(শেষাংশ)
দানের খাত : ইসলাম অত্যন্ত সুন্দর ও শৃঙ্খলার সাথে দানের খাতও নির্ধারণ করেছে। নফল দান ধনী-গরিব সবাই গ্রহণ করতে পারবে, তবে অধিকারের দিক থেকে গরিবের প্রাধান্য বেশি এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ফরজ দানে আল্লাহতায়ালা খাত সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, এর বাইরে কেউই গ্রহণ করতে পারবে না। মহান রবের ইরশাদ- ‘প্রকৃতপক্ষে সদকা (জাকাত) ১. ফকিরদের; ২. মিসকিনদের; ৩. সেই সব কর্মচারী যারা সদকা উসুলের কাজে নিয়োজিত; ৪. যাদের মনোরঞ্জন করা উদ্দেশ্য; ৫. দাসমুক্তিতে; ৬. ঋণগ্রস্তের ঋণ পরিশোধে; ৭. আল্লাহর পথের মুজাহিদ; ৮. মুসাফিরদের সাহায্যেও (তা ব্যয় করা হবে)। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা তাওবাহ-৬০)
এখানে আট শ্রেণীর মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা জাকাত গ্রহণের অধিকার রাখে। তবে তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণীর প্রথা বর্তমানে প্রচলন না থাকায় এটি স্থগিত আছে। আর চতুর্থ শ্রেণীর খাত হজরত ওমর রা:-এর যুগ থেকে ফকিহ সাহাবিদের সমন্বিত সিদ্ধান্তে স্থগিত করা হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে শুধু পাঁচ শ্রেণীর মানুষই জাকাত গ্রহণের অধিকার রাখে।
দানে সম্পদের ধরন : কী জাতীয় সম্পদ দ্বারা দান করা উত্তম, এ বিষয়ে ও ইসলামে নীতিমালা রয়েছে। মহান রবের ইরশাদ- ‘হে মুমিনগণ; তোমরা যা-কিছু উপার্জন করেছ এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যা কিছু উৎপন্ন করেছি, তার উৎকৃষ্ট জিনিসগুলো থেকে একটি অংশ (আল্লাহর পথে) ব্যয় করো। আর এরূপ মন্দ জিনিস (আল্লাহর নামে) দেয়ার নিয়ত করো না যা (অন্য কেউ তোমাদেরকে দিলে ঘৃণার কারণে) তোমরা চক্ষু বন্ধ না করে তা গ্রহণ করবে না। মনে রেখো, আল্লাহ বেনিয়াজ, সর্বপ্রকার প্রশংসা তাঁরই দিকে ফেরে।’ (সূরা বাকারা-২৬৭)
এ বিষয় আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘তোমরা কিছুতেই পুণ্যের নাগাল পাবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তু থেকে (আল্লাহর জন্য) ব্যয় করবে। তোমরা যা কিছুই ব্যয় করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।’ (সূরা আলে ইমরান-৯২)
দানের ক্ষেত্রে সম্পদের উৎকৃষ্ট ও সেরাটি নির্বাচনের জন্য উল্লিখিত আয়াতসমূহে তাকিদ করা হয়েছে। দুঃখের সাথে একটি কথা না বললেই নয়, বর্তমান সমাজে সম্পূর্ণভাবে এর বিপরীত অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। মাদরাসা ও মসজিদের দানবাক্স খুললেই মনে হয় এটি ছেঁড়া টাকার কারখানা, যা একদমই অচল। আর ভিখারির ভিক্ষার থালা দেখলে মনে হয় পচা টাকার ডাস্টবিন। এমন দান-সদকা আল্লাহর কাছে অতি অপছন্দনীয় ও নিন্দনীয়
দানের ফজিলত : শরিয়তে দান যতটা গুরুত্বপূর্ণ ততটাই প্রতিদানপূর্ণ। দানের প্রতিদানের বিষয় আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের অর্থ ব্যয় করে, তাদের দৃষ্টান্ত এ রকম যেমন একটি শস্যদানা সাতটি শীষ উদগত করে (এবং) প্রতিটি শীষে ১০০ দানা জন্মায়। আর আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা করেন (সওয়াবকে) কয়েকগুণ বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় (এবং) সর্বজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা-২৬১)
