আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঐতিহ্যবাহী ঈদ উদযাপনের ধারা পুনরুজ্জীবিত হতে যাচ্ছে। ইতিহাস বলছে, ঢাকার নবাবরা একসময় কামান দেগে চাঁদের সংবাদ দিতেন এবং বড় পরিসরে ঈদ মিছিলের আয়োজন করতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এক ফেসবুক পোস্টে জানান, সময় স্বল্পতা সত্ত্বেও স্থানীয় সরকার বিভাগ, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পুরোদমে এই ঈদ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঈদ উদযাপনের পুরনো ধারাকে নতুন করে চালু করার বিষয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (মাভাবিপ্রবি) থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মতামত তুলে ধরছেন মো: মেহেদী হাসান খান সিয়াম।

ঈদ শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রতিটি উৎসবই যেহেতু মানুষের সংস্কৃতির অংশ, তাই ঈদ পুরো বিশ্বের মুসলমানদের সম্মিলিত ইসলামিক সংস্কৃতির অংশ। অতীতের সকল সময়েই মুসলিম বিশ্বে ঈদকে আলাদাভাবে উদযাপন করা হতো। তোপ দাগিয়ে রমজানকে শুভেচ্ছা জানানো সেই ফিলিস্তিন থেকে ঢাকার নবাব বাড়ি পর্যন্ত আমরা দেখতে পাই। ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের গ্রামীণ উৎসব তো নিয়মিত ব্যাপার ছিল। যদিও বিগত সময়ে বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে বড় উৎসব, ঈদ কেন্দ্রিক আয়োজনগুলো স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। তবে আবার সেই ধারা ফিরিয়ে আনার সুযোগ আমাদের এসেছে। আমাদের আঞ্চলিক বিভিন্ন অনুষঙ্গের সাথে ঈদের এই শান্তিময় ইসলামী আবহকে মিলিয়ে বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন যদি আমরা তুলে ধরতে পারি, এটা যেমন বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে বিকশিত করবে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করবে তেমনই বহির্বিশ্বে আমাদের নিজস্ব একটি উন্নত পরিচয় তুলে ধরতে সাহায্য করবে। ঈদ র‍্যালির মতো আয়োজনগুলো সিলসিলায় আমাদের নতুন ধাপ হিসেবে উঠে আসতে পারে।

- এস এম নাসিমুল হাসান (জিসান), শিক্ষার্থী, ইনফরমেশন এন্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগ, মাভাবিপ্রবি।

ব্রিটিশরা উপমহাদেশে এসে হাজার হাজার মক্তব-মাদরাসা ধ্বংস করে এবং বহু আলেমকে হত্যা করে। এর ফলে মুসলমানদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রভাবে আমাদের মধ্যে ঈদ উদযাপনে অনীহা সৃষ্টি হয় এবং তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি অপরিচিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এবারের ঈদ উদযাপন আমাদেরকে পুনরায় নিজস্ব সংস্কৃতির দিকে ফিরিয়ে আনবে, ইনশাআল্লাহ। ঢাকার নবাবী ধারার সেই ঈদ উদযাপন পুনরুজ্জীবিত হলে নতুন প্রজন্ম নতুন করে পুরনো সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবে। সংস্কৃতি একটি পরিবর্তনশীল জিনিস। কিন্তু এটি পরিবর্তিত হয়ে যখন স্মৃতি থেকে সরে যায় তখন অপসংস্কৃতি চর্চা শুরু হয় এবং আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলতে শুরু করি। তাই এই ঈদ উদযাপন পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে আমরা শুধু আমাদের শেকড়কেই পরিচিত করাচ্ছি না, একইসাথে সুস্থ সংস্কৃতির সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করতে যাচ্ছি। তবে ঈদ উৎসবে অবশ্যই আমাদেরকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন সাংস্কৃতিক চর্চাগুলো বর্জন করতে হবে। আমাদের মনে রাখা উচিত ঈদ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। তাই এই উৎসব উদযাপনে আধুনিকতার নামে অপসংস্কৃতি চর্চা থেকে বিরত থাকতে হবে। ইসলামের গাইডলাইন অনুযায়ী ঈদ উৎসব সর্বোচ্চ আমেজে জমে উঠুক।

- নাজমুল হাসান, শিক্ষার্থী, বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বিজিই) বিভাগ, মাভাবিপ্রবি।

ঈদ ইসলাম ধর্মের উৎসব হলেও এটি শত শত বছর ধরে দেশে দেশে নিজস্ব রেওয়াজে পালিত হয়। মুসলমানের এই সামাজিক ঐতিহ্য পালনকে আমি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করি। আমি মনে করি, এমন উদ্যোগ বর্তমান প্রজন্মকে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সাথে পরিচিত করাবে। এক দুর্দমনীয় ফ্যাসিবাদকে উপড়ে ফেলেছি, তাই এখনই সুযোগ শিকড়ের সন্ধানে নিয়োজিত হওয়ার। আমাদের নতুন প্রজন্ম এসব কর্মসূচির মাধ্যমে অতীতের সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে পারবে। হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়টা আমার কাছে ইতিবাচক। ফ্যাসিবাদ আমাদের ঈদের সংস্কৃতিকে দারুণভাবে নষ্ট করে দিয়ে গেছে। আজকের প্রেক্ষাপটে তাই এমন পদক্ষেপ অতীব জরুরি।

- আব্দুল্লাহ, শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ, মাভাবিপ্রবি।

ঈদ উৎসবের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ একটি প্রশংসনীয় প্রয়াস, যা ঐতিহ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করবে। নবাবী আমলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে এই আয়োজনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল রাখা জরুরি।

মিছিলের আয়োজন শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া উচিত, যাতে মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে। মিছিলে ঐতিহ্যবাহী পোশাক, বাদ্যযন্ত্র ও সজ্জার মাধ্যমে বাংলার ইসলামী সংস্কৃতির প্রতিফলন থাকতে হবে। নবাবী আমলের ঐতিহাসিক রীতির প্রতীকী উপস্থাপনা, যেমন শাহী খিলাফত, তুলে ধরা যেতে পারে। শিশুদের জন্য বিশেষ অংশ রাখা যেতে পারে, যাতে তারা আনন্দের সঙ্গে মিছিলে অংশ নিতে পারে।

অতি আড়ম্বর ও অপচয় এড়িয়ে চলা উচিত, যেন মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুতি না ঘটে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমন কিছু এড়ানো জরুরি। সর্বোপরি, এই আয়োজন একতা, সম্প্রীতি ও খুশির বার্তা বহন করতে হবে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা ও সুবিধাবঞ্চিতদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে উৎসবের মূল চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে পারেন। এটি ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করবে, যা নতুন প্রজন্মকে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল করবে এবং তাদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মূল্যবোধ জাগ্রত করবে।

- ড. মো. ফজলুল করিম, অধ্যাপক, বিজিই বিভাগ এবং পরিচালক, শিক্ষার্থী কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্র, মাভাবিপ্রবি।