(গতকালের পর)
দ্বীনি কাজের প্রশিক্ষক : মহানবী সা: সাহাবায়ে কিরামকে দ¦ীনি সব কাজের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি তাদের নামাজের নিয়ম-কানুন শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে নামাজের ইমামতি করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- আর যদি আপনি তাদের (সৈন্যদের) মধ্যে থাকেন, এরপর সালাতে দণ্ডায়মান হোন তখন যেন তাদের একদল আপনার সাথে দণ্ডায়মান থাকে এবং স্ব স্ব অস্ত্র গ্রহণ করে, এরপর যখন সিজদাহ সম্পন্ন করে তখন যেন তারা আপনার পশ্চাদ্বর্তী হয় এবং অন্য দল যারা সালাত আদায় করেনি তারা যেন অগ্রসর হয়ে আপনার সাথে সালাত আদায় করে। (সূরা নিসা : ১০২) রাসূল সা: সাহাবায়ে কিরামদের থেকে জাকাত আদায় করতেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- (হে নবী!) আপনি তাদের ধন-সম্পদ হতে সাদাকাহ গ্রহণ করুন, যা দিয়ে তাদের পবিত্র করবেন, আর তাদের জন্য দোয়া করবেন। অবশ্যই আপনার দোয়া তাদের জন্য হবে শান্তির কারণ, আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা এবং মহাজ্ঞানী। (সূরা আত তাওবা-১০৩)
চুড়ান্ত ফয়সালা দাতা : মহানবী সা: শরয়ি সব সমস্যার সমাধান করতেন। আর তাঁর ফয়সালাই চূড়ান্ত এবং মানা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- অতএব আপনার রবের শপথ! তারা কখনোই বিশ্বাস স্থাপনকারী হতে পারবে না, যে পর্যন্ত আপনাকে তাদের সৃষ্ট বিরোধের বিচারক না মানে, এরপর আপনি যে বিচার করবেন তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল না করে (সূরা আন-নিসা ৬৫)। আরো ইরশাদ করেন- আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোনো বিষয়ে ফয়সালা করেন তখন নিজের ইচ্ছায় সে ফয়সালার বিপরীত করা কোনো ঈমানদার- নর-নারীর কাজ হতে পারে না। (সূরা আল আহযাব-৩৬) আরো ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি- যেন আপনি তদনুযায়ী মানুষদের আদেশ প্রদান করেন, যা আল্লাহ আপনাকে শিক্ষা দান করেছেন এবং আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষে বিতর্ককারী হবেন না (সূরা আন-নিসা : ১০৫) অন্যত্র ইরশাদ করেন- রাসূল তোমাদের যা কিছু দেন তা তোমরা গ্রহণ করো। আর যা থেকে তিনি তোমাদের বিরত থাকতে বলেন তা থেকে বিরত থাকো। (সূরা আল-হাশর- ৭)
বীর সেনানায়ক : মহানবী সা: ছিলেন একজন বীর সেনানায়ক। তিনি নিজে ১৭টি যুদ্ধে প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার সাহাবীদের যুদ্ধবিগ্রহে অনুপ্রাণিত করেছেন। যেমন- আল্লাহর বাণী- আর (স্মরণ করুন) যখন আপনি বিশ্বাসীদের যুদ্ধার্থে যথাস্থানে সংস্থাপিত করার জন্য প্রভাতে স্বীয় পরিজন হতে বের হয়েছিলেন এবং আল্লাহ সব কিছু শানেন ও জানেন। (সূরা আলে-ইমরান : ১২১) অন্যত্র ইরশাদ করেন- অতএব আল্লাহর পথে যুদ্ধ করুন; আপনার নিজের ছাড়া আপনার ওপর অন্য কারো ভার অর্পণ করা হয়নি এবং বিশ্বাসীদের উদ্বুদ্ধ করুন; অচিরেই আল্লাহ অবিশ্বাসীদের সংগ্রাম প্রতিরোধ করবেন। আর আল্লাহ সংগ্রামে সুদৃঢ় ও শাস্তি দানে কঠোর। (সূরা আন নিসা : ৮৪) আরো ইরশাদ করেন- অতএব তোমরা যদি তাদের যুদ্ধের ময়দানে আয়ত্তে আনতে পার, তাহলে তাদেরকে তাদের পিছনে যারা রয়েছে তাদের থেকে বিছিন্ন করে এমনভাবে শায়েস্তা কর যাতে তারা শিক্ষা পায়। (সূরা আল আনফাল : ৫৭) আরো ইরশাদ করেন- হে নবী! মুমিনদেরকে জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করুন, তোমাদের মধ্যে যদি বিশজন মুজাহিদ থাকে, তাহলে তারা দু’শ জন কাফিরের ওপর জয়যুক্ত হবে, আর তোমাদের মধ্যে একশত জন থাকলে তারা একহাজার কাফিরের উপর বিজয়ী হবে। কেননা, তারা এমন সম্প্রদায় যাদের বোধশক্তি নেই, কিছুই বোঝে না। (সূরা আল আনফাল : ৬৫) আরো ইরশাদ করেন- হে নবী! কাফির এবং মুনাফিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুন। আর তাদের প্রতি কঠোর হোন। (সূরা আত-তাওবা : ৭৩)
