শিক্ষা এমন এক মহামূল্যবান রতœখনি, যা আল্লাহ তায়ালা মানবসৃষ্টির আগেই সৃষ্টি করেছেন, যার অকাট্য প্রমাণ বহন করে সূরা আর রাহমানের সেই অমিয় বাণী- ‘যিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আর রাহমান : ২-৩) মহান সৃষ্টিকর্তা শিক্ষাকাঠামোর সুচারু রূপরেখা দাঁড় করাতে, নিজের প্রিয় বন্ধুকে মানবসমাজে শিক্ষকরূপে প্রেরণ করেছেন। হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে- মহানবী সা: বলেন, ‘আমাকে শিক্ষকরূপে প্রেরণ করা হয়েছে।’ (ইবনে মাজাহ- ২২৯)
রাসূল সা: শিক্ষার আলো দিয়ে একটি বর্বর ও অশিক্ষিত জাতিকে সুশিক্ষিত, সুশৃঙ্খল ও সর্বোত্তম জাতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হন। নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে রাসূল সা: ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী ৭০ জনের মুক্তিপণ হিসেবে ঘোষণা করেন, যারা লেখাপড়া জানেন তারা ১০ জন নিরক্ষর ব্যক্তিকে অক্ষর জ্ঞান দান করে মুক্তি পাবেন। (সিরাহ মুহাম্মদ সা:-৩৩২) এ জন্য মানবজীবনে শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রতিটি জিনিসের মতো শিক্ষারও বিন্যস্ততা রয়েছে। শিক্ষাজগতের সুবিশাল পাঠাগারে যদি একটু উঁকি দিই তাহলে দেখা যাবে, শিক্ষা মৌলিকভাবে দুই প্রকার- জাগতিক শিক্ষা ও দ্বীনি শিক্ষা। মানুষের জাগতিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী জ্ঞান ও বিদ্যা হচ্ছে জাগতিক শিক্ষা। যেমন- বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত ইত্যাদি। এই শিক্ষার মূল সূত্র অভিজ্ঞতা। পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির জ্ঞান হচ্ছে দ্বীনি শিক্ষা। এই শিক্ষার মূল সূত্র ওহি। জীবন চলার পথে জাগতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাও কম নয়।
আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াকে উপকরণের জগত বানিয়েছেন। এখানে মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য এবং অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে আঞ্জাম দেয়ার জন্য মানুষকে দান করা হয়েছে পঞ্চ ইন্দ্রিয় ও জ্ঞান-বুদ্ধি। এগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য ইসলাম পূর্ণমাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছে।
ধর্মীয় এবং জাগতিক শিক্ষা মানবজাতির আত্মিক ও আর্থিক উন্নতির সোপান। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, জাপানে ১৯৩০ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে শিক্ষাগত মূলধন বৃদ্ধির ফলে জাতীয় আয়ের ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। জাপান শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ‘জাপানের বিকাশ ও শিক্ষা’ নামক পুস্তকে বলা হয়েছে- ‘এ দেশে শিক্ষার একটি প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সমগ্র জনসমাজের দক্ষতার বৃদ্ধি ঘটানো। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা উপযুক্ত সামাজিক অগ্রগতি কোনোটিই সমাজের শুধু সীমাবদ্ধ অংশের অগ্রগতি থেকে বা গুটিকয়েক দক্ষ ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সম্ভব হতে পারে না।’
পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের পর ইসলাম ও মুসলমানদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছিল তা থেকে উত্তরণের নিমিত্তে ১৮৬৬ সালের ৩০ মে মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ: প্রতিষ্ঠা করেন ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ মাদরাসা (তাহরিকে দেওবন্দ)। ১৮৮৫-তে স্যার সৈয়দ আহমদ খান স্থাপন করেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (গ্রাহাম, দ্য লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্ক অব সাইয়্যেদ আহমেদ খান, পৃষ্ঠা-৭০)। ১৭৮১ সালে মুসলমানদের চাপের মুখে আরবি শিক্ষার ব্যবস্থাস্বরূপ কলকাতায় (পশ্চিমবঙ্গে) বর্তমান ঢাকা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকায় স্থানান্তরিত করা হয় (আলিয়া মাদরাসার ইতিহাস, লেখক আব্দুস সাত্তার)
