গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আর আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ আইসল্যান্ড। ইউরোপ মহাদেশের ছোট্ট দেশটি এবারই প্রথম অংশ নিচ্ছে বিশ্বকাপে। নতুন বলে দুর্বল ভাবার কোন কারণ নেই, কারণ ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে অনেকগুলো দেশকে পিছনে ফেলে তারা বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে।
২০১৬ ইউরোতেও প্রথম অংশ নিয়েছিলো তিন লাখেরও কম জনসংখ্যার দেশটি। তবে প্রথম আসরের চমক দেখিয়েছে তারা। ইংল্যান্ডকে কাঁদিয়ে উঠে গিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে। কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হার মানলেও জানান দিয়েছে নিজেদের শক্তির।

এবারের বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে আইসল্যান্ডের গ্রুপে ছিলো ক্রোয়েশিয়া, ইউক্রেন ও তুরস্ক। সবাইকে টপকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপের টিকিট জোগার করেছে দেশটি। ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা যে কোন অস্বাভাবিক ঘটনা ছিলো না সেটি তারা প্রমাণ করেছে নিজেদের খেলা দিয়েই।
তাই দলটিকে ছোট করে দেখলে বিপদে পড়তে পারে আর্জেন্টিনা। এমনিতেই ইউরোপ মহাদেশ বিশ্বের যে কোন অঞ্চলের চেয়ে ফুটবলে অগ্রসর। এখানার প্রতিটি দল দারুণ গতি ও আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। তাই যে কোন কিছু ঘটিয়ে ফেরার সামর্থ রয়েছে তাদের।

বাছাই পর্বে আইসল্যান্ডকে বেশ কিছু অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল ইনজুরির কারণে তাদের মূল স্ট্রাইকার কোলবেনন সাইটরসনকে না পাওয়ার ফলে। তারপর ইউরো ২০১৬-তে খেলা দেশটি আরো অসুবিধার সম্মুখীন হয় যখন তাদের কোচ লার্স ল্যাগারব্যাক চলে যায়। যার অধীনে তারা ইউরো খেলেছিল। বাছাই পর্বে তিনটি ড্র তাদেরকে বিপদের মুখোমুখি করেছিল। সব শঙ্কা দূর করে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থানে থেকেই রাশিয়া বিশ^কাপে এসেছে আইসল্যান্ড। বিশ^কাপের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ হিসেবে অভিষেকের অপেক্ষায় আইসল্যান্ড।

কোচিং স্টাফদের মধ্যে হেমির হেলগ্রিমসন, যিনি সহকারী কোচ ছিলেন, এখন তাদের প্রধান কোচ হিসেবে কাজ করছেন। তিনি ল্যাগারব্যাক থেকে আরো কৌশলগতভাবে নমনীয়। আইসল্যান্ড এখনো ৪-৪-২ পদ্ধতিতে খেলে, কিন্তু হেলগ্রিমসন মাঝে মাঝে তাদেরকে ৪-৫-১ পদ্ধতিতেও ভালোভাবেই খেলিয়েছেন কিছু ম্যাচে। সাইটরসন ছাড়া ইউরোতে যারা দলে ছিলেন, তাদের সবাইকে এবারো দেখা যাবে রাশিয়ায়। ইউরোর সেই সাফল্যকে তারা ছাড়িয়ে যাবেন, এটি বললে মনে হয় একটু বেশিই আশাবাদী হওয়া হবে। তবে তাদের ভক্ত-সমর্থকদের ভালোবাসা এবং চিৎকার ও ‘থান্ডারক্লেপ’ থাকায় কোনো কিছুকেই বাদ দেয়া যায় না।

গোলরক্ষক : হ্যানস পর হেলডরসন, ওগমান্ডর ক্রিস্টিয়ানসন, ইনগবার জনসন, রুনার এলেক্স রানারসন, ফ্রেডরিক স্ক্রাম;
রক্ষণভাগ: বিকির মার সেভারসন, রেগনার সিগারসন, কারি আরনাসন, এরি ফেয়র স্কুলাসন, সেবেরির ইনগি ইনগাসন, হুরুর জর্গবিন ম্যাগনাসন, জন গুনি জুলুসন, হোলমার ওরন আইজলফসন, জরটার হারমেনসন;
মাঝমাঠ: অ্যারন গুনারসন (অধিনায়ক), বিরকির জারনাসন, জোহান বার্গ ইয়ুমুন্ডসন, এমিল হল ফ্রেসন, রুরিক গিসলাসন, থিওডর এলমার জারনাসন, ওলাফার ইনগি স্কালসন, আরনর ইনগবি রাসটাসন, স্যামুয়েল ফ্রিজনসন;
আক্রমণভাগ: কোলবেন সিগপরসন, জন ডাই বুভারসন, ভেøয়ার ওরন জারটানসন, জারটান ফিনবোগাসন, জরন বার্গম্যন সিগুডারসন।

