(গতকালের পর)
রিসালাতের বৈশিষ্ট্যাবলি : আমাদের মহানবী সা: যেমন শ্রেষ্ঠ রাসূল তেমনি তাঁর রিসালাতও শ্রেষ্ঠ এবং অনেক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। যেমন-
সর্বজনীন রিসালাত : তিনি হলেন বিশ্বনবী। ফলে তাঁর রিসালাত ব্যাপক ও সর্বজনীন। যেমন আল্লাহর বাণী- বলুন, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সবার প্রতিই আল্লাহর রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। (সূরা আল আরাফ : ১৫৮) আমি তোমাদের জন্য একজন বিশ্বস্ত রাসূল। (সূরা শোয়ারা : ১২৫)
বিশ্ববাসীর জন্য রহমত : তিনি প্রেরিত হয়েছেন বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ। যেমন- আল্লাহর বাণী- আমি আপনাকে সমগ্র জগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া-১০৭)।
পূর্ণাঙ্গ রিসালাত : শেষ নবীর রিসালাত পূর্ণাঙ্গ রিসালাত বলে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা উল্লেখ করেছেন- আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য একমাত্র দ্বীন হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করলাম। (সূরা আল মায়েদা : ৩) নিশ্চয়ই আপনি প্রেরিত রাসূলদের একজন। সরল পথে প্রতিষ্ঠিত। (সূরা ইয়াসিন : ৩-৪)
জাহিলি যুগের রীতিনীতির অবসান : জাহিলি যুগে পালকপুত্রের স্ত্রীকে বিয়ে করা দোষণীয় ছিল। মহানবী সা: তাঁর পালকপুত্র যায়েদ ইবনে হারেসার স্ত্রী যয়নব বিনতে জাহাসকে যায়েদের তালাক দেয়ার পর বিয়ে করলে কাফের-মুশরিকরা বিষয়টিকে খারাপ মনে করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আয়াত নাজিল করে প্রাচীন প্রথা ও রীতিনীতির অবসান ঘটান। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে নবী! স্মরণ করুন, যখন আপনি সে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, যার ওপর আল্লাহ তায়ালা বিরাট অনুগ্রহ করেছেন এবং আপনি (নিজের পালকপুত্র বানিয়ে) যার ওপর অনুগ্রহ করেছেন। আপনি তাকে বলেছিলেন তুমি তোমার স্ত্রীকে রেখে দাও এবং আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো; কিন্তু এ পর্যায়ে আপনার মনের ভেতর যে কথা আপনি লুকিয়ে রেখেছিলেন আল্লাহ তায়ালা তা প্রকাশ করে দিয়েছেন। (আসলে আপনার পালকপুত্রের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে বিয়ে করার ব্যাপারে) আপনি মানুষের (কথাকে) ভয় করছিলেন অথচ আল্লাহ তায়ালাই ভয় পাওয়ার বেশি হকদার। অতঃপর যখন যায়েদ তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে নিজের প্রয়োজন শেষ করে (তাকে তালাক) দিয়ে দেয়। তখন আমি আপনার সাথে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন করে দিয়েছি, যাতে করে (ভবিষ্যতে) মুমিনদের ওপর তাদের পালকপুত্রদের স্ত্রীদের বিয়ের মাঝে আর কোনো সঙ্কীর্ণতা অবশিষ্ট না থাকে, বিশেষ করে তারা যখন তাদের স্ত্রীদের কাছ থেকে নিজেদের প্রয়োজন শেষ করে তথা তালাক দিয়ে দেয়, (আর সবশেষে) আল্লাহ তায়ালার আদেশই কার্যকর হয়ে থাকে। (সূরা আল-আহযাব : ৩৭)
