ইবরাহীম খাঁ ১৯২৫ সালের কোনো একসময়ে ময়মনসিংহ থেকে ‘সাহিত্য সংস্কৃতি তথা জীবনের সর্বস্তরে বাংলার মুসলমানের দৈন্য বিশ্লেষণ করে এবং তাদের জাগিয়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য’ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে এক পত্রে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। নজরুল যথাসময়ে পত্রটির জবাব দেননি। ১৩৩৪ সালে আফজাল-উল-হকের সম্পাদিত নওরোজ পত্রিকায় ইবরাহীম খাঁর এই পত্রটি ‘একখানি পত্র’ নামে প্রকাশিত হয়। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন এ প্রসঙ্গে বলেনÑ
১৩৩৪ সালে অগ্রহায়ণ মাসে নজরুল ওই পত্রখানা সওগাতের সাহিত্য মজলিসে সবাইকে পড়ে শোনান। সমবেত সাহিত্যিক বন্ধুরা প্রিন্সিপাল সাহেবের এই পত্রকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন। তাঁরা নজরুলকে অনুরোধ করলেন এর একটা উত্তর দেয়ার জন্য। সবারই ইচ্ছা প্রিন্সিপাল সাহেবের পত্র এবং নজরুলের উত্তর দুটোই এক সাথে সওগাতে প্রকাশ করা হোক। এর সপ্তাহখানেক পরেই নজরুল ওই চিঠির সুদীর্ঘ জবাব দেন। ১৩৩৪ সালের পৌষ সংখ্যা সওগাতে উভয় পত্র প্রকাশিত হয়।
ইবরাহীম খাঁ (১৮৯৪-১৯৭৮) এবং কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাঙালি মুসলমান সমাজের দুই সংস্কারবাদী নবজাগরণকামী প্রাণপুরুষ। তাঁরা আবির্ভূত হয়েছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তরকালে ভারতীয়দের সংগঠনের সময়ে-বাঙালি মুসলমানের অগ্রবর্তী নেতা হিসেবে। শিক্ষাবিদ, সৃজনশীল ও বক্তব্যপ্রধান রচয়িতা এবং সমাজ সংস্কারক ইবরাহীম খাঁ সমকালীন সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার প্রেক্ষাপটে নজরুলের অবিসংবাদিত ভূমিকার ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলেন। মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রতিভার বিকাশে প্রযতœদানের ক্ষেত্রে নিবেদিত প্রাণপুরুষ ইবরাহীম খাঁ তাই সেদিন অপরিচিত নজরুলকে পত্রযোগে জাতির ক্রান্তিকালে সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে জাতিকে জাগিয়ে তোলার মহান কাজে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সমালোচক ইবরাহীম খাঁর এই পত্র প্রসঙ্গে বলেনÑ তাঁর এই পত্রখানা ছিল একাধারে বাঙালি মুসলমান সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ কামনার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক স্মারকলিপি। এই পত্র প্রাপ্তিতে নজরুল মানসে যে এক বিরাট পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল নজরুলের পরবর্তীকালের সৃষ্টিধর্মী কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে সহজেই তা সবার কাছে ধরা পড়ে। নজরুল খাঁ সাহেবের পত্রখানা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করেছিলেন এবং সুদীর্ঘ তিন বছর পরে হলেও তার উত্তর দিয়েছিলেন। নজরুলের উত্তরের প্রতিটি ছত্রে পাওয়া যায় নজরুল মানসের বিস্তৃত পরিচয়।