শিক্ষা অর্জনে যেমন একটি দেশ, একটি জাতি সমৃদ্ধশালী হয়, ঠিক শিক্ষার অধঃপতনেও একটি দেশ, জাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। যার দৃষ্টান্ত বাগদাদ ও ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দুস্তান।
বাগদাদ শহর, কে-ইবা তার নাম শুনিনি? মুসলিম জাহানের বিদ্যাপীঠ। এমন কোনো কুঠির ছিল না যেখানে ছোট্ট একটি লাইব্রেরি ছিল না! শিক্ষা অর্জন ছিলই তাদের জীবন সাধনা। ১২৫৮ সালে চেঙ্গিস খান বাগদাদ দখল করার পর হাজার হাজার লাইব্রেরি পুড়িয়ে ফেলে, যার ছাইতে দজলা নদীর উচ্ছ্বসিত তরঙ্গ পর্যন্তও বন্ধ হয়ে যায়। কারণ চেঙ্গিস খান জানত এটিই তাদের মেরুদণ্ড (অন্তর মম বিকশিত করো, লেখক- ডক্টর জিয়াউল হক)।
বর্তমানে আমাদের পরিস্থিতিও সে একই পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চতর গবেষণাগার সব স্থানেই শিক্ষার অধঃপতন, অবনতি শুরু হয়েছে। যে পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার অবস্থান নিশ্চিত করে। যোগ্যতা অর্জনের অজুুহাতে সেগুলোও একেক করে বাদ পড়ে যাচ্ছে। প্রথমে জেএসসি, পিইসি আর এখন এসএসসি, এইচএসসিতেও সঙ্কোচন নীতি শুরু হয়েছে।
আর যদি উচ্চতর গবেষণাগারের পর্দা উঠিয়ে দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে তার অবস্থা আরো বেহাল। দেশের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুচিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশে চলে যান। পুকুর ও খাল খনন শিখতে বিদেশ সফরে যান। যদি চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুরে যেতে হয়, তাহলে দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলোতে কী শিক্ষা দেয়া হয়? পুকুর খনন শিখতে যদি বিদেশে যেতে হয়, তাহলে দেশের কৃষি কলেজে কী শিক্ষা দেয়া হয়? তিক্ত হলেও সত্য কথা হলো- নিজেদের দুরবস্থার কারণে, নিজেদের শিক্ষার ওপরই আস্থা নেই।
শিক্ষার এই নাজেহাল অবস্থা দেখলে, মনে হয় যেন শিক্ষাভূমিতে রাক্ষস-রাজা আস্তানা গেড়েছে। খুবই সুকৌশলে শিক্ষার কলিজা চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে। যার ফলে শিক্ষাব্যবস্থা এখন নির্জীব হয়ে পড়েছে। দেখার মতো চোখ নেই, শোনার মতো কান নেই, নেই ভাবার জন্য সুস্থ একটি মন। কী এক বিদঘুটে পরিবেশ বিরাজমান!
আমাদের দরদমাখা চক্ষু আজ অন্ধত্ব গ্রহণ করেছে। ফলে যে শিশুর সখ্য বইয়ের সাথে হওয়া দরকার ছিল, তার সখ্য আজ স্মার্টফোনের সাথে গড়ে উঠেছে। নেই খাওয়া নেই নাওয়া, সারা দিন ফ্রি-ফায়ার, পাবজি ও নেট-চ্যাটিং; এগুলো নিয়ে মত্ত। শুধু এতেই ক্ষান্ত নয়, ছয়-সাত বছরের কিশোররা নেশায় অভ্যস্ত হচ্ছে। হারাচ্ছে মনুষ্যত্ব। হচ্ছে সমকামিতায় আসক্ত। ফলে বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠছে কিশোর গ্যাং।
ভাবার সময় তো এখনই। কারা এর জন্য দায়ী? শিক্ষার শূন্যতা সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে মূর্খতার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত করছে। নিপাহ ভাইরাস, ডেঙ্গু ও দুর্ভিক্ষের দাপটে সমাজ আজ নিস্তব্ধতার দ্বারপ্রান্তে। সুতরাং এগুলো কাটিয়ে ওঠার সময় এখনই। জাগ্রত হতে হবে আমার আদরের খোকনকে শিক্ষার উচ্চ শিখরে পৌঁছাতে।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ: প্রতিষ্ঠিত, জামেয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ সদর





