ইকবাল মজুমদার তৌহিদ নিউ ইয়র্ক থেকে
জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে এসে নিউ ইয়র্কে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অধিবেশনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি সাইডলাইনে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে একাধিক বৈঠক করছেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা বিষয়ে স্থানীয় সময় বুধবার জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সঙ্কট মোকাবেলায় কোনো দেশ একা সফল হতে পারবে না। ‘অভিন্ন কিন্তু পৃথক দায়িত্ব ও নিজ নিজ সমতা’ নীতির ভিত্তিতে সম্মিলিত পদপে নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্যোগে ‘কাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এ বৈঠকটি স্থানীয় সময় বুধবার বিকেলে বিশ্বসংস্থার সদর দফতরের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং টেকসই ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় পাঁচ প্রস্তাব : বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় পাঁচটি জরুরি প্রস্তাব তুলে ধরেন। এগুলো হলোÑ প্রথমত, প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিন হাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে অধিকতর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, সহজলভ্য অর্থায়ন, সমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ করতে হবে। পঞ্চমত, য়তি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে এর অর্থ পুনঃপূরণ করতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা তিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট য়তির পরিমাণ বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের সমান। এর ফলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অনুষ্ঠানে তারেক রহমান জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুতের চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের ল্য রয়েছে। পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, পরিবেশবান্ধব পরিবহন, বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদন ও সার্কুলার অর্থনীতিসহ সবুজ শিল্পের প্রসার ঘটানো হচ্ছে। জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজও চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এককভাবে বাংলাদেশের পে এসব ল্য অর্জন সম্ভব নয়। জলবায়ু সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। তিনি জানান, চলতি বছরের বাজেটে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য প্রায় ৩ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পানি সংরণ, বন্যার ঝুঁকি কমানো, জলাভূমি পুনরুজ্জীবিত করা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের ল্েয প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের কাজ চলছে। পাশাপাশি পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা ব্যারাজের মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরো নিরাপদ ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক : এদিকে ইউএনজিএর ফাঁকে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সাথে দ্বিপীয় বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি জানান, বৈঠকে বাংলাদেশ ও ক্রোয়েশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। দুই প্রধানমন্ত্রী অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, দ জনশক্তি, শিা ও প্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন েেত্র সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন। জাতিসঙ্ঘসহ বহুপীয় ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা হয়।
গেটস ফাউন্ডেশনের সিইওর সাথে বৈঠক : এর আগে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকালে নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আবাসস্থলে গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক সুজম্যান সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং জানায়, বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান কর্মসূচি, সাশ্রয়ী ভ্যাকসিন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ ও প্রশিণ, প্রশিতি স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সমন্বিত ‘ডিজিটাল পাবলিক হেলথ কেয়ার সিস্টেম’ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সমতা গড়ে তোলার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সফরের নানান দিক
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউ ইয়র্ক’ হোটেলে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর, শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেসসচিব আতিকুর রহমান রুমন বক্তব্য দেন।
মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের দ্বিতীয় দিনে স্বাস্থ্য, কৃষি, রোহিঙ্গা সঙ্কট, জলবায়ু পরিবর্তন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও দ্বিপীয় সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে আসায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা প্রয়োজন।
চীন ও ভারতের ভূমিকা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ দ্বিপীয় ও বহুপীয় উভয় পর্যায়েই সংশ্লিষ্ট দেশ ও অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ করছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে চীনের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। একই সাথে মিয়ানমারসহ সংশ্লিষ্ট সব পরে সাথে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কূটনীতিতে সব দরজা এবং সব বিকল্প খোলা রাখতে হয়। আলোচনার পথ কখনো বন্ধ করা যায় না।’
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা প্রসঙ্গে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ সমাধানের প।ে প্রয়োজনে বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিরপে অবস্থান থেকে সংলাপের সুযোগ তৈরিতে বাংলাদেশ ভূমিকা রাখতে পারে। সঙ্ঘাতের কারণে জ্বালানি, বাণিজ্য ও বাংলাদেশী প্রবাসীদের ওপর যে প্রভাব পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, জাতিসঙ্ঘে চার দিনের সফরের আরো দুই দিন প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি রয়েছে। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।