করুণাময় : মহানবী সা: ছিলেন অতি করুণাময় ও দয়ালু। তিনি শত্রু-মিত্র সবার প্রতি দয়ার আদর্শ স্থাপন করেছেন। সে হিসেবে যুদ্ধ বন্দীদের প্রতিও তিনি আল্লাহর নির্দেশে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে নবী! মু’মিনদের হাতে যারা বন্দী হয়েছে তাদের বলুন, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কল্যাণকর কিছু রয়েছে বলে অবগত হন, তাহলে তোমাদের হতে (মুক্তিপণরূপে) যা কিছু নেয়া হয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম কিছু দান করবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। (সূরা আল আনফাল : ৭০)
নম্র স্বভাব : মহানবী সা: ছিলেন কোমল হৃদয় ও নম্র স্বভাবের। আর এ গুণটি স্বয়ং আল্লাহ তায়ালাই তাকে দান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, আপনি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত। যদি আপনি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতেন, তাহলে নিশ্চয়ই তারা আপনার সংসর্গ হতে অন্তর্হিত হতো। অতএব আপনি তাদের ক্ষমা করুন ও তাদের জন্য ইস্তেগফার করুন এবং কার্য সম্বন্ধে তাদের সাথে পরামর্শ করুন, অতএব আপনি যখন সঙ্কল্প করেন তখন আল্লাহর প্রতি নির্ভর করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)
জাতির আচরণে মর্মাহত : মহানবী সা:-এর জাতি কর্তৃক কুরআনকে ক্রমাগত অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করতে থাকায় এবং সুনিশ্চিত ধ্বংসের পথে ধাবিত হতে থাকায় তিনি এত বেশি মর্মাহত হয়েছিলেন যে, তিনি যেন আত্মঘাতী হতে চলেছেন। এই অবস্থার প্রতি বিরাগ প্রকাশ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন- তবে মনে হয় আপনি তাদের পেছনে ঘুরে ঘুরে আক্ষেপে নিজেকে ধ্বংস করে ছাড়বেন, যদি তারা এ বাণীকে গ্রহণ না করে। অর্থাৎ মর্মবেদনায় ও দুঃখে আপনি বুঝি মরেই যাবেন। যদি তারা কুরআন এর প্রতি ঈমান না আনে। অথচ তাদের নিয়ে দুঃখ করা ও মর্মাহত হওয়া আপনার পক্ষে বেমানান। আপনি তা বন্ধ করুন। কারণ আমি পৃথিবীর যাবতীয় সহায় সম্পদ ও সন্তান সন্ততিকে শোভনীয় করেছি মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য যে, কে তাদের মধ্যে কার্যে উত্তম। (সূরা আল কাহাফ : ৬)
বিচার দিবসের সাক্ষী : নবীগণ বিচার দিবসে নিজ নিজ উম্মতের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। আমাদের প্রিয়নবী সা: আমাদের পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। আল্লাহ তায়ালা এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন- সেদিন আমি প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী দাঁড় করাব। (সূরা আন নাহল : ৮৪) আরো ইরশাদ করেন- সেদিন প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে আমি তাদের মধ্য থেকেই একজন সাক্ষী তাদের বিপক্ষে দাঁড় করাব এবং তাদের বিষয়ে আপনাকে সাক্ষীস্বরূপ উপস্থাপন করব। (সূরা আন নাহল : ৮৯)
বাইয়াত গ্রহণ : মহানবী সা: নারী-পুরুষ উভয় থেকে দ্বীনি শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে আনুগত্যের বাইয়াত গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে নবী! যখন আপনার কাছে মু’মিনা নারীরা এসে এ মর্মে বাইয়াত গ্রহণ করতে চায় যে, তারা আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবে না, তারা সজ্ঞানে কোনো অপবাদ রচনা করে রটাবে না এবং সৎকাজে আপনাকে অমান্য করবে না তখন তাদের বাইয়াত গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল-মুমতাহিনা : ১২) আল্লাহ তায়ালা অন্যত্র বলেছেন- অবশ্যই আল্লাহ মু’মিনদের কাছ থেকে তাদের প্রাণ ও তাদের ধনসম্পদগুলোকে জান্নাতের বিনিময়ে ক্রয় করে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে যাতে তারা (কখনো) হত্যা করে আবার (কখনো) নিহত হয়। এ কারণে (জান্নাত প্রদানের) সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাতে, ইঞ্জিলে ও কুরআনে। নিজের অঙ্গীকার পালনকারী আল্লাহ অপেক্ষা অধিক আর কে আছে? অতএব তোমরা আনন্দ করতে থাকো, তোমাদের এ ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর, যা তোমরা সম্পাদন করেছ, আর এটা হচ্ছে বিরাট সফলতা। (সূরা তাওবা : ১১১) (চলবে)