তখন উমর রা: বলেন, আল্লাহর কসম! তোমাকে এ কথার ওপর অবশ্যই প্রমাণ দিতে হবে। তিনি সবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে কি, যে রাসূল সা: থেকে এ হাদিস শুনেছে? তখন উবাই ইবনে কাব রা: বলেন, আল্লাহর কসম! আপনার কাছে প্রমাণ দিতে দলের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তিই উঠে দাঁড়াবে, আর আমি দলের সর্বকনিষ্ঠ ছিলাম। সুতরাং আমি তার সাথে উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, রাসূল সা: অবশ্যই এ কথা বলেছেন। (বুখারি-৬২৪৫)
ওই আয়াতগুলো ও হাদিসে বোঝা যায়, কারো ঘরে প্রবেশের আগে অনুমতির জন্য দু’টি কাজ করতে হবে। প্রথমে সালাম দিতে হবে, তারপর অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি তিনবার নিতে হবে। তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর অনুমতি না মিললে ফিরে চলে আসতে হবে, এটিই ইসলামী শিষ্টাচার।
অনুমতির সময় স্পষ্টভাবে পরিচয় দেয়া, এটিও শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। জাবির রা: বলেন, আমার পিতার কিছু ঋণ ছিল। এ সম্পর্কে আলোচনা করার জন্য আমি রাসূল সা:-এর কাছে আসলাম এবং দরজায় আঘাত করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে? আমি বললাম, আমি। তখন তিনি বলেন, আমি! আমি! যেন তিনি তা অপছন্দ করলেন। (বুখারি-৬২৫০)
উমর রা: একবার রাসূল সা:-এর দরবারে এসে সালাম দিয়ে বললেন, ‘খাত্তাবের বেটা উমর কি প্রবেশ করবে’? (মুসনাদে আহমাদ-২৭৫৬)
উপরোক্ত হাদিস ও সাহাবি রা:-এর ঘটনায় বোঝা যাচ্ছে, অনুমতির সময় ঘরের অধিবাসীদের কাছে স্পষ্ট পরিচয় দিতে হবে, অন্যথায় তাদের কাছে তা বিব্রতকর ও বিরক্তির কারণ হতে পারে।
স্ত্রীর কাছে প্রবেশের আগেও ইসলাম শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছে। জায়নাব সাকাফি রা: (আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা:-এর স্ত্রী) বলেন, আবদুল্লাহ যখন কোনো প্রয়োজন সেরে দরজায় এসে পৌঁছতেন তখন গলা খাঁকারি দিতেন এবং থুথু ফেলতেন, যাতে অকস্মাৎ আমাদের এমন কোনো অবস্থায় দেখে না ফেলেন যা তার খারাপ লাগবে। (তাফসিরে তাবারি-১৭/২৪৫)
অনুমতির বিষয়টি কী পরিমাণ গুরুত্ব রাখে তা এ থেকে উপলব্ধি করা যায়, পবিত্র কুরআনে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে এবং নবী করিম সা: সাহাবায়ে কেরামকে তা শুধু মৌখিক ও আমলগতভাবেই শিক্ষা দেননি; বরং এ ক্ষেত্রে কারো ভুল হলে তৎক্ষণাৎ তাকে সতর্ক করেছেন। এখানে সেসব শিক্ষা-নির্দেশনার মধ্য থেকে জরুরি কিছু বিষয় আলোচনা করা হলো, যেগুলো যথাযথ চর্চা ও অনুসরণ করা হলে আমাদের পারস্পরিক দেখা-সাক্ষাৎ হবে আনন্দপূর্ণ ও কল্যাণকর।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. প্রতিষ্ঠিত, জামেয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ সদর





