জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পদত্যাগ। এর জেরে দেশের ক্রীড়াঙ্গন স্থবির হয়ে পড়ে। বিভিন্ন ফেডারেশনের আওয়ামী পন্থী শীর্ষ কর্মকর্তাদের গা ঢাকা বা দেশ ত্যাগ এই পরিস্থিতির জন্ম দেয়। যদিও পরে স্বাভাবিক হয়ে এখন আবার চাঙ্গা হতে শুরু করেছে ক্রীড়াঙ্গন। বিভিন্ন ফেডারেশনের ঘরোয়া খেলা মাঠে গড়িয়েছে। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে দেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসর করা সম্ভব হয়নি। যা এখন ফের হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও একের পর এক সাফল্য বয়ে আনছেন দেশের ক্রীড়াবিদরা। যদিও একই সাথে রয়েছে ব্যর্থতাও। সাফল্যের সর্বশেষ সংযোজন গত পরশু অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপ ক্রিকেটে ভারতকে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখা।
পট পরিবর্তনের পরপরই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল পাকিস্তান সফরে যায়। ওই সফরে প্রথমবারের মতো তাদের মাঠে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট ম্যাচ জয় ও ২-০তে সিরিজ জয় কৃতিত্ব। দুই টেস্টই হয়েছিল রাওয়ালপিন্ডিতে। ২১-২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত টেস্টে টাইগারদের ১০ উইকেটে জয়। ৩০ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় টেস্টে নাজমুল হোসেন শান্তদের ছয় উইকেটে সিরিজ জয়ের হাসি। আগস্টেই অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ সাফ ফুটবলে বাংলাদেশের প্রথম চ্যাম্পিয়নশিপের স্বাদ নেয়া। ১৮-২৮ আগস্ট নেপালে অনুষ্ঠিত আসরে বাংলাদেশ ২৮ আগস্ট ফাইনালে নেপালকে ৪-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয় করে।

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ দাবা দল বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে অংশ নিতে হাঙ্গেরি যায়। সেখানে বড় কোনো সাফল্য না এলেও এরপর হাঙ্গেরিতে অনুষ্ঠিত দুই দাবা টুর্নামেন্টে অংশ নেন মনন রেজা নীড় ও ওয়াদিফা আহমেদসহ আরো কয়েক দাবাড়–।। নীড় সেখানে আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়ার নর্ম পূর্ণ করে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক মাস্টার হওয়ার খেতাব অর্জন করেন। এরপর ওয়াদিয়া আহমেদ প্রথম মহিলা আন্তর্জাতিক মাস্টারের নর্ম পান।
১৭ থেকে ৩০ অক্টোবর নেপালে অনুষ্ঠিত মহিলা সাফে বাংলাদেশের শিরোপা ধরে রাখা। ৩০ অক্টোবর ফাইনালে বাংলাদেশ নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে ট্রফিটা নিজেদের করে রাখে।
২৭ নভেম্বের থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় ছিল বাংলাদেশ ও আয়ারল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলেও ওয়ানডে সিরিজ। এতে আইরিশদের ৩-০তে হোয়াইট ওয়াশ করেন নিগার সুলতানা জ্যোতিরা। বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেট ইতিহাসে এটি দ্বিতীয়বার কোনো ওয়ানডে সিরিজ জয়। এই সাফল্য তাদের বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব এড়িয়ে যাওয়ার একটা বড় রাস্তা তৈরি করেছে। যদিও এরপর টি-২০ সিরিজে তাদের কাছে ০-৩ এ হোয়াইট ওয়াশ হয়েছে টাইগ্রেসরা। নারী ক্রিকেট দলের এই ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তাদের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে জয় পায়। জ্যামাইকায় ৩০ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর হওয়া এই টেস্ট জিতে সিরিজ ১-১ করেছেন মেহেদী হাসান মিরাজরা। ক্যারিবিয়ানদের মাটিতে এটি ১৫ বছর পর টেস্ট জয় টাইগারদের।
সিনিয়রদের এই সাফল্যের রেশই ধরে রেখেছেন যুব টাইগাররা। তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের ফাইনালে পরশু ভারতকে ৫৯ রানে হারিয়ে ধরে রাখে শ্রেষ্ঠত্ব।
সিনিয়র ও জুনিয়র ক্রিকেটারদের সাফল্যের মধ্যেই বাংলাদেশের হকিতে এল দারুণ সুসংবাদ। ৩ ডিসেম্বর ওমানে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২১ এশিয়া কাপে স্থান নির্ধারণী ম্যাচে থাইল্যান্ডকে ৭-২ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ। এরপর চীনকে হারিয়ে আসরে পঞ্চম হন রকিরা।

ফুটবল হকি, ক্রিকেট, দাবার পর কারাতেতেও বাংলাদেশের সাফল্য। ৩০ নভেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে ৫২ কেজি ক্যাডেট কুমিতে আদাম চৌধুরী স্বর্ণ জয়ে করেন। এরপর ব্যক্তিগত কাতাতে ব্রোঞ্জ। সাথে ভ্যাটারার্ন ইভেন্টে সৈয়দ নুরুজ্জামান স্বর্ণ পান।
এ ছাড়া ২২ অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর গ্রিসের হেরাক্লিনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জুজুৎসুতে ঊর্ধ্ব-৭০ কেজিতে বাংলাদেশের জামিলা খাতুন ঝিনুক স্বর্ণ পান। এ ছাড়া নাহিদা আহমেদ ইতু ও মুক্তা আহমেদ একটি করে রৌপ্য এবং মুক্তা ও আরিফর রহমান সুমন একটি করে ব্রোঞ্জ পদক গলায় তোলেন।
যদিও ক্রিকেটে ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টেস্টে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার লজ্জা আছে। অনূর্ধ্ব-১৭ পুরুষ সাফের ফাইনালে হার এবং এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ ও অনূর্ধ্ব-১৭ ফুটবলে কোয়ালিফাই করতে না পারাও কষ্টও আছে এই সময়ে। আর এএফসি চ্যালেঞ্জ কাপে বসুন্ধরা কিংস গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই হেরেছিল।