সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
চলতি বছরের তৃতীয় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জনজীবনে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর ফলে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যে পৌঁছেছে। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে পণ্য পরিবহন এবং কৃষিসেচে ব্যবহৃত মূল জ্বালানি ডিজেলের ওপর, যার দাম ১৭.৪ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩৫ টাকা। মেগাসিটি ঢাকার বাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নাঘর পর্যন্ত এর বহুমুখী ও নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর হবে নাই বা কেন? জ¦ালানি তেলের সাথে নাগরিকজীবনে এমন কোনো অনুসঙ্গ নেই যা জড়িত নয়। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে গরিবের ‘বানরুটি’ থেকে শুরু করে ধনীর জ¦ালানি ‘অকটেনের’ ওপর!
বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন খরচ যতটুকু বাড়ার কথা ছিল, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে বেড়েছে অনেকখানি বেশি। যশোর, বগুড়া কিংবা অন্যান্য উৎপাদন অঞ্চল থেকে আট থেকে ১০ টন সবজি বা নিত্যপণ্য নিয়ে যে ট্রাকগুলো ঢাকার কাওরান বাজার, মান্ডা-মুগদা কিংবা যাত্রাবাড়ীতে আসে, তাদের যাতায়াতে জ্বালানি বাবদ ট্রিপপ্রতি খরচ বড়জোর আড়াই হাজার টাকা বাড়ার কথা। কিন্তু পরিবহন মালিক ও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মাঠপর্যায়ে ট্রাকভাড়া বেড়েছে ছয় থেকে ৯ হাজার টাকা পর্যন্তÑ যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি।
এই লাগামছাড়া ট্রাকভাড়া যখন আড়তদার ও পাইকারদের ঘাড়ে চাপে, তখন তারা বাড়তি খরচের ওপর নিজেদের শতকরা হার অনুযায়ী কমিশন যোগ করেন। এরপর খুচরা বাজারে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই নানা অজুহাতে সেই সামান্য খরচ কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকায় রূপ নেয়। ফলে কাওরান বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরাবাজারে সবজি, চাল, মাছ ও ব্রয়লার মুরগির দাম ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যার পুরো চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তার পকেটে। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি নগরবাসীর দৈনন্দিন যাতায়াত খরচও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সরকার ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়ে দুই টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করেছে, যা প্রায় ৬.৭ শতাংশ বৃদ্ধি। তবে কাগজে-কলমে এই হার ৬.৭ শতাংশ হলেও যাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক যাত্রীকে দেখা গেছে ‘দামাদামি’ করে বাসে ওঠার চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, বাসগুলো ইচ্ছেমাফিক ভাড়া আদায় করছেন। এ নিয়ে মাঝে মাঝেই দেখা দিচ্ছে বচসা।
ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্মজীবী সদস্যরা প্রতিদিন বাসে যাতায়াত করতে গিয়ে বাড়তি ভাড়ার খপ্পরে পড়ছেন। কন্ডাক্টরদের ভাঙতি না দেয়ার প্রবণতা এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মানসিকতার কারণে যাতায়াত ব্যয় অনেক গুণ বেড়ে গেছে। এর বাইরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং রাইড-শেয়ারিং সেবাগুলোর েেত্র নির্দিষ্ট ও কঠোর নজরদারির অভাবে চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করছেন। নিজস্ব মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর েেত্র ২০ লিটার অকটেনে প্রতি মাসে বাড়তি ৪০০ টাকা সরাসরি খরচ বাড়াচ্ছে।
