(গত দিনের পর)
অনুকরণীয় আদর্শ : মহানবী সা: একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে নবী! আপনি বলে দিন যে, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমার অনুকরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। (সূরা আলে ইমরান : ৩১)
উন্নত চরিত্রবান : মহানবী সা: ছিলেন উন্নত চরিত্রের অধিকারী। তাঁর চারিত্রিক সনদ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা- নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত। (সূরা আল কলম : ৪) আরো ইরশাদ করেন- নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল সা:-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (সূরা আল আহজাব-২১)
তাওহিদের ঘোষক : মহানবী সা: আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষক। তিনি আজীবন তাওহিদ বা একত্ববাদের ঘোষণা দিয়েছেন এবং তাওহিদ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে রাসূল! আপনি বলে দিন, ভেবে দেখ তো, আল্লাহ যদি রাতকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করেন, তবে আল্লাহ ছাড়া এমন উপাস্য কে আছে, যে তোমাদের আলো দান করতে পারে? তোমরা কি তবুও কর্ণপাত করবে না? আর আল্লাহ যদি দিনকে কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করেন তবে আল্লাহ ছাড়া এমন উপাস্য আছে যে, তোমাদের রাত দান করতে পারে, যাতে তোমরা বিশ্রাম করবে, তোমরা কি তবুও ভেবে দেখবে না? তিনি স্বীয় অনুগ্রহে দিবা-রজনী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা প্রশান্তি ও অনুগ্রহ লাভ করতে পার। আর তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। (সূরা আল কাসাস : ৭১-৭৩)
সহানুভূতির হস্ত সম্প্রসারণকারী : মহানবী সা: ছিলেন উম্মতের কল্যাণকামী। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে নির্যাতিত মানবতার করুণাকামী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাই তো নির্যাতিত মানবতার সাহায্যে তিনি এগিয়ে এসেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা কেন আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করছ না? অথচ নির্যাতিত নারী পুরুষ, শিশু যারা এ বলে চিৎকার করছে, হে আমাদের রব! আপনি আমাদের এ জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন, আপনার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন অভিভাবক পাঠান এবং সাহায্যকারী মনোনীত করুন। (সূরা আন-নিসা : ৭৫)
সুবিচারক : মহানবী সা: কে একজন সুবিচারকরূপে প্রেরণ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী- নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়নীতি যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে। তাদের প্রতি দান করেছি লৌহদণ্ড, যাতে আছে প্রচণ্ড রণশক্তি এবং মানুষের জন্য অনেক কল্যাণ। (সূরা আল-হাদিদ :২৫)
পারলৌকিক জীবনকে প্রাধান্য দান : মহানবী পার্থিব জীবনের চেয়ে পারলৌকিক জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। যেমন আল্লাহর বাণী- আমি তাদের বিভিন্ন প্রকার লোককে পরীক্ষা করার জন্য পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ ভোগ-বিলাসের যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি সেসব বস্তুর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করবেন না। আপনার রবের প্রদত্ত রিজিক উৎকৃষ্ট ও অধিক স্থায়ী। (সূরা ত্ব-হা : ১৩১) আরো ইরশাদ করেন- তোমাদের যা কিছু দেয়া হয়েছে তা তো পার্থিব জীবনের ভোগ ও শোভা এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তা উত্তম ও স্থায়ী। তোমরা কি অনুধাবন করবে না। (সূরা আল কাসাস : ৬০)
উন্নতমানের সহচর : পরশপাথরের সংস্পশের্ লোহা যেমন সোনা হয়ে যায় তেমনি মহানবী সা:-এর সংস্পর্শে তাঁর সহচরগণও হয়ে গেছেন সেরা মানব। যাদের প্রশংসা করেছেন স্বয়ং রাব্বুল আলামিন- মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচররা কাফেরদের প্রতি বজ্রকঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদের রুকু ও সিজদারত দেখবেন। তাদের মুখমণ্ডলে রয়েছে সিজদার চিহ্ন। তাওরাতে তাদের অবস্থা এরূপ এবং ইঞ্জিলেও তাদের অবস্থা যেমন একটি চারা গাছ যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, এরপর তা শক্ত ও মজবুত হয় এবং কাণ্ডের উপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, যা চাষিকে আনন্দে অভিভূত করে-এভাবে আল্লাহ মু’মিনদের সমৃদ্ধির দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। তাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের ওয়াদা দিয়েছেন। (সূরা আল ফাতহ : ২৯)
মানব কর্তৃক শিক্ষিত নন : মহানবী সা: কোনো মানব কর্তৃক শিক্ষিত নন। স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আপনি কি জানতেন কিতাব এবং ঈমান কী? (সূরা আশ-শুরা : ৫২) আরো ইরশাদ করেন- আপনি এ কিতাবের আগে কোনো কিতাব পড়েননি। আর কোনো কিতাব নিজ হাতে লিখতেও পারতেন না। তবে এসব অসত্যবাদী লোকেরা সন্দেহ করতে পারত (যে আপনি পূর্ববতী কিতাবগুলো দেখে তা লিখতে বা মুখস্থ করে লোকদের শুনাচ্ছেন)। (সূরা আনকাবুত : ৪৮)
