নয়া দিগন্ত ডেস্ক 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে দীর্ঘ সাত মাস ধরে চলা রক্তয়ী সঙ্ঘাতের মধ্যেও ইরান কখনো নতি স্বীকার করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তবে চলমান সঙ্কট নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে তার দেশ প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি ব্যক্ত করেন। সম্প্রতি দ্রুত কোনো দ্বিপীয় চুক্তি স্বারিত না হলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেয়া হবে মর্মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া হুমকির জবাবে জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে পেজেশকিয়ান এ কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, একের পর এক কঠোর নিষেধাজ্ঞা, বহুমুখী চাপ ও সামরিক দাদাগিরির সামনে ইরানি জনগণের প্রতিরোধের প্রাচীর আরো শক্তিশালী হবে। বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, আলজাজিরা ও ফার্স নিউজ। 
ইরানি প্রেসিডেন্ট জানান, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বাণিজ্যিক ও সামরিক নৌযানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। বর্তমানে এই অবরোধের কারণে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরীয় নৌপথ ব্যবহার করতে পারছে না তেহরান। এ প্রসঙ্গে তিনি ােভ প্রকাশ করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক সুবিধা বিশ্বের বাকি সব রাষ্ট্র ভোগ করবে আর ইরানকে সেখানে স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হবেÑ এমন বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো তাৎণিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে তিনি ভাষণ শুরু করার সাথে সাথেই মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা অধিবেশন ক ত্যাগ করেন। পেজেশকিয়ান আরো বলেন, ওয়াশিংটন তাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার অপচেষ্টা করলেও বাস্তবে ইরানি জনগণই বহুমুখী সন্ত্রাসবাদের প্রকৃত শিকার।
ভাষণের একপর্যায়ে তিনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ছবি প্রদর্শন করেন। পেজেশকিয়ান জানান, গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে বিমান হামলা শুরু করলে খামেনির বাসভবন ল্য করে চালানো আঘাতে তিনি প্রাণ হারান। একই সাথে তিনি ওই দিনগুলোতে পরিচালিত পেণাস্ত্র হামলায় নিহত বেসামরিক নাগরিকদের ছবি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। তেহরানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও লামার্দের একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্সে চালানো যৌথ হামলায় ১৭৫ জনেরও বেশি সাধারণ নাগরিক প্রাণ হারান, যার দুই-তৃতীয়াংশই ছিল নিষ্পাপ শিশু। ওয়াশিংটন লামার্দে হামলার সাথে সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে এবং মিনাবের ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে দাবি করেছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, তাদের নিরীহ নাগরিকদের ওপর চরম কাপুরুষোচিত উপায়ে আগ্রাসন চালানো হয়েছে এবং সার্বিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইরান নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব রা করেছে।
ভারত মহাসাগরে যুদ্ধ বিস্তৃত করার কড়া বার্তা 
যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল নতুন করে সামরিক হামলা চালালে এই সঙ্ঘাত ভারত মহাসাগর ছাড়িয়ে আরো দূরবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি। ইরানের সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই হুমকি দেন। সাফাভি উল্লেখ করেন, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালী থেকে উদ্ভূত সঙ্ঘাত ইতোমধ্যে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। নতুন করে আক্রমণ চালানো হলে এই যুদ্ধের পরিসর আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ভারত মহাসাগর ও তার আশপাশের অঞ্চলে আঘাত হানবে। তিনি আরো জানান, প্রতিপরে সম্ভাব্য হামলা মোকাবেলায় সশস্ত্রবাহিনীকে পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং যেকোনো কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে সামরিক নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ইয়েমেনের হাউছি যোদ্ধাদের ভূয়সী প্রশংসা করে সাফাভি বলেন, তারা লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করেছে। বিগত এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনি জনগণ যেকোনো বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রায় বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ফের কোনো নতুন যুদ্ধফ্রন্ট উন্মোচন করার দুঃসাহস দেখায়, তবে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালী অঞ্চলজুড়ে তাদের চোখের সামনেই আরো একটি নতুন এবং ভয়াবহ প্রতিরোধ রণত্রে তৈরি হবে।