ইবরাহীম খাঁর পত্র এবং নজরুলের উত্তর বাংলা পত্রসাহিত্যে এক অভিনব সংযোজন। সেই পত্রালাপের মাধ্যমে সাহিত্য, সংস্কৃতি তথা সমকালীন সমাজ-রাজনীতি সম্পর্কে এই দুই সাহিত্যস্রষ্টার একান্ত অনুভবের যে প্রকাশ ঘটেছে তা নানাবিধ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। পত্র দুটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিম্নরূপÑ
ইবরাহীম খাঁর পত্র থেকে :
ইবরাহীম খাঁ নজরুলকে কিছু কথা বলেছেন গুরু রূপে নয়, ভাই রূপে ও ভক্ত রূপে।
বাংলার মুসলিম সমাজ ধনে ও মনে কাঙাল। সমাজ পতিত, দয়ার পাত্র ; তাকে জাগাতে হবে। তিনি নজরুলকে এই জাগানোর কাজে অগ্রসর হতে আহ্বান জানিয়েছেন।
সমাজ মৃতপ্রায়, তাঁকে বাঁচানোর জন্য প্রয়োজন সঞ্জীবনী সুধা। সেই সুধার পাত্র হাতে নিয়ে নজরুলকে এগিয়ে আসতে হবে।
সুদূর অতীত ইতিহাসের প্রান্তসীমা থেকে কবির কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে সত্য, সুন্দর ও সাধনার গীতি ; নজরুলের কণ্ঠেও সেই গীতি উচ্চারিত হবেÑ ইবরাহীম খাঁ সে কামনাই করেছেন।
নজরুলের প্রতিভা অসামান্য, অদ্ভুত ; কিন্তু দায়িত্ব তার চেয়েও গুরুতর। সে দায়িত্ব পালনেই তার মেধার বিকাশ ঘটবে।
তাঁর মেধাকে নব নব সৃষ্টির সৌধ নির্মাণে উন্নত করতে হবে।
বাংলার মুসলিম সমাজ নজরুলকে সম্মান করেনি সত্য, তাই বলে এ সমাজ ত্যাগ করা তাঁর অনুচিত। বরং বাঙালি মুসলিম সমাজ তাঁর কণ্ঠে ইসলামের অমীয় বাণী শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ।
বাঙালিদের মধ্যে মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি দরিদ্র, অজ্ঞ ও আত্মভোলা। আর বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে অবহেলিত, কলঙ্কিত, নিন্দিত ও কুলিখিত বিষয় ইসলাম।
ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কিছু নেই, ইসলাম সর্বাধুনিক উন্নততম ধর্ম, তবে বাংলার মুসলমানরা অনেক কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ; এ কুসংস্কার দূর করতে হবে।
ইবরাহীম খাঁ বড় আশা, ভরসা, সাহস ও মিনতি নিয়ে নজরুলকে আহ্বান করেছেন পতিত মুসলিম সমাজের দিকে অগ্রসর হতে। তাঁর কবিতায় ইসলামের উদার উচ্চ আদর্শ প্রস্ফুটিত হোক এটাই পত্র লেখকের একান্ত কামনা।
কাজী নজরুল ইসলাম ইবরাহীম খাঁকে যে প্রত্যুত্তর পত্র দিয়েছেন, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলোÑ
কাজী নজরুল ইসলাম পত্রের প্রারম্ভে দীর্ঘ তিন বছর পর ইবরাহীম খাঁর চিঠির উত্তর দেয়ার কৈফিয়ৎ প্রসঙ্গে স্বীয় ব্যস্ততার কথা উল্লেখ করেছেন।
পায়া ভারী লোকের সুবিধা বেশি।