উম্মতের হিতাকাক্সক্ষী : আল্লাহ তায়ালা তাঁর হাবিবকে বহু গুণে গুণান্বিত করেছেন। তাঁর মধ্যে সব নবীর গুণের সমাহার ঘটেছে। তিনি উম্মতের অত্যন্ত হিতাকাক্সক্ষী। আল্লাহ তায়ালা বলেন- তোমাদের কাছে আগমন করেছেন তোমাদের মধ্যকার এমন একজন রাসূল যাঁর কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়, যে হচ্ছে তোমাদের খুবই হিতাকাক্সক্ষী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুণাময়। (সূরা তাওবাহ : ১২৮)
দাঈ ইলাল্লাহ : আল্লাহ তায়ালা মহানবী সা:কে বিরাট দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন। তা হলো দাঈ ইলাল্লাহর দায়িত্ব। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- যদি এরা আপনার সাথে এ ব্যাপারে কোনোরূপ বিতর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে আপনি তাদেরকে বলে দিন, আমি এবং আমার অনুসারীরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্র্পণ করে নিয়েছি; অতঃপর যাদেরকে আসমানি কিতাব দেয়া হয়েছে এবং যারা মূর্খ থেকে গেছে তাদের (সবাইকে) জিজ্ঞেস করুন, তোমরা কি সবাই আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করেছ? হ্যাঁ, তারা যদি (জীবনের সর্বক্ষেত্রে) আল্লাহর আনুগত্য মেনে নেয়, তাহলে তারা তো সঠিক পথ পেয়েই গেল; কিন্তু তারা যদি (ঈমান থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে মনে রাখুন, আপনার দায়িত্ব হচ্ছে কেবল (আমার কথাগুলো) পৌঁছে দেয়া; আল্লাহ নিজেই বান্দাদের (কর্মকাণ্ড) পর্যবেক্ষণ করছেন। (সূরা আলে ইমরান : ২০) আরো ইরশাদ করেন- হে রাসূল! যা কিছু আপনার ওপর নাজিল করা হয়েছে তা আপনি (মানুষের কাছে) পৌঁছে দিন, যদি আপনি তা না করেন, তাহলে আপনি তো তাঁর বার্তা পৌঁছে দিলেন না। (সূরা আল মায়েদা : ৬৭) আরো ইরশাদ করেন- তোমরা (সববিষয়ে) আল্লাহর আনুগত্য করো, আনুগত্য করো (তাঁর) রাসূলের, সতর্ক থাকো (মদ ও জুয়ার ক্ষতি থেকে) আর যদি তোমরা (রাসূলের নির্দেশনা থেকে) মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে জেনে রাখো, আমার রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে (আমার কথাগুলো) পৌঁছে দেয়া। (সূরা মায়েদা : ৯২) আরো ইরশাদ করেন- রাসূলের দায়িত্ব (হিদায়াতের বাণী) পৌঁছে দেয়া ছাড়া আর কিছুই নয়, আর তোমরা যা কিছু প্রকাশ করো, যা কিছু গোপন রাখো, আল্লাহ তায়ালা তা সবই জানেন। (সূরা আল মায়েদা : ৯৯) অন্যত্র ইরশাদ করেন- (আমি আপনাকে কিতাব দিয়েছি) এখন আপনার দায়িত্ব হচ্ছে শুধু পৌঁছে দেয়া, আর আমার কাজ হচ্ছে হিসাব নেয়া। (সূরা রাদ-৪০) আরো ইরশাদ করেন- অতঃপর যদি এরা (হেদায়েত থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে (জেনে রাখুন) আমি আপনাকে তাদের ওপর দারোগা করে পাঠাইনি; আপনার দায়িত্ব হচ্ছে শুধু (আল্লাহর বাণী) পৌঁছে দেয়া। (সূরা শুরা-৪৮) আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন- বলো! এটাই আমার পথ যে, আমি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাই। (সূরা ইউনুছ-১০৮) আরো ইরশাদ করেন- আল্লাহর পথে মানুষকে হিকমত ও উত্তম উপদেশ সহকারে দাওয়াত দাও (সূরা আন নাহল : ১২৫)। আরো ইরশাদ করেন- হে রাসূল! আপনি তাদেরকে উপদেশ দিন, আপনি কেবল উপদেশদাতা, আপনাকে দারোগা বানিয়ে পাঠানো হয়নি যে আপনি তাদের বাধ্য করবেন (সূরা আল গাশিয়া : ২১-২২)
অন্যত্র ইরশাদ করেন- অতঃপর নিশ্চয় আপনার দায়িত্ব শুধু পৌঁছানো। (সূরা আর রাদ-৪০) (চলবে)