পাকিস্তান-ইরান দ্বিপীয় আলোচনা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ঠিক পরদিনই নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ অধিবেশনে পার্শ্ববৈঠকে অংশ নেন পাকিস্তান ও ইরানের শীর্ষ কূটনীতিকরা। এক সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির মধ্যে এই দ্বিপীয় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এর ঠিক এক দিন আগে নিউ ইয়র্কে টানা কয়েক ঘণ্টাজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই আলোচনায় মূলত অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী পুনরায় চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা এবং ‘ইসলামাবাদ সমঝোতাস্মারক’ (এমওইউ)-এর আওতায় থমকে থাকা প্রত্য দ্বিপীয় আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার উপায় নিয়ে বিস্তর আলাপ হয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যালোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময় করেন। বৈঠকে মন্ত্রী ইসহাক দার আঞ্চলিক স্থায়িত্ব ও শান্তি বজায় রাখতে কূটনৈতিক মাধ্যম ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর জোর দেন। উভয়েই ভবিষ্যতে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার ব্যাপারে একমত প্রকাশ করেন।
৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি ও হরমুজ প্রণালী খুলতে ওয়াশিংটনকে নতুন প্রস্তাব 
সঙ্কট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রকে ল্য করে একটি বিশদ কর্মপরিকল্পনা বা ‘রোডম্যাপ’ পেশ করেছে ইরান। এই প্রস্তাবে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে অনধিক ৬০ দিনের সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি, পর্যায়ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ এবং সার্বিক সঙ্ঘাত অবসানে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার সময়সূচি নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আঞ্চলিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, তেহরানের এই খসড়া প্রস্তাবে আরব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে আক্রমণ বন্ধ রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ইরানি প্রশাসনের প থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছিল যে, মার্কিন প্রশাসন যদি তেহরানের শর্তাবলি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়, তবে মাত্র সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক করা সম্ভব। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে অবস্থানরত ইরানি কূটনীতিকরা পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, সামরিক পথ এড়িয়ে আলোচনার দুয়ার এখনো খোলা রয়েছে। তবে এর জন্য ইরানের নিজস্ব বন্দোবস্ত ও মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের দাবিগুলো আমলে নিতে হবে।
অন্য দিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, ওয়াশিংটন কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দিলেও সামরিক কৌশল অবলম্বন করার বিকল্প খোলা রাখছে। দুই পরে অনমনীয় অবস্থানের কারণে এই উদ্যোগ কতদূর সফল হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই কূটনৈতিক টানাটানির মধ্যেই আরব উপদ্বীপের জলসীমায় একাধিক জাহাজ ও অবকাঠামো হামলায় তিগ্রস্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক যাতায়াত স্বাভাবিক করতে কাতার ও পাকিস্তানসহ বেশ কয়েকটি দেশ সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নিউ ইয়র্কে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যকার প্রাথমিক বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের েেত্র কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও জাতিসঙ্ঘে দেয়া বক্তব্যে তিনি সতর্ক করে দেন যে, সামরিক পথ অথবা চুক্তিÑ উভয় পথই খোলা রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনকে ৫ দিনের চরমপত্র 
একই সময়ে আন্তর্জাতিক জলপথ হরমুজ প্রণালী চলাচলের উপযোগী করার পূর্বশর্ত হিসেবে ওয়াশিংটনকে নির্দিষ্ট পাঁচ দিনের আলটিমেটাম দিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোটালেব বা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন প্রশাসন প্রস্তাবিত শর্ত মেনে না নিলে এই সমুদ্রপথ অবরুদ্ধই থাকবে এবং কোনো দ্বিপীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে না। রেজাই উল্লেখ করেন, সঙ্ঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার হাতিয়ার ও নিশ্চয়তা হিসেবে কাজ করছে হরমুজ প্রণালী। আলোচনা শুরুর আগে ওয়াশিংটনকে বিশ্বাসযোগ্য পদেেপর মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি আরো পরিষ্কার করেন যে, ইরান তার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক অবস্থান বা স্থগিত হয়ে যাওয়া ‘ইসলামাবাদ সমঝোতাস্মারক’-এর পুরনো শর্তে ফিরে যাবে না। এর পাশাপাশি যেসব প্রতিবেশী দেশ নিজেদের আকাশসীমা বা বিমানবন্দর ইরানি বিমান চলাচলের জন্য নিষিদ্ধ বা মার্কিন বাহিনীকে ব্যবহারে সহায়তা করছে, তাদের উদ্দেশে কড়া হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। রেজাই জানান, শর্ত অমান্যকারী সংশ্লিষ্ট দেশের বিমানবন্দরগুলোর পরিচালনা ব্যবস্থা অচল করে দেয়ার পদপে নেবে ইরান।