বাংলার মুসলিম সমাজ ধনে কাঙাল না হলেও মনে কাঙাল ; এ কারণেই তারা নজরুলকে ‘কাফের’ ফতোয়া দিয়েছে। প্রখ্যাত কবি হাফিজ, খৈয়াম ও মনসুরও ওই উপাধি পেয়েছিলেন। এ জন্য বাঙালি মুসলমানদের কাছ ওই উপাধি পাওয়ায় তাঁর কোনো দুঃখ নেই।
ইবরাহীম খাঁ সমাজকে বলেছেন ‘পতিত’ ও ‘দয়ার পাত্র’। নজরুল বলেছেন-সমাজ ফবসড়ৎধষরুবফ ‘ভয়ের পাত্র’।
নজরুল বেদনাতুর হতভাগাদের গান গেয়েছেন ; কিন্তু অনেক মানুষই সেই গানকে অসম্মান করেছে। ফলে, কবি ব্যথা পেয়েছেন।
কবি বিদ্রোহ করেছেন অন্যায়, অসত্য, অত্যাচার, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।
হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরের অশ্রদ্ধা দূর করতে না পারলে এ পোড়া দেশের কিছু হবে না। নজরুল মনে করেন, একমাত্র সাহিত্যের মাধ্যমে এ অশ্রদ্ধা দূর করা সম্ভব। কিন্তু ইসলামের ‘সভ্যতা-শাস্ত্র-ইতিহাস’কে কাব্যের মাধ্যমে প্রকাশ করা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার।
নতুন সাহিত্যব্রতী দলকে এক একটা দিক নিয়ে গবেষণার দায়িত্ব নিলে ভালো হয়। নিশ্চিন্ত জীবনযাত্রার প্রশান্তি কবি কোনোদিন পাননি, যদি পান তাহলে ইবরাহীম খাঁর উপদেশ বা অনুরোধের মর্যাদা রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। তিনি আনন্দ-বেদনার গান গেয়ে সবার মাঝে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছেন।
পত্রলেখা ইবরাহীম খাঁর বিশেষ মানসিক প্রেরণাসম্ভূত, তাঁর স্বপক্ষে অনেক তথ্য জোগাড় করা সম্ভব। কবি নজরুলের ঢাকা আগমনের প্রাক্কালে হাসপাতালের রোগশয্যা থেকে ইবরাহীম খাঁ তাঁকে পত্র লিখেছেন। তাঁর সম্ভাষিত কবিবন্ধু নজরুল, মানবীয় সম্পর্কহীন বিচ্ছিন্ন জীবনে অন্যলোকে অবস্থান করছিলেন। কবি নজরুলের হাতে তাঁর পত্র পৌঁছালে সাড়া জাগানোর কোনো সম্ভাবনা ছিল না ; এ তথ্য জানা সত্ত্বেও ইবরাহীম খাঁ তাঁকে পত্র লিখেছেন স্বীয় মানসিক ভার লাঘবের উদ্দেশ্যে। ২৫/০৭/১৯৭২ তারিখে লেখা সেই পত্রের কিছু অংশ নিম্নরূপ-
ভাই কাজী সাহেব, আমি রোগশয্যার কারাগারে ; বিমানবন্দরে হাজির হতে পারলাম না। দূর হতেই স্বাগতম, হে মহিমাময় বন্ধু স্বাগতম। আজ থেকে ৩০ বছর আগে যখন তুমি ঢাকার সাহিত্য সমাজে আবির্ভূত হও, তখন তোমার মাথায় ঘনকৃষ্ণ মেঘের দোলায়মান চমক, তোমার আঁখির উদার সায়রে অপরূপ স্বপনের ঝিলিমিলি, তোমার মুখচ্ছবিতে অজেয় যৌবন স্ফুরিত প্রতিভার প্রদীপ্ত বিভাস, তোমার বাঁশিতে অরফিউসের বাঁশরির মায়া। তোমার অট্টহাসির নির্ঘোষে নভস্থলের বজ্রবুকে বিস্ময়ের শিহরণ। ক্রমে এলে তুমি তোমার প্রচণ্ড শক্তির মধ্যাহ্ন আকাশে। তোমার বিশ্বভুবনময় বিদ্রোহ ঘোষণায় দিক-দিগন্তের সব জালিমের কলিজা থরথর করে কেঁপে উঠল ; সব মজলুমের চিত্তের দিগন্তে জেগে উঠল বহুকালের প্রতীক্ষিত মুক্তি-উষার ধূসর রেখা। হ