আরো পড়ুন : নতুন রূপে ইতিহাসের সন্ধানে মেসি

হঠাৎই, দিন সাতেক বাদে মস্কোর আকাশ বড় বেশি নীল। নির্বিকল্প সাদা মেঘের দল উড়ে বেড়াচ্ছে। সে কী শনিবার নীল-সাদা মেসি বিশ্বকাপে নামছেন বলে? প্রতিপক্ষ আবার নীল রঙা আইসল্যান্ড বলে?

রাশিয়ার রাজধানী থেকে প্রায় ৫৫ কিলোমিটার দূরে ব্রনিৎসি নামে একটা শহরে মেসিদের বেসক্যাম্প। সেখানেও দেখা গেল, নীলের প্রাধান্য। ছবি হয়ে ঘোড়ার খুরের মতো যে লেক ঘিরে রেখেছে জায়গাটা, তার রংও নীল। লেকের ধারে দুটো প্রাচীন চার্চ পরিবেশে অন্য মাত্রা যোগ করে দাঁড়িয়ে। লেকের জলে আবার অজস্র ছেলেমেয়ে রোয়িং আর কায়াকিং নিয়ে ব্যস্ত। এখান থেকে প্রচুর অলিম্পিয়ান পদকজয়ী তৈরি করেন রাশিয়ানরা। সামান্য দূরে এ অঞ্চলের বিখ্যাত ঘোড়ার সব খামার আর মিলিটারি ব্যারাক।

সব মিলিয়ে লিও মেসির পক্ষে আদর্শ পরিবেশ। যে রকম গরিমা ও সোনালি স্মৃতি নিয়ে বিশ্বকাপে হাজির মেসি, তার সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে যায় ব্রনিৎসির ইতিহাস। ব্রনিৎসিকে আধুনিক করেছিলেন রাশিয়ান সাম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেট। নেপোলিয়ান রাশিয়া আক্রমণ করে ফ্রান্স থেকে সবচেয়ে দূরে এসেছিলেন, এ শহরেই। ফুটবলের সম্রাট লিও ইতিহাসের মধ্যে থেকেই ইতিহাস গড়ার চেষ্টায়। খুব সিরিয়াস।

সম্রাট মেসি প্র্যাক্টিসে এলেন গল্ফ কার্টে চড়ে। গাড়িটা চালিয়ে এলেন দি মারিয়া। আসার পর মাঠের একটা ধারে প্রথমে চুপ করে বসেছিলেন মেসি। মুখে হাত---তাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। সারা দেশের ভার মাথায় থাকলে যা হয়। সে সময়ই হয়তো প্রধান গেটের সামনে মেসির এক যিশুসুলভ মূর্তি বানিয়ে এনেছেন দুই আর্জেন্টিনীয় তরুণ। সাদা নীল পতাকায় ‘রাশিয়া’ লিখে নাচানাচি করছেন। যে কোচিং সেন্টারে টিম থাকে, তার দেওয়ালে বিশাল পোস্টার মেসির। তবু চোখের সামনে বসে থাকা মেসিকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। তার কোচ সাম্পাওলি অবশ্য বলছেন, ‘মেসি দারুণ ফর্মে। চনমনে। ওর চিন্তায় থাকার কোনো কারণ নেই।’

মেসি ও আর্জেন্টিনার চিন্তার কারণ অনেক। প্রথমত, ভালো গোলকিপার নেই। রোমেরোর ছবিটা ঝুলছে সেন্টারের প্রধান গেটে, অন্য সতীর্থদের সঙ্গে। অথচ তাঁকে পাওয়া যাবে না। প্রথম গোলকিপার হিসেবে যাকে ভাবা হচ্ছে, সেই কাবায়েরোর বয়স এখন ৩৬।

