নিজস্ব প্রতিবেদক
পশ্চাৎপদ হিজড়া জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক কর্মসূচি প্রয়োজন। অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও পরিবর্তন করতে হবে। হিজড়ারা এ দেশেরই মানুষ, তাদের উন্নয়নের জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। গতকাল রোববার দৈনিক নয়া দিগন্তের সাথে আয়োজিত ‘জেন্ডার সেনসিটিভ রিপোর্টিং অ্যান্ড ইনক্লুসিভ ইকোনমিক পোর্ট্রয়োল’ (জেন্ডার সংবেদনশীল প্রতিবেদন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক চিত্র) শীর্ষক বৈঠকে বক্তারা এ দাবি জানান। নয়া দিগন্তের বোর্ড রুমে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তারা বলেন, হিজড়ারাও মানুষ, এটা ঠিক কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা মানুষকে বিরক্ত করে, রাস্তায়, দোকানে ও বাসায় চাঁদা তোলে। কিন্তু কোনো হিজড়া এসব ছেড়ে সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশে কাজ করতে চাইলে তাদের গ্রহণ করা হয় না। কোনো হিজড়া চাকরি না পেলে এটা তার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, যারা নিয়োগ দেবেন নিয়োগ প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে হিজড়াদের চাকরি হয় না। তবে এটাও ঠিক হিজড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে কারো শক্ত অবস্থান থাকলে তিনি গ্রহণযোগ্যতা পান কিন্তু এ অবস্থা তো সবার নেই। উদাহরণ হিসেবে উত্তরবঙ্গের একটি আসনে হিজড়া সম্প্রদায়ের একজনের গত সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা বলা হয়। তারা বলেন, কোথাও হিজড়ারা চাকরি পেলেও সেখানে তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। সর্বোচ্চ দুই মাসের বেশি কেউ চাকরি করতে পারেনি।
হিজড়াদের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে সভায় বলা হয়, হিজড়ারা বাসা-বাড়িতে, দোকানে কিংবা রাস্তায় চাঁদা তুলতে গিয়ে মানুষকে উত্ত্যক্ত করে। রাস্তায় চাঁদা সবাই তোলে না, হিজড়াদের একটা অংশ এই কাজটা করে। কিন্তু চাঁদা তুলে টাকা উপার্জন করুক অথবা অন্য কোনো উপায়ে উপার্জন করুক, এর একটি অংশ হিজড়াদের গুরুমাকে বাধ্যতামূলক দিয়ে দিতে হয়। এমনও ঘটনা আছে একজন হিজড়াকে প্রতিদিন তার গুরু মাকে এক হাজার টাকা দিতে হয়।
হিজড়াদের গুরু মা প্রসঙ্গে সভায় বন্ধু সোস্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির (বন্ধু) জান্নাতে নাঈম বলেন,একজন গুরু মাকে হিজড়াদের প্রয়োজন কারণ, হিজড়া পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার পরপরই সমাজ পরিত্যক্ত করে। তার কোথাও জায়গা না থাকলে গুরু মা-ই তাকে আশ্রয় দেয়, বড় করে, অসুখ হলে চিকিৎসা করায়। বড় না হলে সব ধরনের সাপোর্ট দেয়।
বন্ধুর ম্যানেজার আনিসুজ্জামান বলেন, হিজড়াদের মাসিক ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, আর্থিক সহায়তা, বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণ শেষে আয়বর্ধক কাজে যুক্ত হতে সরকারি সহায়তা কিংবা অনুদান প্রয়োজন। দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও মনে করা হয় দেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার হিজড়া রয়েছে। তাদের মধ্যে উদ্যোক্তা আছে। সরকারের উচিত এসব উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হিজড়াদের উদ্যোক্তা হিসেবে পুরস্কৃত করেছে।
জান্নাতে নাঈম তাদের উপস্থাপনায় হিজড়াদের জন্য মিডিয়ায় সম্মানজনক শব্দ ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নাম, ছবি ও স্পর্শকাতর শব্দ প্রকাশের আগে উপযুক্ত জায়গা থেকে তথ্যগুলো যাচাই করে নেয়ার অনুরোধ করেন তিনি। এমন ছবি ব্যবহার করা উচিত যা প্রকাশ করলে হিজড়াদের সম্মান বাড়ে। স্বাস্থ্য ও সহিংসতা নিয়ে নিউজ করলে তাদের প্রাইভেসি ও নিরাপত্তার কথা ভাবতে পরামর্শ দেন তিনি।
সভায় নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন মুহাম্মদ বাবার, প্রধান প্রতিবেদক আবু সালেহ আকনসহ নয়া দিগন্তের সব বিভাগের প্রতিনিধি ও হিজড়া সম্প্রদায়ের লোকজন উপস্থিত ছিলেন।