উল্লিখিত আয়াতের সারকথা হলো- আল্লাহ তায়ালা একটি বস্তু বা টাকা দান করলে এর ৭০০ গুণ প্রতিদান দিয়ে থাকেন। আর ইখলাস, নিয়ত বা আন্তরিকতার দরুন আল্লাহ তায়ালা তা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন যেমন তিনি চান।
দানের প্রতিদান সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বৈধভাবে অর্জিত সম্পদ থেকে একটি খেজুর সমানও দান করে, আল্লাহ তায়ালা তা (কুদরতি) ডান হাতে গ্রহণ করেন, আর আল্লাহ তায়ালা বৈধ সম্পদ ব্যতীত কবুল করেন না। অতঃপর তা দানকারীর জন্য এভাবে লালন-পালন করেন যেমন তোমরা তোমাদের ঘোড়াসাবককে লালন-পালন করে থাকো। এমনকি এই প্রতিদান একসময় পাহাড়ের মতো হয়ে যায়।’ (বুখারি-১৪১০)
ওই হাদিসের সারমর্ম হলো- দানের গ্রহণযোগ্যতার জন্য সম্পদ হালাল হতে হবে এবং আল্লাহ তায়ালা তা সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করবেন। হারাম সম্পদ আল্লাহ তায়ালা গ্রহণ করেন না। দানের দ্বারা সম্পদ বৃদ্ধি পায় আর কৃপণতার কারণে সম্পদ ধ্বংস হয়।
খোঁটায় বরবাদ : নিষ্ঠার সাথে দান করলে অগণিত প্রতিদান, পক্ষান্তরে দানের খোঁটায় প্রতিদান বরবাদ। এ বিষয় আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করো এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের দান খয়রাত বরবাদ করো না, ওই ব্যক্তির মতো যে নিজের ধন-সম্পদ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ব্যয় করে এবং আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। অতএব, ওই ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ পাথরের মতো যার উপর কিছু মাটি পড়েছিল। অতঃপর এর ওপর প্রবল বৃষ্টি বর্ষিত হলো, অন্তর তাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিলো। তারা ওই বস্তুর কোনো সওয়াব পায় না, যা তারা উপার্জন করেছে। আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শন করেন না।’ (সূরা বাকারা-২৬৪)
আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দান করে খোঁটা দিলে তার প্রতিদান পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। হজরত আবু জার রা: থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘তিন শ্রেণীর ব্যক্তি থাকবে যাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না, তাদেরকে পবিত্রও করবেন না। অতঃপর তিনি (আবু জার) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তারা কারা? আল্লাহর রাসূল সা: বললেন- ১. অহঙ্কারবশত টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী; ২. অনুগ্রহ করে খোঁটা দানকারী; ৩. চমকদার মিথ্যা কথনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রেতা।’ (মুসলিম-১০৬)
হাদিসের ভাষ্য মতে, যারা অনুগ্রহ করে খোঁটা দেয়, কিয়ামতের দিন সে বড় অসহায়ত্ব অনুভব করবে, কারণ আল্লাহ তায়ালা তার সাথে কথা বলবেন না, রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না, তাকে পবিত্রও করবেন না। সুতরাং মুসলমানদের দান একনিষ্ঠ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই হতে হবে। অন্যথায় তার দান আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ: প্রতিষ্ঠিত, জামিয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ সদর
দানের প্রতিদান খোঁটায় বরবাদ
(শেষাংশ)দানের খাত : ইসলাম অত্যন্ত সুন্দর ও শৃঙ্খলার সাথে দানের খাতও নির্ধারণ করেছে। নফল দান ধনী-গরিব সবাই গ্রহণ করতে পারবে, তবে অধিকারের দিক থেকে গরিবের...





