মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা মানবকুল সৃষ্টির পর পুরো মানুষকে রূহের জগতে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই? আমরা সবাই উত্তরে বলেছিলাম- অবশ্যই আপনি আমাদের রব। কিন্তু পৃথিবীর এই মিছে চাকচিক্য আমাদের সেই রূহ জগতের অঙ্গীকারকে ভুলিয়ে রেখেছে। এর ফলে আমরা অশ্লীলতা, বেহায়াপনা এমনকি কুফর-শিরকের মতো গর্হিত কাজসমূহে লিপ্ত হয়ে চলেছি। ফলে এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড আমাদের হতাশা ও দুশ্চিন্তার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করছে। যে কারণে দিন দিন মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক ও সমাজিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া এবং আত্মহত্যার মতো জঘন্যতম সিদ্ধান্ত এ সমাজে মহামারী আকার ধারণ করেছে।
সমাজে এখন সুখী মানুষের বড় অভাব। বলা যায় হতাশা ও দুশ্চিন্তা আমাদের নিত্যদিনের সাথী। এ কথা যে আমি একজন মুসলিম, আমার জন্য হতাশা ও দুশ্চিন্তা বড় নির্বুদ্ধিতার কাজ। (হজরত ইয়াকুব আ: তাঁর সন্তানদের উদ্দেশে বলেন), ‘বৎসগণ! যাও, ইউসুফ ও তার ভাইকে তালাশ করো এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।’ (সূরা ইউসুফ-৮৭)
হতাশা যে শুধু সাধারণ কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলে এমন নয়; বরং ধর্মীয় ও পরকালীন বিষয়েও মানুষকে চরমভাবে প্রভাবিত করে। কারো যখন পাপের পরিমাণ অতি মাত্রায় বেড়ে যায়, সারা দিন গোনাহের সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে থাকে, নিজেও পাপ করে, অন্যকেও পাপের দিকে আহ্বান জানায়, এমতাবস্থায় সে যদি দয়াময় প্রভুকে স্মরণ করতে চায়, তখন একরাশ হতাশা তাকে ঘিরে ধরে এ কথা বলতে থাকে যে, ‘তোমার তো অসংখ্য পাপরাশি, তোমার নিস্তার কি সম্ভব?’ তাদের উদ্দেশ্যে মহান সৃষ্টিকর্তা অতি মায়াময় শব্দে নিরাশ ও হতাশার ভুতুড়ে জগৎ থেকে বের হয়ে আসার নির্দেশ করেছেন। ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গোনাহ ক্ষমা করে দেন। সন্দেহ নেই, তিনিই ক্ষমাশীল দয়ালু।’ (সূরা জুমার-৫৩)
সারকথা, আমরা যদি গোনাহে আসমান-জমিনও পূর্ণ করে ফেলি তার পরও যেন রবের দয়া থেকে সামান্যতম নিরাশ না হই।
হতাশার মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে তাওবার মতো মহামূল্যবান সম্পদ যেন হাতছাড়া না করি -এটিই সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ।
ঐতিহাসিক ঘটনা : বনি ইসরাইলের একজন লোক, যে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর সে তাওবা করার উদ্দেশে বিজ্ঞ কোনো আলেমের কাছে তা জানতে উৎসুক হলো। কেউ তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্ন্যাসীর সন্ধান দিলে সে তার কাছে এসে নিজের ৯৯ খুনের কথা স্বীকার করে বলল, ‘এখন কি আমার তাওবার কোনো সুযোগ আছে?’ সন্ন্যাসী বলল, না। তখন সে তাকেও হত্যা করে ১০০টির কোটা পূর্ণ করে নিলো। পুনরায় সে আবার বড় কোনো আলেমের সন্ধানে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করতে লাগল। এবার তাকে বড় এক আলেমের খোঁজ দেয়া হলো। সে তার কাছে এসে বলল যে, সে ১০০ মানুষ খুন করেছে, এখন কি তার তাওবার কোনো সুযোগ আছে? সে বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই আছে! তার ও তাওবার মধ্যে কোনো বাধা নেই। জ্ঞানী ব্যক্তি বললেন, তবে তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লøাহর ইবাদত করো। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, তা গোনাহের নোঙরা পানিতে প্লাবিত। অতঃপর সে ব্যক্তি নির্দেশিত দেশের দিকে যাত্রা শুরু করল, পথিমধ্যে তার মৃত্যুর ডাক এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আজাবের উভয় ফেরেশতা উপস্থিত হলো। কোন দল রূহ কবজ করবে এ নিয়ে ফেরেশতাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হলো। রহমতের ফেরেশতারা বললেন, ‘এই ব্যক্তি তাওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করেছিল।’ আর আজাবের ফেরেশতারা বললেন, ‘এই ব্যক্তি এখনো কোনো ভালো কাজ করেনি এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত।’ এমতাবস্থায় একজন ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলে, ফেরেশতারা তাকে সালিশ মানলেন। তিনি সিদ্ধান্ত এভাবে দিলেন যে, ‘তোমরা দু’দেশের দূরত্ব মেপে দেখো। এই দুয়ের মধ্যে সে যে দিকের বেশি নিকটবর্তী হবে, সেদিকের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তারা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই ভালো জায়গার বেশি নিকটবর্তী পেলেন। অবশেষে রহমতের ফেরেশতারা তার জান কবজ করলেন।’ (মুসলিম-৬৯০১)
ওই হাদিসে বর্ণিত ঘটনা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট, একজন মানুষ যত বড় গোনাহ করুক না কেন সে খাঁটি মনে তাওবা করলে অবশ্যই সে ক্ষমাপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে, প্রশান্তির সুবাতাস তার অন্তরকে শীতল করবে। মুমিনের শান তো এমনই হওয়া উচিত। যতকাল বেঁচে থাকবে, আল্লাহর রহমতের আশাবাদী হয়েই সে বেঁচে থাকবে। সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে যাবে, চেষ্টায় ব্যর্থ হলে পুনরায় আবার চেষ্টা করবে, বারবার করবে কিন্তু ব্যর্থতার কাছে কখনো হার মানবে না।
লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, ডক্টর আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ: প্রতিষ্ঠিত, জামেয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ সদর
হতাশায় আশার বাণী
মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা মানবকুল সৃষ্টির পর পুরো মানুষকে রূহের জগতে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই? আমরা সবাই উত্তরে বলেছিলাম- অবশ্যই আপনি আমাদের...