নেই আরো অনেক। আগুয়েরো, ইগুয়াইন ফর্মে নেই। ওতামেন্দি ছাড়া ডিফেন্ডাররা আস্থা দেখানোর জায়গায় নেই। লানজিনি চোট পেয়ে নেই। তবে কোচ সাম্পাওলির সবচেয়ে বড় সমস্যা বোধহয়, টিমের গড় উচ্চতা ভালো নেই। বিশেষ করে আইসল্যান্ডের বিরুদ্ধে। সাম্পাওলির ছাত্রদের গড় উচ্চতা ১.৭৮ মিটার। আইসল্যান্ডারদের গড় উচ্চতা সেখানে ১.৮৬ মিটার। দু’বছর আগে ইউরো কাপে উচ্চতা ও সেট পিস কাজে লাগিয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিল আইসল্যান্ড। আর্জেন্টিনা কোচ সাম্পাওলির প্রেস মিটে এই প্রশ্নটা উঠল। এবং সাম্পাওলি গুরুত্ব দিলেন না। ‘আমরা চেষ্টা করব, ওরা যাতে বাড়তি সুবিধে না নিতে পারে।’

আইসল্যান্ড কোচ হেইমের হালগ্রিমসন অবশ্য অনেক আগেই মেনে নিয়েছেন, মেসিকে থামানোর কোনো ফর্মুলা নেই। ‘সবাই ওকে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ওকে সামলানো যায় না। ঠিক একটা না একটা রাস্তা বের করে নেয়। আমাদেরও সবাই মিলে কাজ করে ওকে আটকানোর চেষ্টা করতে হবে।’ ভদ্রলোক বেশ বিনয়ী। কিন্তু তার ক্যাপ্টেন গোটা পিঠে আইসল্যান্ডের ম্যাপের ট্যাটু করানো অ্যারন গুনারসনের কাটাকাটা কথা। তিনি ক’দিন আগে এক পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমরা যদি ইউরোয় রোনালদোকে থামাতে পারি, তা মেসিকে থামাতে পারব না কেন? আমরা ওদের শ্রদ্ধা করি। ওরা আমাদের সম্মান করে তো? না হলে কিন্তু ওরা ডুববে।’

আইসল্যান্ড কোচের বয়স ৫১। তিনি যখন পাঁচ বছরের, সে সময় বাড়ির কাছে দ্বীপের আগ্নেয়গিরিটি জেগে ওঠে। দ্বীপ ছেড়ে পালাতে হয় তার বাবা-মাকে। কিছু মাছ ধরার ট্রলার ছিল সেখানে। খারাপ আবহাওয়ার জন্য আটকে ছিল খাড়িতে। তারই একটা ধরে প্রাণ বাঁচান তারা। জীবন কত জটিল, তা ভালো জানেন আইসল্যান্ড কোচ। ফুটবলের আগ্নেয়গিরি মেসির সামনে পড়েও তিনি তাই অবিচল। পেশায় ডেন্টিস্ট হালগ্রিমসন আগে একবার বলেছেন, ‘আগ্নেয়গিরি মানুষের মধ্যে ঐক্যকে শক্তিশালী করে দেয়। প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই শেখায় ভালো করে।’

আট মাস পরে আগ্নেয়গিরির লাভায় বিপর্যস্ত বাড়িকে আর চিনতে পারেননি কিশোর আইসল্যান্ড কোচ। তিনি জানেন, ধ্বংসস্তুপ থেকে সৃষ্টির আনন্দ। ইউরোর সাফল্য ধরে রাখার একটা আনন্দ আছে।

আর্জেন্টিনা কোচ সাম্পাওলি একেবারে অন্য জাতের লোক। মাঠে গরম, বাইরে নরম। প্রেস মিটে এসে এমন চুপচাপ থাকেন, মনে হবে, এ লোকটা মেসিদের কোচ? কিন্তু মাঝেমাঝেই চুপচাপ থেকে এমন কথা বলে যান, চমকে উঠতে হয়।

শুক্রবার যেমন প্রথম টিম সংক্রান্ত প্রশ্ন করতে টিম তালিকার কাগজ হাতে নিয়ে গড়গড় করে বলতে থাকলেন, প্রথম এগারো জনের নাম। ‘কাবায়েরো। সালবিও, ওতামেন্দি, রোখো, তাগলিয়াফিকো। বিগলিয়া, মাসচেরানো, মেজা। মেসি, দি মারিয়া। আগুয়েরো।’ বিশ্বকাপে কোনো দিন কোনো কোচকে এ ভাবে কাগজ দেখে প্রথম টিম বলে দিতে শুনিনি।