বাংলাদেশে করোনা ভাইরোসের কমিউনিটি ট্রান্সশিনের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটির দ্বিতীয় সভা মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় আগের সভায় গঠিত পাঁচটি সাব-কমিটির রিপোর্ট পর্যালোচনা কয়েকটি সুপারিশ গৃহীত হয়।

হাসপাতাল সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে কমিটি কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে। পরামর্শগুলো হলো- স্বয়ংসম্পূর্ণ ও প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোকে কোভিড-১৯-এর রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্বাচন করতে হবে। অস্থায়ী হাসপাতালগুলোতে মৃদু থেকে মাঝারিভাবে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা করা হবে। কোভিড-১৯ -এ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালগুলো নিয়োজিত আছে, তাতে বিভিন্ন বিষয়ে যথেষ্ট সংখ্যক সিনিয়র ও জুনিয়র চিকিৎসক থাকতে হবে। স্বাস্থ্য সেবার জন্য নিয়োজিত ওয়ার্ড বয় ও পরিচ্ছন্নকর্মীদের সংখ্যা বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করতে হবে এসব হাসপাতালে।

স্বাস্থ্য সেবা কর্মী, চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত মানসম্মত সুরক্ষা সামগ্রী, বিশেষত কাভারল, ফেসশিল্ড, গগলস ও জুতার কাভার যথেষ্ট সংখ্যায় সরবরাহ করতে হবে। যারা মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ও সংক্রমিত হওয়ার বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাদের জন্য রেসপিরেটর মাস্ক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সভায় সুপারিশ করা হয়, সুরক্ষা সামগ্রী যাতে মানসম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি থাকা দরকার।

এছাড়া কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালগুলোতে রোগী, চিকিৎসক ও অন্যান্য সকলের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য যথেষ্ট সংখ্যক পানি-ফিল্টারের ব্যবস্থা করা দরকার।

কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালগুলোতে রোগীদের চিকিৎসার জন্য অতি প্রয়োজনীয় টেস্টের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ সকল টেস্টের মধ্যে রয়েছে সিবিসি, এসজিপিটি, ক্রিয়েটিনিন, ইলেকট্রোলাইটস, সিআরপি, সিপিকে, ট্রোপোনিন-১, বুকের এক্সরে, ইসিজি অন্যতম। এ হাসপাতালগুলোর ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ভাইরোলজিস্ট, টেকনোলজিস্ট পদায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহে রোগীর উপসর্গ ও বুকের এক্সরের ভিত্তিতে কোভিড রোগী হিসেবে চিকিৎসা শুরু করা হচ্ছে। কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের এ সময়ে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা শুরু করা অতীব জরুরী। কোভিড পরীক্ষা ভর্তির পরও করা যেতে পারে।

যে সমস্ত রোগীর উন্নতি হয়েছে এবং হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়ার যোগ্য তারা পর পর দুটি কোভিড টেস্ট নেগেটিভ না হওয়া পর্যন্ত ছাড়া হয় না। সে কারণে হাসপাতালসমূহের একটা বিরাট অংশের বিছানায় এরা অবস্থান করছেন বলে হাসপাতালের উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য যারা ছাড়া পাওয়ার যোগ্য কিন্তু এখনো দুটি টেস্টের রিপোর্টে পাননি তাদের জন্য আলাদা আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা বাড়িতেও বা অন্যত্রও হতে পারে।

সুপারিশে বলা হয়েছে, কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহের মধ্যে আন্ত:হাসপাতাল যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। এতে রোগী চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের আদান প্রদান সহজতর হবে।
হাসপাতালে কোভিড রোগীদের অন্যান্য রোগের কারণে জরুরি অস্ত্রোপচার প্রয়োজনে ব্যবস্থা রাখতে হবে। গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকা দরকার।

অধিক সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মী কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যাতে বিঘ্নিত না হয় সে জন্য পূর্বপরিকল্পনা ও প্রস্তুতি থাকা দরকার। রোগী সেবার মান বৃদ্ধির জন্য কয়েকটি কর্মপদ্ধতি তৈরী করা হয়েছে। এর মধ্যে কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত মা, শিশু, নবজাতক, হৃদরোগ ও কিডনি ফেইলিও’র রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা আলাদা সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।

চিকিৎসাকর্মী , রোগী ও রোগীদের স্বজন বিশেষভাবে মানসিক চাপে থাকেন এবং উদ্বেগ, হতাশা ও ভীতিতে ভোগেন, তাদের মানসিক সহায়তার জন্য মনরোগ বিশেষজ্ঞগের সমন্বয়ে একটি সহায়তা প্যানেল গঠন করা হয়েছে। এই বিশেষজ্ঞগণ টেলিফোনে পরামর্শ দিবেন ।

তীব্রভাবে আক্রান্ত বা মুমূর্ষু রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ প্রয়োজন । এজন্য যথেষ্ট পরিমাণে আইসিইউ সারাদেশের সব কোভিড রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে তৈরি করা দরকার। এখানে যথেষ্ট সংখ্যক ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য অনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি থাকা প্রয়োজন। যথেষ্ট সংখ্যক এ্যানাসথেটিস্টও নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এ্যানাসথেটিস্ট হিসাবে নিয়োগের উপযুক্ততা সম্পন্ন বেশ কিছু সংখ্যক জনবল দেশে আছে। তাদের জরুরী ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

আইসিইউ পরিচালনার জন্য অব্যাহত অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য তরল অক্সিজেন, অক্সিজেন কনসেনট্রেটর ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা সমূহের সাহায্য নেয়া দরকার।

কমিটির সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালসমূহে তিন-শিফটে ভাগ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ করার ব্যবস্থা থাকা দরকার। প্রতি -শিফটে সমন্বয়ের জন্য প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য থাকা প্রয়োজন।

কোভিড শনাক্তের জন্য টেস্ট আরও বেশী সংখ্যায় ও বেশী স্থানে করা দরকার যাতে টেস্টের ফলাফল আরও দ্রুত জানা যায়। কোভিড-১৯’র জন্য নিয়োজিত ল্যাবরেটরিসমূহ বায়োসেফটি লেভেল-২ অনুযায়ী পরিচালনা করা উচিত। এই ল্যাবরেটরিসমূহে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকা দরকার। বায়োসেফটি ক্যাবিনেটসমূহ নিয়মিতভাবে ক্যালিব্রেশন করা দরকার, এ জন্য সার্টিফায়েড ইঞ্জিনিয়ার থাকতে হবে। স্বল্প মেয়াদে পাঁচ লাখ টেস্টিং কিট সংগ্রহ করা জরুরি। রেফারেন্স ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নমুনা পাঠিয়ে প্রতিটি ল্যাবরেটরির কোয়ালিটি নিশ্চিত করা জরুরি।
কমিটির সুপারিশে আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে শুধুমাত্র উপসর্গযুক্ত যে সব রোগী কোভিড নির্ণয় কেন্দ্রগুলোতে আসেন, তাদেরই পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কমিউনিটিতে যে সমস্ত মানুষের উপসর্গ আছে কিন্তু রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে আসছেন না, তাদের খুঁজে বের করে টেস্টের আওতায় আনতে হবে।

রোগের প্রাদুর্ভাবের ভিত্তিতে (বেশি, মাঝারি ও কমসংখ্যক) এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। এ অনুযায়ী রেসপন্স টিম কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করে রোগকে ছড়িয়ে পড়তে না দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য যারা যাদের সংস্পর্শে এসেছেন তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

এ লক্ষ্যে যে সমস্ত ঘনবসতি এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ (যেমন- শহরের বস্তি, পোশাককর্মীদের বাসস্থান), সেখানে কেউ রোগাক্রান্ত হলে এবং হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন না হলে সে যেন আইসোলেশনে থাকতে পারে এমন বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে যে সকল পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা পর্যায়ক্রমে শিথিল করার জন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ রোগের জন্য ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়ায় ক্লিনিকেল বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোও যুক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও বৈজ্ঞানিকদের এ ক্লিনিকেল ট্রায়ালে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ বলে জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শ কমিটি সুপারিশ করেছে। সফল ভ্যাকসিন তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশের সব লোক যাতে এ ভ্যাকসিন পায় সেজন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন থেকেই সচেষ্ট থাকা দরকার।