গতকাল রাজধানীর জিপিওর মোড়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ জামালপুরের রফিকের সাথে করা হয়। তিনি রাইড শেয়ার করেন। আমাকে প্রথমে যাত্রী ভেবে খুশি হয়েছিলেন। নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতেই তার মুখটি শুকিয়ে গেল। বললেন, কথা বললে কী হবে, দেড় ঘণ্টা ধরে এখানেই দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু কোনো যাত্রীই পাচ্ছি না, যাও দু-একজন আসছেন, নির্দিষ্ট গন্তব্য যাওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে কেউ মোটর সাইকেলে উঠছেন না। পেট্রল লিটারে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়ার কারণে আমাদের বাড়তি ভাড়া চাইতে হচ্ছে। যাত্রীর ভাড়া শুনেই চলে যাচ্ছেন। এখন আমার একটিই চিন্তা মেসের ভাড়া কীভাবে দেবো, আর গ্রামেই টাকা কীভাবে পাঠাবো।
ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটের চিত্র
এ দিকে, চার সদস্যের একটি আদর্শ মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেট যদি ৪৫ হাজার টাকা ধরা হয়Ñযার মধ্যে খাদ্যে ১৮ হাজার, যাতায়াতে চার হাজার এবং অন্যান্য পণ্য ও সেবায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়Ñ তবে এই মূল্যবৃদ্ধি তাদের ওপর মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে।
১. প্রত্য প্রভাব : বাস, সিএনজি ও রাইড-শেয়ারিংয়ের ভাড়া বৃদ্ধি এবং নিজস্ব যাতায়াতের খরচ মিলিয়ে মাসিক যাতায়াত ব্যয় ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
২. পরো প্রভাব : খাদ্যপণ্যে ৩ থেকে ৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির ফলে মাসিক বাজার খরচ বাবদ অতিরিক্ত ৫৪০ থেকে ৯০০ টাকা বাড়তি গুণতে হবে। এ ছাড়া কাপড়, ওষুধ, প্রসাধনী ও গৃহস্থালি সামগ্রীতে ১ থেকে ২ শতাংশ খরচ বাড়ায় আরো ১০০ থেকে ২০০ টাকা বাড়তি যোগ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে প্রায় এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকার অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে, যা তাদের মোট বাজেটের প্রায় ২ থেকে ৫ শতাংশ। যে পরিবারগুলোর মাসিক আয় মাত্র ২৫ হাজার টাকা এবং আয়ের বেশির ভাগই খাদ্যপণ্য ক্রয়ে ব্যয় হয়, তাদের েেত্র এই ধাক্কা আরো তীব্র হবে। অনেকে ইতঃমধ্যে বাধ্য হয়ে অনেকে মাছ, মাংস, ফল কিংবা সন্তানের টিউশনের মতো জরুরি খাত থেকে খরচ ছেঁটে ফেলছেন। আর যা দরিদ্র তারা তো আরো দরিদ্র হয়ে যাবেন।
ওদিকে, বাজারের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন : এগুলো হলো-বাজার মনিটরিং জোরদার করা : কাওরান বাজার, মান্ডা, মুগদা ও যাত্রাবাড়ীর মতো প্রধান পাইকারি বাজারগুলোতে দৈনিক মূল্য নজরদারি রাখতে হবে, যাতে কেউ জ্বালানির অজুহাতে কৃত্রিম সঙ্কট বা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটাতে না পারে।
পরিবহন ভাড়ার ন্যায্যতা যাচাই : বিআরটিএ-কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যেন বাস মালিকরা সরকারের নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারেন। একই সাথে পণ্যবাহী ট্রাকের েেত্র সিন্ডিকেটভিত্তিক ভাড়া বৃদ্ধি রোধে কঠোর আইনগত পদপে নিতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বিস্তৃত করা : টিসিবির ট্রাকসেল এবং খোলাবাজারে পণ্য বিক্রির পরিধি বাড়িয়ে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, জ্বালানির দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের সামষ্টিক আর্থিক যুক্তি থাকতেই পারে, কিন্তু সেই বাড়তি খরচ পরিবহন থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফাখোর সিন্ডিকেট কতটা অযৌক্তিক প্রভাব ফেলছে, তা খতিয়ে দেখে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া। দ্রুত এটি করা না হলে সামনে ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে, যাতে দেখা দিতে পারে সামাজিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভ।