রাসূল সা: মানুষ ছিলেন : সব নবী-রাসূল মানুষ ছিলেন। সে হিসেবে আমাদের রাসূলও মানুষ ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- আমি আপনার পূর্বে অহিসহ পুরুষই (মানুষই) প্রেরণ করেছি। ( সূরা নাহল : ৪৩) আরো ইরশাদ করেন- তিনি তো তোমাদের মতো একজন মানুষ, তোমরা যা আহার করো তিনি তো তাই আহার করেন এবং তোমরা যা পান করো তিনি তাই পান করেন। (সূরা মুমিনুন-৩৩) আরো ইরশাদ করেন- আমি রাসূলদেরকে এমন কোনো দেহাবয়ব দেইনি যে তাদের খেতে হয় না। (সূরা আল-আম্বিয়া : ৮) আরো ইরশাদ করেন- (হে হাবিব!) আপনার আগে আমি যেসব নবী-রাসূল প্রেরণ করেছি তারা সবাই খাওয়া-দাওয়া করত এবং বাজারেও চলাফেরা করত। (সূরা আল-ফুরকান : ২০) নবী-রাসূলগণের স্ত্রী-পুত্র ছিল। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন- (হে মুহাম্মদ!) আপনার আগেও আমি বহুসংখ্যক নবী রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাদেরও আমি স্ত্রী-পুত্র পরিবার-পরিজনসম্পন্ন বানিয়েছি। (সূরা রাদ : ৩৮) এ লোকদের বলুন! আমি কোনো অভিনব রাসূল নই। (সূরা আল-আহকাফ : ৯) মুহাম্মদ একজন রাসূল ছাড়া কিছুই নন। তার আগেও অনেক রাসূল গত হয়েছেন। (সূরা আল ইমরান : ১৪৪) বলুন, আমি তো তোমাদের মতো একজন মানুষ। শুধু পার্থক্য এই যে, আমার কাছে অহি আসে। (সূরা কাহাফ-১১০) আমি একজন রাসূল, মানুষ ছাড়া আর কিছুই নই। (সূরা বনি ইসরাইল-৯৩)।
আল্লাহর ইচ্ছা বাস্তবায়নকারী : নবী রাসূলগণ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছারই প্রতিফলন ঘটান, নিজেদের কিছু করার ইখতিয়ার নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন- হে নবী! তাদের বলুন, আমার নিজের কোনো কল্যাণ বা ক্ষতি সাধনের ইখতিয়ারও আমার নেই। আল্লাহ যা চান তাই হয়। (সূরা আরাফ : ১৮৮) হে রাসূল বলুন! উপকার ও ক্ষতি কিছুই আমার এখতিয়ারভুক্ত নয়। সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছায় হয়। (সূরা ইউনুছ : ৪৯) বলুন! আমি তোমাদের জন্য না কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখি, না কোনো কল্যাণ করার। (সূরা জিন: ২১) (হে হাবিব) আপনি যাকে চাইবেন তাকে হেদায়েত করতে পারবেন না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত করেন এবং তিনি সে লোকদের অবস্থা খুব ভালো করেই জানেন যারা হেদায়েত কবুল করে থাকেন। (সূরা কাসাস : ৫৬)
বিশ্বনবী : মহানবী সা: ছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীর প্রতি প্রেরিত নবী। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সবার জন্য রাসূল। (সূরা আরাফ : ১৫৮) আরো ইরশাদ করেন- আর আমি তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না। (সূরা সাবা : ২৮)
নবীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা : স্বীয় নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আবশ্যক। তিনি কষ্ট পান তাঁর প্রসঙ্গে এমন কথা বলা এবং এমন কাজ ও আচার-ব্যবহার করা হারাম। আল্লাহ ইরশাদ করেন- হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর কণ্ঠস্বরের উপর নিজেদের কণ্ঠস্বর উঁচু করো না এবং নিজেদের মধ্যে যেভাবে উচ্চস্বরে কথা বল তার সাথে সেরূপ উচ্চস্বরে কথা বলো না, কেননা তাতে তোমাদের আমল তোমাদের অজ্ঞাতসারে নষ্ট হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর রাসূলের সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নিচু করে আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাকওয়ার জন্য পরিশোধিত করেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরস্কার। যারা ঘরের পিছনে থেকে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে তাদের অধিকাংশ নির্বোধ। আপনি বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত যদি তারা ধৈর্য্য ধারণ করত, তবে তা তাদের জন্য উত্তম হতো, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (সূরা আল-হুজরাত : ২-৫) মু’মিন স্বীয় নবীকে নিজের জীবনের চেয়ে অধিক ভালোবাসে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের জীবন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর। (সূরা আল-আহযাব : ৬) নবীর ভালোবাসায় সাহাবায়ে কিরাম নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
নবীর প্রতি দরুদ পাঠ : আল্লাহ তায়ালা তাঁর মু’মিন বান্দাদেরকে মহানবী সা:-এর প্রতি দরুদ শরিফ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- অবশ্যই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন, তার ফিরিশতাগণও অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে বিশ্ববাসীগণ তোমরা তার প্রতি দরুদ ও সালাম পেশ করো। (সূরা আল-আহজাব : ৫৬)
রাসূলের আনুগত্যের ফল : রাসূলের আনুগত্যের মধ্যে রয়েছে জীবনের সফলতা। উভয় জাহানে কামিয়াবি হাসিলের জন্য রাসূলের আনুগত্য করা ফরজ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করবে তারা নবী, সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কতই না উত্তম সঙ্গী। তা আল্লাহর অনুগ্রহ। জ্ঞানে আল্লাহই যথেষ্ট। (সূরা আন-নিসা : ৬৯-৭০) আরো ইরশাদ করেন- সুতারং যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং যে আলো তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে তার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম। (সূরা আল-আরাফ : ১৫৭)
(সমাপ্ত)
লেখক : প্রধান ফকিহ্, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী





