নয়া দিগন্ত ডেস্ক

চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ এক তীব্র জ্বালানি সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চরম ঘাটতিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশটির দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০৭ থেকে ১১৩ কোটি ঘনমিটার হলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৭৪ কোটি ঘনমিটারের মতো। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম থাকায় বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় অর্ধেকই আমদানি করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্ঘাত এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলএনজি আমদানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। 
জনজীবন ও অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব
ঢাকার অনেক এলাকায় দিনে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় নারীদের গভীর রাতে বা ভোরে রান্না করতে হচ্ছে। ঘুমের ঘাটতি ও মানসিক চাপে সাধারণ গৃহিণীদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তায় চলাচল সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। বাজারে জিনিসপত্রের দাম আকাশছোঁয়া। সাধারণ বিক্রেতা ও খেটে খাওয়া মানুষ পর্যাপ্ত খাবার কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরের শেষভাগে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে বস্ত্র, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
পরিসংখ্যানে বা রাজনৈতিক বিতর্কে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমে না। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ সরকারের কাছে বড় কোনো প্রতিশ্রুতির বদলে নিয়মিত গ্যাস, বিদ্যুৎ, নিরাপদ পানি এবং সহনীয় মূল্যে খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। ইরানকেন্দ্রিক সঙ্ঘাত এবং গ্যাস আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতার জেরে সৃষ্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সঙ্কটে দেশটিতে নেমে এসেছে অন্ধকার।
রাত ১টায় অ্যালার্ম বাজার সাথে সাথে ৩৪ বছর বয়সী বাংলাদেশি ব্যাংক কর্মকর্তা মিসেস হালদার ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরের দিকে যান। কাজের জন্য নয় বরং পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করতেই তিনি এ সময় জেগে ওঠেন। প্রায় চার কোটি মানুষের শহর রাজধানী ঢাকা এখন জ্বালানি সঙ্কটে বিপর্যস্ত; ফলে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ ঠিকঠাক পাওয়ার জন্য এই সময়টিই একমাত্র সুযোগ, যখন রান্না করা সম্ভব হয়। জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে এমনকি জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোতেও সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হচ্ছে, আর এর মধ্যেই মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে নির্বাচিত সরকারের জন্যও এই সঙ্কট মোকাবেলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিসেস হালদার বলেন, ‘সরকারের কাছে আমার কোনো বাড়তি চাওয়া নেই; আমি শুধু চাই চুলা জ্বালালে যেন গ্যাস পাই, বাতি জ্বালালে যেন বিদ্যুৎ পাই আর কল খুললে যেন পরিষ্কার পানি পাই। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়। কোনো কোনো রাতে আমি মাত্র তিন ঘণ্টা বা তারও কম সময় ঘুমাতে পারি। অথচ এরপরও আমার কাছে প্রত্যাশা করা হয় যে আমি একজন মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করব, সংসার সামলাব এবং অফিসে পুরো দিন কাজ করব- যেন সবকিছু একদম স্বাভাবিক।’
সরকার জ্বালানি রেশনিং বা সীমিত ব্যবহারের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং দোকানপাট ও শপিং মলগুলো রাত ৮টার মধ্যে অর্থাৎ, আগের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা আগে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকসজ্জাযুক্ত বিলবোর্ডগুলো বন্ধ রাখা হচ্ছে। তবে হাসপাতাল, ফার্মেসি, খাবারের দোকান এবং জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এই নির্দেশ কার্যকর নয়। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরো খারাপ; আগস্ট মাসে সেখানে মানুষকে দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎসঙ্কটের চরম পর্যায়ে জাতীয় পর্যায়ে লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির পরিমাণ ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তবে স্বাভাবিক কর্মচঞ্চল শহর ঢাকায় এই পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো। মোহাম্মদপুর, কাওরান বাজার ও ধানমন্ডির মতো অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানপাটে ঠাসা এলাকাগুলোর দীর্ঘ সড়কপথ এখন ভুতুড়ে অন্ধকারে ডুবে থাকে। এই সঙ্কটের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত নানা হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। যেমন কখন গ্যাসের চাপ রান্নার উপযোগী থাকবে, ভ্যাপসা গরমের সময় কতক্ষণ ফ্যান চালানো যাবে কিংবা পেট্রল পাম্পে লাইনের দৈর্ঘ্য কতটা হতে পারে।
পুষ্টিহীনতাবিষয়ক বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন’-এর তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরো প্রায় ৩০ লাখ মানুষ খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। গ্রীষ্মকালে এই সংখ্যাটি ছিল ১ কোটি ৫৩ লাখ; অর্থাৎ নতুন করে ১৮ শতাংশ মানুষ এই ঝুঁকির আওতায় আসছে। ৫০ বছর বয়সী আহমেদ মোহাম্মদপুরের কেন্দ্রস্থলে একটি ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কশপ চালান। তবে তিনি থাকেন ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে, যেখানে বাসাভাড়া তুলনামূলক কম। বছরের পর বছর ধরে যে যাতায়াত তিনি অনায়াসেই সামলেছেন, এখন তা-ই তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। দোকান বন্ধ করার পর যানবাহন পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে; পাশাপাশি অন্ধকারাচ্ছন্ন রাস্তায় ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার ভয়ও তাকে তাড়া করে বেড়ায়। 
বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১১ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার (৩৮০-৪০০ কোটি ঘনফুট), যা বিদ্যমান সরবরাহ প্রায় ৭ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটারের চেয়ে অনেক বেশি। মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্ঘাতে জুলাই ও আগস্টের মধ্যে এলএনজি আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে গেছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে বাংলাদেশের দু’টি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি অকেজো হয়ে যায়। এর ফলে বিদ্যমান সঙ্কট আরো ঘনীভূত হয়; কারখানাগুলোকে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়, উৎপাদন কমাতে হয় কিংবা কারখানা বন্ধও করে দিতে হয়, যার ফলে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়।
ঢাকার থিংক-ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ’-এর গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা ছিল, এই বিঘœতা তাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সাধারণ পরিবারগুলো যেমন ভোগান্তির শিকার হয়েছে, তেমনি বস্ত্র, সিরামিক, কাচ ও ইস্পাত, পরিবহন, কৃষি, মৎস্য ও সাধারণ বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মতো জ্বালানি-নির্ভর খাতগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোয়াজ্জেম বলেন, ‘জ্বালানি সঙ্কটের কারণে প্রায় সব ধরনের অর্থনৈতিক কার্যক্রমই তাদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম মাত্রায় পরিচালিত হচ্ছে।’
ঢাকার কৃষিসবজি বাজারে ৪১ বছর বয়সী আলেয়া বেগম রাস্তার পাশে চা ও রাস্তার খাবার বিক্রির ছোট দোকানটি চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এটিই তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস এবং এর মাধ্যমেই ছেলের পড়াশোনার খরচ মেটানো হয়; পাশাপাশি মেয়ের বিয়ের জন্যও তিনি কিছু অর্থ জমাচ্ছিলেন। বেগম জানান, সবজির দাম এতটাই বেড়ে গেছে যে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সবজি কেনাও তার সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগে খুব বেশি খরচ না করেই এক ব্যাগ সবজি কিনতে পারতাম। আর এখন এক ব্যাগ ভর্তি টাকা খরচ করেও ব্যাগটা পূর্ণ করা যায় না। তিনি মাছ ও মুরগির কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন এবং ডিম কেনার আগেও তাকে দু’বার ভাবতে হচ্ছে।