আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল ব্যুরো
কীর্তনখোলা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী বরিশাল স্টেডিয়াম এবার নতুন ইতিহাসের অপেক্ষায়। ১৯৬৬ সালে নির্মাণের পর কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক। এ দীর্ঘ সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, ফ্লাডলাইট হয়েছে, প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া সেন্টার হয়েছে; কিন্তু বড় কোনো জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আসরের নিয়মিত ভেন্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়নি স্টেডিয়ামটি।
একবার অবশ্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের স্বাদ পেয়েছিল বরিশাল। ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর এ মাঠে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ও শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের চারদিনের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ওই ম্যাচের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে পা রাখে বরিশাল স্টেডিয়াম। কিন্তু সে সম্ভাবনার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে অব্যাহত ছিল না। 
দীর্ঘ অপেক্ষার পর এবার সে আক্ষেপ কাটানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আগামী ১৫ ডিসেম্বর বরিশালের নবনির্মিত বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো ‘ডমেস্টিক থ্রি ট্রফি’ বা ‘ডি থ্রি’-এর টি-টোয়েন্টি সংস্করণ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন পর বরিশালে ফিরতে যাচ্ছে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট।
অবহেলায় কেটেছে বছরের পর বছর
দক্ষিণাঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বরিশাল স্টেডিয়ামটি ১৯৬৬ সালে নির্মিত হলেও আন্তর্জাতিক মানের পূর্ণাঙ্গ ভেন্যু হিসেবে কখনোই কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।
২০০৬ সালে প্রথম দফায় স্টেডিয়ামে ফ্লাডলাইট, পাঁচতলা প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া সেন্টার নির্মাণ করা হয়। এতে বড় ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও নিয়মিত জাতীয় বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সেখানে চালু করা সম্ভব হয়নি।
পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাঠের অবস্থা খারাপ হতে থাকে। নিয়মিত প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট, প্রিমিয়ার লিগ কিংবা জাতীয় পর্যায়ের বড় ম্যাচ আয়োজনও ব্যাহত হয়। ফলে স্টেডিয়ামটি থাকলেও বড় ক্রিকেটের উত্তাপ থেকে দূরে ছিল বরিশাল।
২০১৯-এ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজা খোলে
দীর্ঘ নীরবতার মধ্যে ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর আসে সে কাক্সিক্ষত দিন। প্রথমবারের মতো বরিশাল স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ও শ্রীলঙ্কা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের চারদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
এ ম্যাচের মধ্য দিয়ে বরিশাল স্টেডিয়াম আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ক্রিকেটে প্রবেশ করে। ক্রীড়াঙ্গনের মানুষ আশা করেছিলেন, এরপর হয়তো নিয়মিত আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ হবে এই মাঠে। কিন্তু সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। একটি আন্তর্জাতিক বয়সভিত্তিক ম্যাচ আয়োজনের পরও দীর্ঘ সময় বড় ক্রিকেট থেকে দূরে থাকে স্টেডিয়ামটি। এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে- যে মাঠে আন্তর্জাতিক বয়সভিত্তিক ম্যাচ আয়োজন সম্ভব হয়েছে, আধুনিকায়নের পর সে মাঠ কেন নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভেন্যু হবে না?
প্রায় ৬৫ কোটি টাকার আধুনিকায়ন
এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে স্টেডিয়াম আধুনিকায়নে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রায় ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় স্টেডিয়ামের বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক পাঁচতলা প্যাভিলিয়ন, আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া সেন্টার, প্যাসেঞ্জার লিফট ও নতুন ড্রেসিংরুম। পাশাপাশি তৈরি করা হয়েছে ইনডোর প্র্যাকটিস নেট।
উন্নত করা হয়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও ফ্লাডলাইট। সংস্কার করা হয়েছে মূল ক্রিকেট পিচ ও আউটফিল্ড। দীর্ঘদিন ধরে মাঠের পানি নিষ্কাশন ও খেলার উপযোগিতা নিয়ে যে সমস্যা ছিল, আধুনিকায়নের মাধ্যমে সেটিও অনেকটা কাটিয়ে ওঠা হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর নতুন রূপ পেয়েছে বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়াম। 
‘ডি থ্রি’ দিয়ে জাতীয় ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন
দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন প্রাণ ফেরাতে বিসিবি ‘ডমেস্টিক থ্রি ট্রফি’ বা ‘ডি থ্রি’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে। টি-২০, ৫০ ওভার ও চার দিনের ক্রিকেটকে একটি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে এ প্রতিযোগিতায়।
চার দিনের জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) আলাদা রেখে ‘ডি থ্রি’-এর কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে এনসিএল টি-টোয়েন্টি, বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের (বিসিএল) চার দিনের ম্যাচ এবং বিসিএল ওয়ানডে। এ প্রতিযোগিতার টি-টোয়েন্টি সংস্করণ দিয়েই আগামী ১৫ ডিসেম্বর বরিশালে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট ফিরবে। চার দিনের প্রতিযোগিতা আগামী বছরের জানুয়ারিতে এবং ৫০ ওভারের টুর্নামেন্ট মে মাসে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয় ক্রিকেটারদের জন্য বড় সুযোগ
বরিশালে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট ফিরলে সবচেয়ে বড় সুফল পাবেন স্থানীয় ক্রিকেটাররা। দীর্ঘদিন বড় ম্যাচের বাইরে থাকা এ অঞ্চলের খেলোয়াড়রা জাতীয় দলের পরিচিত ক্রিকেটারদের সাথে একই মাঠে খেলার সুযোগ পাবেন। ক্রীড়াঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু একটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই হবে না। বরিশালে নিয়মিত প্রথম ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট, বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, জাতীয় পর্যায়ের ম্যাচ এবং আন্তর্জাতিক মানের টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে হবে।
বরিশালের ক্রিকেটাঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার
বরিশাল জেলা ক্রীড়া অফিসার মো: সাইদুল ইসলাম শুভ বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর বরিশালে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট ফিরছে- এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। বরিশাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আধুনিকায়নের ফলে এখন এখানে বড় পরিসরে ক্রিকেট আয়োজনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ১৫ ডিসেম্বর ‘ডি থ্রি’ টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে বরিশালের ক্রিকেটাঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে।’
এর ফলে স্থানীয় ক্রিকেটাররা জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের সাথে খেলার সুযোগ পাবেন এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে আরো প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসবেন।’ সাইদুল ইসলাম শুভ আরো বলেন, ‘বরিশালকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’